ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী পান্নার সঙ্গে ‘এদেশ তোমার আমার’ টিম
- আপডেট সময় : ০৫:৫৭:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩
- / 240
আহমেদ তেপান্তর
প্রলয়কারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পাক-ভারত উপমহাদেশে শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম। দেশ ভাগের ক্ষত নিয়ে গড়ে ওঠা আজাদী মানুষের বেঁচে থাকবার সংগ্রাম, যা ছড়িয়ে পড়ে প্রতি গ্রামে, প্রতিটি গৃহে। পূর্ব বাংলার অসংখ্য গ্রামের মাঝে একটি গ্রাম কাপাশ তলিতেও তার আঁচ লাগে। সে গ্রামের পরোপকারী জমিদার বিপত্নীক খান বাহাদুর আব্দুল আজিজ আজ মৃত্যুশয্যায়। জমিদার মৃত্যুকালে জমিদারীসহ তার একমাত্র মেয়ে শাহানাকে তুলে দেন ছোট ভাইয়ের হাতে। শাহানাও তার বাবার মতো পরোপকারী। গ্রামের সংগ্রামী বীর সন্তান হারুনের সঙ্গে ভাললাগা থেকে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ওরা দুজনে মিলে সবসময় যে কোন সংকটে গ্রাম ও গ্রামের মানুষের পাশে থাকতে চায়। বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামে পানি প্রবেশ করতে থাকে। হারুন গ্রামের সবাইকে একত্রিত করে নতুন বাঁধ দিতে চাইলে- শাহানার চাচা জমিদার ও তার খাস চামচা কানুলাল বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে বাঁধের কাজে বাধা দেয়-এভাবেই এগিয়ে চলে ‘এদেশ তোমার আমার’ সিনেমা গল্প। সেলুলয়েডবন্দি হয়। সিনেমাটি ওই সময়ের আবর্তে হলেও ৪৭ পরবর্তী দেশীয় চেতনার প্রথম স্বার্থক ফসল। সিনেমাটি নির্মাণ করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ ফেরৎ তরুন ক্যাপ্টেন এহতেশাম। এই সিনেমার একটি স্থিরচিত্র ঢাকা মুভিজ পেজে জুননুন এর সৌজন্যে প্রকাশ্যে এসেছে। এতে অবিভক্ত পাকিস্তানের ধ্রুপদী নৃত্যেশিল্পের সবেচেয়ে প্রভাবশালী নৃত্যশিল্পী পান্নাকে (জারিন সুলেমান, পরিচালক এস সুলেমানের স্ত্রী। এস সুলেমান বিখ্যাত অভিনেতা সন্তোষ কুমারের ভাই) দেখা যায় ‘এদেশ তোমার আমার’ টিমের সঙ্গে।
সিনেমার দুটি গানে পান্নার নৃত্যশৈলী অন্তর্ভূক্ত ছিলো। পান্নার সঙ্গে ওই স্থিরচিত্রে নির্মাতা এহতেশাম ছাড়াও পেছনের সাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় চিত্রনায়ক রহমান, প্রযোজক বি.এ. খান, চিত্রগ্রাহক কিউএম জামান এবং অভিনেতা সুভাষ দত্তকে। ৪৭ রাজারদেউরির লিও ফিল্মসের পরিবেশনায় ১৯৫৯ সালের ২৫ ডিসেম্বরে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি ১২১ মিনিট দৈর্ঘ্যরে। এর সম্পাদনা করেছিলেন মোহাম্মদ বশির ও মুস্তাফিজুর রহমান। স্থিরচিত্রটি করাচির এক স্টুডিয়োতে তোলা। সিনেমায় একক দুটি নৃত্য পরিবেশনা করেছেন পান্না। এতে সহশিল্পী হিসেবে চিত্রনায়ক রহমান ও সুভাষ দত্তকেও স্ক্রিন শেয়ার করতে দেখা গেছে। নৃত্যে পান্নাকে যথেষ্ট আবেদনময়ী ভঙিমায় উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি চিত্রধারণ করা হয়েছে করাচিতে। পান্নার পাশাপাশি এ সিনেমাতেই একটি সমবেত নৃত্যে অংশ নেন লায়লা (পরবর্তীতে হাসান), নার্গিস, ঝর্ণা (উপমহাদেশের কিংবদন্তী অভিনেত্রী শবনম), পান্না (ঢাকা), কামাল লোহানী (সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব), অজিত, আলতামাস, আনোয়ার। এরা সকলেই ওয়াইজঘাট বুলবুল ললিতকলা একাডেমির শিক্ষাত্রী ছিলেন। পান্না নামে পরিচিত জারিন সুলেমান অবিভক্ত ভারতের শিমলায় প্রভাবশালী এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
দেশ ভাগ হলে পরিবারসহ চলে থিতু হন পাকিস্তানের করাচিতে। সাংস্কৃতিক আবহে জন্ম নেওয়া পান্না খুব ছোটবেলা থেকেই নিক্কনের শব্দে নিজেকে নিবিষ্ট করেন। ক্যারিয়ারে এই নৃত্যশিল্পী তার ধ্রুপদী নৃত্যোর মুদ্রায় বিমোহিত করেছিলেন তৎকালীন রানী দ্বিতীয় এজিাবেথ, চতুর্থ প্রিন্স আগা খান, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডি আইজেনহাওয়ার, ফিরোজ খান নুন, আইয়ুব খান, জুলফিকার আলী ভুট্টু, আফগান রাজা জহির শাহ মতো ব্যক্তিদের। পাশাপাশি তিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ইনকিলাব, বাজি, চুড়িয়া, কয়েদি, বুলবুল-ই-বাগদাদ, আজরা, নীল পর্বতসহ ৫২টি সিনেমায় অভিনয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। দুটি একক ছাড়া একটি সমবেত গানে কন্ঠ দিয়েছিলেন মাহবুবা রহমান (খান আতার প্রথম স্ত্রী), ফেরদৌসী বেগম, ফরিদা ইয়াসমীন (সাবিনা ইয়াসমীনের বড় বোন), রওশন আরা, সোহরাব হোসেন, আব্দুল আলিম, আব্দুল লতিফ, মনতোষ দেব এবং এতে বরেণ্য সংগীত পরিচালক ও সুরকার রবীন ঘোষের কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়। রবিন ঘোষ সিনেমায় খান আতার সহকারী হিসেবেও কাজ করেন। এ দেশ তোমার আমার সিনেমায় প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনিস (খান আতা) ও সুমিতা দেবী।
এছাড়াও বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রহমান, মাধুরী চ্যাটার্জী, সুভাষ দত্ত, দাগু বর্দ্ধন, স্বপ্না, সুলতান, মেজবাহউদ্দিন, বাদশাহ্, গোপালদে, জহীর চৌধুরী প্রমুখ। এ সিনেমায় নৃত্যপরিচালক হিসেবে দেব কুমার ও জি এ মান্নান কাজ করেছেন। গীতিকার, সংগীত পরিচালক এবং যৌথভাবে এহতেশামের সঙ্গে সংলাপ রচনা করেছেন খান আতাউর রহমান। পাশাপাশি আনিস নামে নায়কের ভূমিকায় মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন খান আতা। সহকারী পরিচলক হিসেবে জহির রায়হান ও মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন।


























