উত্তর মেলে একটি শব্দে- আনপ্রেডিক্টেবল
- আপডেট সময় : ১১:১৭:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২
- / 136
বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ
এ যেন এক থ্রিলার সিনেমার গল্প। শুরুটা সহজ, সাবলীল; শেষজুড়ে শুধুই রহস্য। প্রথমাংশে মনে হতেই পারে, এ আর তেমন কী? এমনি তো হয় প্রতিনিয়ত। তবে শেষটা দেখে চোখ কচলে বলতে বাধ্য- ‘এ এক অদ্ভুতুড়ে চরিত্র!’ সব তো আগের মতোই, তবুও কেন এতো বৈচিত্র্য? এমনই সব প্রশ্ন যখন মনে, উত্তর মিলে যাবে একটি শব্দে- ‘আনপ্রেডিক্টেবল।’
আনপ্রেডিক্টেবল! ক্রিকেটের সমন্বয়ে শব্দটা শ্রবণে মনে ভেসে উঠে একটি দেশের নাম; একটা জাতির নাম। দেশটা পাকিস্তান। ব্যাটে-বলের লড়াইয়ে যেন এক ঘোর রহস্য, ক্রিকেটের ২২ গজে এক বৈচিত্রময় চরিত্র। পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই যেন অনিশ্চিত সৌন্দর্যের মোহনীয় এক সুর! তবে আজ কেন করবে ভুল? বরাবরের মতো সেই চিরচেনা রূপেই ফের, এ যেন সেরের উপর সোয়া সের।
‘ক্রিকেট যেখানে রঙ্গমঞ্চ; পাকিস্তান তার সদর দফতর।’ কথাটা যদিও নকল, তবে সময় অনুযায়ী সফল। উইকেটের বারিধারায়, শ্রীলঙ্কার রান খড়ায়, যখন প্রশ্ন উঠছিল মনে, ফাইনাল রঙিন হবে তো উত্তেজনার রঙে? সেখান থেকে এই অবস্থানে। কী করে! অবাক হবার কিছু নেই। কেন তাদের আনপ্রেডিক্টেবল বলা হয়, কেনইবা অনিশ্চয়তাই তাদের পরিচয়? কেনো এই শব্দটা হয়ে গেছে তাদের উপমা। এশিয়া কাপের ফাইনালেও যেন তারই উত্তর দিয়ে গেলো তারা।
কে ভেবেছিল কবে, ফিরে আসার গল্পের মাঝেও ফিরে আসার গল্প লেখা হবে? অথচ একটা সময় ভাবা হচ্ছিল, শ্রীলঙ্কা শতক ছুঁতে পারবে তো! নাকি একটি পানসে লড়াইয়ে পরিসমাপ্তি হবে এশিয়া কাপের ১৫ তম আসর? পানসেই হলো বটে। তবে খোলস পাল্টে, ভূমিকা বদলে, ৩৬০° ঘুরে, ভিন্ন চরিত্রে। হঠাৎই যেন শুরুর নীল আকাশ ছেয়ে গেলো কালো মেঘে, বিপরীতে মেঘ ডেকেও তা কেটে গেছে স্বস্তির বৃষ্টিতে। শেষ দিগন্ত রঙিন হয়েছে রঙধনুতে। অর্থাৎ, শুরুর আনন্দমুখর পাকিস্তান সময়ের সাথে ভেসে গিয়েছে বেদনার নীল স্রোতে, অপরদিকে লণ্ডভণ্ড লঙ্কা শেষটা টেনেছে হাসিমুখে।
দুটি দলই জিততে চেয়েছিল। জিততে কে না চায়? পাগলেও নাকি নিজের বুঝটা বুঝে বলে সবাই। তবে দুটি দলের কেউই নিজের জন্য জিততে চায়নি, সমৃদ্ধি কিংবা প্রশংসা পেতে লড়াইয়ে নামেনি। শিরোপা উল্লাস করতে, কিংবা পুরস্কারের লোভেও ওরা মুখোমুখি হয়নি। ওরা শুধু চেয়েছে একটুখানি সুখ, একটুখানি স্বস্তি, একটুখানি হাসিমুখের হাতছানি।
ওরা লড়াইয়ে নেমেছিল নিজের দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। দেশের মানুষের মুখে একটুখানি হাসি ফুটাতে ওরা লড়ে গেছে নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে৷ কখনো কখনো খেলা যে খেলারও উর্ধ্বে, নেভিল কার্ভাস তা বলে গিয়েছিলেন বহু বছর পূর্বে। আজ যেন তারই মঞ্চায়ন হলো এশিয়া কাপের ফাইনালে। শুধুই একটা খেলা হলেও, অনেক গল্প আছে রয়ে গেছে আড়ালে।
পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ তলিয়ে গেছে। কেঁদে চলেছে ওরা প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু শোকে। আরও কত হাজার রয়ে গেছে ‘নিখোঁজ’ শব্দের অন্তড়ালে। তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত, শতো হাজার কিলোমিটার রাস্তা হয়েছে প্লাবিত। ঘরবাড়ি, ব্যবসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত৷ খাবারের অভাব লেগে আছে, মাথা গোজার ঠাঁইও নেই অনেকখানে। ফলে তাদের জন্য হলেও ওরা জিতিতে চেয়েছে।
বিপরীতে শ্রীলঙ্কার অবস্থা সবার জানা। চরম অর্থনৈতিক মন্দায় ভোগছে দেশ। খাবার নেই, তেল নেই, বিদ্যুৎ নেই। আছে আরও কতো হাহাকার। চারদিকে আহাজারি, একটুখানি সুখের দরকার। সেই সুখ এনে দিতে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল এসেছিল এশিয়া কাপ মিশনে৷ অতঃপর যখন ফিরবে, খানিকটা হলেও সুখ নিয়ে যেতে পারবে তাদের ঝুলিতে। শিরোপার দিকে তাকিয়ে কিছুটা যন্ত্রণা হয়তো ভুলে যাবে।
প্রচলিত প্রবাদ বাক্যের মতো যেন মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে, কানে কানে রটে গেছে; সবাই জেনে গেছে, বুঝে গেছে। ‘পরে ব্যাট করলেই জয় আসে’ এমন বিশ্বাস বুকে গেঁথে গেছে। অতীতের গল্প, আর পরিসংখ্যান তত্ব; তারাও তাতে সায় দিয়েছে। ফলে টস জিতে ফিল্ডিং নিতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি কোনো দলে। পাকিস্তানও হেঁটেছিল একই পথে। পথ যে ভুল নয় তার প্রমাণ মিলেছে, প্রথম ১০ ওভারে। তবে…
লঙ্কান দর্শকরা তখনো হয়তো বসে সারতে পারেনি। কেউ হয়তো তখনো গ্যালারিতে প্রবেশ করছেন, বাকিরাও আনন্দ, উল্লাস, উচ্ছ্বাসে মেতে আছেন। এমনি সময় কিনা ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ তুর্কি তাদের হাসি কেড়ে নিলেন, হতাশার বিস্ফোরণে থমকে দিলেন। ইনিংসের তখন মাত্র তৃতীয় বল, দৌড়ে এসে তীব্র গতিবেগে নাসিম শাহ তা ছুঁড়ে দিলেন কুশল মেন্ডিসের দিকে, প্রায় ফুট খানিক বাঁক খেয়ে নিচু হওয়া সেই বলে আছড়ে পড়ল স্ট্যাম্পে। আম্পায়ারের আঙ্গুল তোলার অপেক্ষা কে করে!
বলটা হয়তো চোখেই দেখেননি গুনাথিলাকা, শব্দ শুনেই হয়তো বুঝে গেছেন যা হবার হয়ে গেছে। অফ-স্ট্যাম্পটা তখনো যেন ডানা মেলে উড়ছে। মুহূর্তের জন্য যেন সবে হতভম্ব হয়ে গেছে, তবে সেকেন্ডের ভগ্নাংশেই গ্যালারী প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ততক্ষণে ধারাভাষ্যকারের মুখ চিড়ে, ‘What a ball!’ তার সুরে। একটা বল বললাম সবে, ওভার তো হয় ছ’ বলে। সবই কি আর লেখা যাবে, একটুখানি দেখি তবে, স্পিড-মিটারে। পাওয়ার-প্লের শেষ ওভার, গণনার সূত্রে ষষ্ঠ ওভার; ‘১৫১, ১৫৩, ১৫০, ১৫১, ১৫১, ১৫২’ হারিস রউফ এর রূপকার।
রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্ক আছে কিনা কে জানে, তবে রাজাপাকসে ছিলেন আজ এক সত্যিকার রাজা চরিত্রে। প্রতিকী সিংহের অবয়বে এক আহত সিংহ হয়ে হামলে পড়েছেন পাক বোলার শিকারে। যখন মাঠে এলেন, দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে দল তখন ধুকছে। আরও দুই উইকেট চলে গেলো মুহূর্তের ব্যবধানে। পাল্টা আক্রমণ শানাতে, স্বীকৃত ব্যাটারদের কেউই নেই সাথে। তবে থমকে যাননি ভয়ে, একা হাতেই লড়েছেন বীরের মতো করে। ইনিংস শেষে যখন সাজঘরে ফিরছেন, ৪৫ বলে ৭১* তখন নামের পাশে!
পাওয়ার প্লেতে ৪৪ রান তিন উইকেটে, ১০ ওভার শেষে ৬৭ রান ৫ উইকেটের বিপরীতে। সেই দলই কিনা ১০৩ রান তুলে শেষ ১০ ওভারে, মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে! কে ভেবেছিলো কবে, ফিরে আসার গল্পের মাঝেও ফিরে আসার গল্প লেখা হবে? অথচ একটা সময় ভাবা হচ্ছিল, শ্রীলঙ্কা শতক ছুঁতে পারবে তো! নাকি একটি পানসে লড়াইয়ে পরিসমাপ্তি হবে এশিয়া কাপের ১৫ তম আসর? পানসেই হলো বটে। তবে খোলস পাল্টে, ভূমিকা বদলে, ৩৬০° ঘুরে, ভিন্ন চরিত্রে।
পুরো ম্যাচে পাকিস্তানের দাপট শুধুই শুরুর ১০ ওভারে৷ বাকি ৩০ ওভার জুড়ে ওদের দর্প চূর্ণ করে শ্রীলঙ্কা খেলে গেছে হাসিমুখে। যেখানে একটি বারের জন্যও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ বাসা বাঁধেনি আর, প্রতিপক্ষ হয়েও যেন লঙ্কানদের পক্ষেই খেলেছেন রিজওয়ান-ইফতেখার। ৫ উইকেট হারিয়েও লঙ্কা যেখানে ১০০ ছুঁয়ে নেয় ১৩ ওভারে, সেখানে পাকিস্তান মাত্র ২ উইকেট হারিয়েও হেরে গেছে সেখানে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা আসলে সাহসের খেলা। সাহসিকতায় পিছিয়ে গেলে, কখনো কখনো জিতে গেলেও, হেরে যাবেন প্রায় সময়ে।
নো বলে শুরু, অতঃপর এক হালি ওয়াইড! মাঝে একটা বল কিপারকে ফাঁকি দিয়ে সীমানায় চুমু খেয়েছে৷ অর্থাৎ, ০ বলে ৯ রান! মাদুশঙ্কার এমন লঙ্কাকাণ্ড ততক্ষণে হাসির খোড়াক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে শুধুই ‘হা হা’ রিআক্ট। হবারই কথা, এমন কীর্তি কি আর সচারাচর যায় দেখা? এর মিনিট ১৫ পূর্বে, মন খারাপেও হেসে উঠার আরো একটা মুহূর্তের দেখা মিলেছে। ‘ক্যাচ দিয়ে যেখানে ব্যাটার ফিরবে সাজঘরে, সেখানে ফিল্ডার মাঠের বাইরে; দুই ফিল্ডারের টক্করে হাত ফসকে বল সীমানার ওপাড়ে! কি অদ্ভুতুড়ে! ক্রিকেট মানেই যেখানে বিনোদন, পাকিস্তান মানেই যেন আরো একটু রসায়ন।
অপরদিকে মাদুশঙ্কায় যখন শঙ্কিত লঙ্কা; মাদুশানে তখন মিলেছে সমীকরণ। কে বলবে আগের ম্যাচেই অভিষেক তার, আজ খেলতে নেমেছেন দ্বিতীয়বার। তাতে কী আসে যায়, সাহসের সাথেই করেছেন লড়াই। র্যাঙ্কিয়ের সেরা দুই ব্যাটারের বিপরীতে নিজেকে পরিণত করেছেন আগুনরূপে। যেই আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছাড়খার পুরো পাকিস্তান। জোড়া আঘাতে তার শিকার অধিনায়ক বাবর আর ফখর জামান। ইফতেখারও ফিরেছেন তার বলে, ৩৪ রানে ৪ উইকেট তার দখলে।
বিডিসংবাদ/এএইচএস

























