মুরগি ও ডিমের উৎপাদন খরচ ও খুচরা মূল্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, দিশেহারা খামারিরা
- আপডেট সময় : ১০:৩১:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পোল্ট্রি পণ্যের খুচরা মূল্যের তুলনায় খামারিদের বিক্রয়মূল্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা দিয়েছে। গত বুধবারের তথ্যানুযায়ী, ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও প্রান্তিক খামারিরা তা বিক্রি করছেন মাত্র ১৩৪ টাকা কেজি দরে। এতে মুরগি প্রতি ৫৬ টাকার বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। একই চিত্র ডিমের বাজারেও, যেখানে খামার পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিম ১০২ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে ভোক্তাদের তা কিনতে হচ্ছে ১৫৫ টাকায়। অর্থাৎ, হাত বদলের প্রক্রিয়ায় প্রতি ডজন ডিমে ৫৩ টাকা দাম বেড়ে যাচ্ছে। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়।
প্রান্তিক খামারিরা জানিয়েছেন, মুরগির খাবার ও ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাঁদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। অথচ সেই অনুপাতে বাজারে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়ছে না। খামারি শাফিউর রহমান জানান, গত দুই মাসেই ব্রয়লার মুরগির খাবারের দাম বস্তাপ্রতি ২২৫ টাকা বেড়েছে, যার বর্তমান দর ৫০ কেজির বস্তা ৩ হাজার ৭৮৫ টাকা। ওষুধের দামও ঊর্ধ্বমুখী। শাফিউর রহমানের হিসাব অনুযায়ী, মুরগির খাবার ও ওষুধের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁকে।
নিজের খামারের লোকসানের উদাহরণ দিয়ে শাফিউর রহমান বলেন, ১ হাজার ২০০টি মুরগি নিয়ে শুরু করা একটি চালানে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে কিছু মুরগি মারা গেছে এবং বাকিগুলো কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে খামারিদের চলতি মূলধন কমে যাওয়ায় নতুন করে খামার পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। বাকি মুরগির কিছু মারা গেছে, আর প্রায় ৭০ কেজি মুরগি এখনো খামারে রয়েছে। এতে নতুন করে বাচ্চা তোলা, খাবার কেনা এবং খামারের কার্যক্রম চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিম উৎপাদনকারী খামারি আরিফুল ইসলামের মতে, উৎপাদন খরচ ওঠানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তার খামারে প্রতি পিস ডিম ৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে, যার ডজন ১০২ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে এর দাম ১৫৫ টাকা। তিনি জানান, বর্তমানে লেয়ার মুরগির খাবারের দাম বস্তাপ্রতি ৩২৫ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৯০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ডিম বিক্রি করেও লাভের মুখ দেখছেন না খামারি।
বাজারের এই অসামঞ্জস্য নিয়ে মুরগি ব্যবসায়ী আফজাল জানিয়েছেন, কাপ্তান বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মুরগির দাম ওঠানামা করে। সেখানে রাত ও দিনের দামে পার্থক্য থাকে। তবে কেন উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত এই বিশাল দামের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উৎপাদন ব্যয় ও খুচরা বাজারের মধ্যে এই ব্যবধান শুধু খামারিদের নিঃস্ব করছে না, ভোক্তাদের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ ফেলছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও খাবারের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিকে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
খামারিরা সতর্ক করেছেন যে, নিয়মিত লোকসান হলে অনেক খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। তাই উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পোল্ট্রি খাতে এখন খামারিদের টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
























