জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে রোমহর্ষক সাক্ষ্য সাবেক সেনা কর্মকর্তার
- আপডেট সময় : ০৩:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 4
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিস্ফোরক সাক্ষ্য দিয়েছেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। বৃহস্পতিবার তিনি আদালতে হাজির হয়ে দীর্ঘদিনের এসব রোমহর্ষক অভিযানের বর্ণনা দেন। সাক্ষী জানান, ২০১০ সালের মে মাসে পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ অন্তত ১৫ জনকে গুলি করে হত্যার পর পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। জিয়াউল আহসান এই নৃশংস প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছিলেন ‘গল্ফ অপারেশন’।
তৎকালীন এনটিএমসি মহাপরিচালক ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, প্রসিকিউশনের কাছে মেজর সাব্বিরের এই সাক্ষ্য জিয়াউলের অপরাধ প্রমাণের জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল। প্রসিকিউটর আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তা ধামাচাপা দিতে জিয়াউল আহসান একে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা পরিকল্পিত নাটকের রূপ দিতেন। র্যাবের তৎকালীন মিডিয়া উইং প্রধান সোহেলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিককে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে অপারেশন স্থল চরদোয়ানীতে নিয়ে যাওয়া হতো, যাতে সাজানো তথ্যগুলো গণমাধ্যমে প্রচার করা যায়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে এই সংশ্লিষ্টতাকে ‘অ্যাবেটমেন্ট’ বা অপরাধে সহযোগী হিসেবে গণ্য করা হবে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।
আদালতের জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির উল্লেখ করেন, জিয়াউল আহসান নিজস্ব বিশ্বস্ত দল নিয়ে ভিকটিমদের ঢাকা থেকে বরগুনার পাথরঘাটার চরদোয়ানীতে নিয়ে যেতেন। সেখানে তাদের পরিচয় গোপন রেখে ট্রলারে তোলার পর কানের পাশে বা মাথায় বালিশ চেপে ধরে গুলি করা হতো। এরপর মরদেহ যেন ভেসে না ওঠে, সেজন্য পেট কেটে সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হতো। বিডিআর বিদ্রোহের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুলসহ চারজনকে হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করে সাক্ষী জানান, লাশ ভেসে উঠলেও জিয়াউল আহসান উল্টো বিষয়টির ফলোআপ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে কোনো তদন্ত না হয়। এর মূল লক্ষ্যই ছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় আলকাস মাঝির বিষয়েও আদালতে গুরুত্ব পায়। অভিযানের সময় ট্রলার চালানো এই ব্যক্তি বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ফাঁস করতে শুরু করলে জিয়াউল আহসান তাকে ‘এলিমিনেট’ বা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। মেজর সাব্বির এতে রাজি না হওয়ায় জিয়াউল নিজেই বিষয়টি তদারকি করেন। এরপর আলকাস মাঝি আর ফিরে আসেননি, যা পরিস্থিতিগত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তার হত্যাকাণ্ডের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাক্ষী জানান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের শীর্ষ মহলের সরাসরি মদদ ও একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকায় জিয়াউল আহসানের নির্দেশ অমান্য করার সাহস র্যাব-৮ কিংবা র্যাব-৬ এর কোনো কর্মকর্তার ছিল না। প্রতিবাদ করতে গেলে কোনো প্রতিকার পাওয়া যেত না। এমন নৃশংসতা দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেজর সাব্বির নিজেই এক পর্যায়ে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। প্রথম অপারেশনের পর গাড়িতে জিয়াউল আহসান দম্ভের সাথে বলেছিলেন, ‘এরা রাষ্ট্রের শত্রু, এদের এইভাবেই শেষ করে দিতে হয়।’ প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে ভিকটিমদের এমনভাবে ঢেকে রাখা হতো যে তারা পুরুষ না নারী, বোঝার উপায় ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গল্ফ খেলায় যেভাবে বল গর্তে ফেলা হয়, ঠিক তেমনি মানুষ হত্যা করে লাশ নদীতে ডুবিয়ে চিরতরে গুম করে দেয়ার এই প্রক্রিয়াকে জিয়াউল আহসান সামরিক সাংকেতিক ভাষা বা কোডনেম হিসেবে ‘গল্ফ’ বলে ডাকতেন। চাকরির আরও তথ্য: পরবর্তী সময়ে গভীর অনুশোচনা ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মেজর সাব্বির নিজেই চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।




















