নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে, চাপে দিশেহারা ভোক্তা
- আপডেট সময় : ০১:৩১:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 18
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। এর আগেই প্রায় দেড় মাস ধরে আটা ও ময়দার বাড়তি দামের কশাঘাতে ভুগছিলেন ক্রেতারা। গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, যেখানে পণ্য দুটির দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে চাল, ডিমসহ অন্যান্য জরুরি পণ্যের দামও নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর নাখালপাড়া, মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা ৭০ টাকা এবং ময়দা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ মাত্র সাত দিন আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। একইভাবে খোলা আটার কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের কে বি স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিকাশ বণিক জানান, কোম্পানিগুলোর নতুন সরবরাহের দুই কেজির প্যাকেটজাত আটার গায়ে ১৪০ টাকা এবং ময়দার গায়ে ১৬০ টাকা খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে প্যাকেটজাত আটার দাম ৪ শতাংশ এবং ময়দার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
আটা-ময়দার চড়া দামের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা জেগেছে চালের বাজারে। পরিবহন ভাড়া বাড়ার অজুহাতে পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের বিক্রয়কর্মী মহিউদ্দিন জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৫ টন চাল পরিবহনে দুই দিন আগের ১৭ হাজার টাকার ভাড়া বেড়ে এখন ২১ হাজার টাকায় ঠেকেছে। এতে প্রতি কেজি চালে পরিবহন ব্যয় প্রায় ২৭ পয়সা বেড়েছে। মুক্তা রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান মনে করেন, বর্তমান বাজারে পরিবহন খরচের দোহাই দিয়ে চালের দাম কেজিতে এক টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে পরিবহন ব্যয় বাড়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, প্রতি কেজি পণ্যের পরিবহন খরচ ১৫ থেকে ২৫ পয়সা বাড়ার কথা থাকলেও, ব্যবসায়ীরা এর চেয়ে অনেক বেশি দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে মুড়ি ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যেও। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানান, বরিশাল থেকে পণ্য আনার ক্ষেত্রে ট্রাক ভাড়া তিন হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় মুড়ির দামে এর প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মুড়ি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে গত দুই মাস ধরে ডিমের বাজারও চড়া, যা এখন ১৬০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকাররা ট্রাক ভাড়া বাড়ার দোহাই দিয়ে নতুন করে দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন নাখালপাড়ার ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই সংকট দেখা যাচ্ছে। গত মাসের শুরুতে বোতলজাত ভোজ্যতেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা বাড়লেও পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। ব্যবসায়ীদের দাবি, কোম্পানিগুলো আরও দাম বাড়ানোর আবেদনের অপেক্ষায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে। আমদানি করা ফলের বাজারেও আগুন লেগেছে; প্রতি কেজি মালটা ও কমলা ৪২০-৪৫০ টাকা, আপেল ৩৪০-৩৬০ টাকা এবং লাল আঙুর ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম বাড়বে—বিষয়টি এমন নয়। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া এবং উৎপাদন ব্যয়ের প্রভাব কতটুকু হওয়া উচিত, তার বিশ্লেষণ বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দ্রুত দেওয়া প্রয়োজন। তিনি কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাজার তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পণ্যের দামে যৌক্তিক পরিমাণের চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ার বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, পরিবহন ভাড়া কেজিতে ২৫ পয়সা বাড়লে সেই অজুহাতে পণ্যের দাম দ্বিগুণ করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং নজরদারি বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আয় ও ব্যয়ের সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামান্য লাভ হওয়ায় তারা গায়ের দামেই পণ্য বিক্রি করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকারের নজরদারি না থাকায় ব্যবসায়ীরা মনগড়া দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর বাড়তি বোঝা চাপাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি জানান, বরিশাল থেকে তিন হাজার ২০০ কেজি হাতে ভাজা মুড়ি আনতে আগে ১৬ হাজার টাকা ভাড়া লাগত।

























