সৌদিতে হুতিদের হামলা: ঝুঁকিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান
- আপডেট সময় : ১১:১৩:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও আঞ্চলিক অস্থিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ৪ লাখ ১৭ হাজার ৮৭১ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ৮০৪ জন। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে কর্মসংস্থানের হার ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে মন্দা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৬ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৯১।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে হুতি বিদ্রোহীদের দফায় দফায় হামলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গত দুই দিনে হুতিদের হামলায় অন্তত চারজন বাংলাদেশি কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, বিমানঘাঁটি ও বেসামরিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা সেখানে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মী পাঠানোর সংখ্যায়। ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ১ হাজার ৩৬১ জন, যেখানে গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯০৭ জন। অর্থাৎ, দেশটিতে কর্মী যাওয়ার হার ৫৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের শ্রমবাজারের অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। কাতারে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা ৬৯ হাজার ৩৪১ থেকে কমে ৪১ হাজার ৫৭২ জনে নেমেছে। কুয়েতে গত বছর ২৯ হাজার ৫৬০ জন কর্মী গেলেও চলতি বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৮৬ জনে। ইরাকের বাজারেও মন্দা অব্যাহত; গত বছরের ৩ হাজার ৯৮ জনের বিপরীতে এ বছর সেখানে গেছেন ২ হাজার ৫৭৫ জন বাংলাদেশি। ব্যতিক্রম শুধু জর্ডান, যেখানে গত বছরের ৭ হাজার ৩২২ জনের বিপরীতে চলতি বছরে ৯ হাজার ১৪৬ জন কর্মী গিয়েছেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই সময়ে ১৯ হাজার ৮৭৪ জন কর্মী গিয়েছেন, যেখানে গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৭৩১ জন। তবে অতীতে এ দেশটিতে বছরে দুই লাখের বেশি কর্মী যাওয়ার রেকর্ড থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি তার ধারেকাছেও নেই।
সামগ্রিকভাবে, চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বমোট ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জন বিদেশে গেছেন, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ লাখ ৫১ হাজার ৯৫ জন। সামগ্রিক কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গিয়ে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রেখেছিলেন, যার মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই কর্মসংস্থান হয়েছিল ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনের। তবে সে সময় মালয়েশিয়া ও ওমানের বাজার বন্ধ থাকলেও সামগ্রিক চিত্রে বড় ধাক্কা ছিল না।
প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এ বিষয়ে জানিয়েছেন, পাঁচ বছরে এক কোটি চাকরির সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি থাকলেও দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, তাই এই অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওমানের শ্রমবাজার ২০২৩ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে এবং মালয়েশিয়ার বাজার খোলার ঘোষণা এলেও এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও খুব একটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না, যা দেশের সামগ্রিক প্রবাসী আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে যুদ্ধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি প্রবাসীদের কাজ ও আয়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।























