অথ গান্ধারী: মহাভারত আখ্যান প্রযোজনা
- আপডেট সময় : ০৭:২৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
- / 232
ড. মোঃ শুকুর আলী
সম্প্রতি রেপার্টরি নাট্যদল-প্রগতি নাট্যম বাংলাদেশ মহিলা সমিতি মিলনায়তনে মহাভারত আখ্যান অবলম্বনে ‘অথ গান্ধারী’ নাটক মঞ্চায়ন করেছে। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা করেছেন জাহারাবী রিপন। এই নাটকটি মূলত একটি কাব্যনাট্য। তবে নাট্যকার ‘সম্পাদনা নাট্য’ বলতে আগ্রহী। কারণ তিনি মহাভারতের বিভিন্ন আখ্যান বা ঘটনাবলি, কবি কাশিরাম দাস রচিত মহাভারত পাঁচলি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত গান্ধারীর আবেদন প্রভৃতির সমন্বয়ে ‘অথ গান্ধারী ’ নাটক রচনা করেন। বলা বাহুল্য, নাট্যকার জাহারাবী রিপন এজন্য এই নাটকের গঠনটাকে ‘সম্পাদনা নাট্য’ বলেত চানÑযা বাংলা নাটকের জন্য একটি নতুন নাট্য পরিভাষারূপে গৃহীত হবার মতো।
‘অথ গান্ধারী’ নাটকের গল্পে বা কাহিনিতে বিশেষ কোনো ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায় না। তবে মহাভারতের গান্ধারী চরিত্রকে ধারণ করতে বিশেষ বিশেষ আখ্যান বা কাহিনিকে এই নাটকে সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি যে, ‘অথ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অধ্যায় বা পর্ব। এ বিবেচনায় আলোচ্য নাটক ‘অথ গান্ধারী’ নামকরণ করা হয়েছে।
নাট্যকার জাহারাবী রিপন পূর্বসূরি প্রত্যেকের অবদানকে স্বীকার করেই নিজের কাব্যনাট্যে প্রবেশ করেনÑঅনন্তরে মহাভারতের স্ত্রী পর্বে বিধৃত অগম নিগম বেদনা সম্ভূত গান্ধারী আখ্যান শুরু করছিÑযদুবংশে সুবল নামেতে নৃপমণি/গান্ধারী নামেতে কন্যা তাহার নন্দিনী। পাঁচালির বর্ণনায় ফুটে উঠে গান্ধারীর জীবন কথন। এতে স্বর্গ-মর্ত্যরে অপরূপ গান্ধরীর জন্মবৃত্তান্ত কাহিনি ও পরিবেশ ফুটে উঠে। তারপর নাটকের পতিব্রতা গান্ধারী নাট্যদৃশ্যে আগমন করেনÑআমি গান্ধারী-ভারত কবিগণের পরণকথার পুরনারী। আমি কৌরব কুলবধূÑঅন্ধকার গৃহবাসে বসি নিরখি আমি কুরুক্ষেত্রভূমি।
নাটকের পটদৃশ্যে মহাভরতের উল্লিখিত গান্ধারীর শোক, মনোবেদনা, হাহাকার, ক্ষোভ, ক্রোধ, রোদনধ্বনির প্রভৃতির প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়েছে। নাটকের অন্যান্য ঘটনা বা চরিত্র গৌণ ও প্রাসঙ্গিক মাত্র। নাটকের মঞ্চায়নে দৃশ্যপট বা মঞ্চসজ্জা খুব একটা চোখে পড়ে না। পিছনে উপর থেকে রশিতে ঝুলানো পাতাসদৃশ অরণ্যের সাজেশান এবং তারও সামনে বক্সের মতো ৩টি বেদি বা আসন। আর পিছনের মধ্য বরাবরে প্রজেক্টরে দৃশ্যাদি প্রক্ষেপনের জন্য শাদা পর্দার আয়োজনÑএই হলো মঞ্চসজ্জা। মঞ্চের ডান পাশে উইংসের কাছে যন্ত্রীদলের বসবার স্থানও লক্ষ করা যায়।
নাটকের শুরুতে দেখা যায়, লিপিকর বা নাট্য প্রণেতার নান্দীপাঠ। তিনি পুস্তক হাতে মঞ্চে প্রবেশ করেন এবং আদি নাট্য কুশীলব ও নাটকে বিদ্যমান কুশীলবগণের উদ্দেশে স্তূতিবাক্য পাঠ করেন। অতঃপর কখনও একক আবার কখনও বৃন্দ উপস্থাপনায় কেরিওগ্রাফি, গান ও নৃত্যের আবহে নাটক এগিয়ে চলে। এই নাটকে নির্দেশক অন্ধ গান্ধারীকে চোখ বাঁধা অবস্থা থেকে তার দিব্যদৃষ্টির কল্যাণে স্বাভাবিকভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করেন, যা অবশ্যই নির্দেশকের এক অভিনব প্রয়াস বা কৌশল বলতে হবে। তবে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে যথাযথ অন্ধ হিসেবেই মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে। নাটকের গানে পাঁচালির পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের ব্যবহারে যে সকল কাহিনী বলা হয়েছে তাতে গান্ধারীর মনোবেদনার পূর্বপটে কুরুক্ষেত্র, ভীষ্মের মৃত্যুসজ্জা, কর্ণের মৃত্যুকথা, শ্রীকৃষ্ণকে গান্ধারীর অভিসম্পাত, যুধিষ্ঠির- ভীমের প্রতি গান্ধারীর অনুযোগ-অভিযোগ প্রভৃতির সমাহার লক্ষ করা গেছে। এই নাটকে আরও কয়েকটি মনোগ্রাহী সঙ্গীত সম্বলিত নৃত্যের যোজনা লক্ষ করা যায়। নাটকে গান্ধারীর চরিত্রে উচ্চারিত সংলাপ ও অভিব্যক্তি এই নাটককে বিশেষ ব্যাপ্তি প্রদান করেছে। নাটকের শেষাংশে দুজন গান্ধারীকে দেখা গেলেও পরিশেষ অংশে একজনই নাম-ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এই অংশে অভিনয় করেছেন সানজিদা আক্তার। নাটকের অন্যান্য চরিত্রের অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন রাজিব, তন্ময়, আফসানা মীম, রিফাত, রাকিব, আবিদা, পলা প্রমুখ।
নাটকের সঙ্গীত প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও বেশ ত্রুটি দেখা গেছে। প্রজেক্টর দৃশ্য ব্যবহারেও কিছু সমস্যা ছিল। সংলাপ প্রক্ষেপণে কারো কারো মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব দেখা গেছে। নাটকের সঙ্গীত ও সংলাপের ভাষা উচ্চাঙ্গের বিবেচনায় এরূপ হওয়া স্বাভাবিক। নাটকের পাণ্ডুলিপিতে মহাকাব্যিক ভাষার যে বিস্তার দেখা যায়, তাকে মঞ্চে যথাযথ উপস্থাপনার জন্য আরও অনুুুুশীলন ও সতর্কতার প্রয়োজন। নাটকের চরিত্রানুগ পোশাক প্রশংসার দাবি রাখে। আগামিতে নাটকটি আরও পরিশীলিত ও সুন্দর হবে-এই আশা ব্যক্ত করছি। নাট্যকার-নির্দেশক জাহারাবী রিপন ও প্রগতি নাট্যমকে সাধুবাদ জানাই।


























