ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপট
- আপডেট সময় : ১২:৩২:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 7
ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইতিহাসের পাতায় জেনারেল ডায়ারের মতো ব্যক্তিদের বর্বর কর্মকাণ্ডের পর ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করলেও, হাউস অব লর্ডসের হস্তক্ষেপে তিনি সসম্মানে অবসর গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। এটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার এক কালো অধ্যায়ের প্রতিফলন। এই নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের পরও একদল ব্রিটিশ নাগরিক ডায়ারকে রত্নখচিত তরবারি উপহার দিয়েছিলেন, যা ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা কেবল ভারতবর্ষে শাসন জারি রাখেনি, বরং এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল জুড়ে নিজেদের সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখতে ভারতীয় সৈন্যদের প্রধান অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেছিল। উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মন ও মননে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্রিটিশসহ ইউরোপীয় শক্তিগুলো প্রতারণা, লুণ্ঠন ও গণহত্যার মতো কৌশল অবলম্বন করেছে। এই প্রক্রিয়ার তিনটি প্রধান কৌশলের মধ্যে একটি ছিল জ্ঞান ও সংস্কৃতির অপব্যবহার।
ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে ইতিহাসে বীর হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, তিনি ছিলেন স্পেনের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের অন্যতম কারিগর। ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর বাহামা দ্বীপপুঞ্জের গুয়ানাহানি দ্বীপে পা রাখার পর কলম্বাসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল চরম স্বার্থান্বেষী। তিনি লিখেছিলেন, স্থানীয় লোকজন খুব ভালো চাকর হতে পারবে এবং খুব সহজেই তাদের পদানত করা সম্ভব। কলম্বাস স্থানীয়দের অতিথিপরায়ণতাকে পুঁজি করে তাদের জোরপূর্বক দাস বানিয়ে স্বর্ণের খনি সন্ধানে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।
কলম্বাস হাইতিসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্বর্ণের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং ব্যর্থ হয়ে ১৪৯৫ সালে ভয়াবহ নিপীড়ন শুরু করেন। তিনি ১৫০০ জন আরাওয়াক নারী, পুরুষ ও শিশুকে বন্দী করেন এবং ৫০০ জনকে বাছাই করে স্পেনে দাস হিসেবে প্রেরণ করেন। পরবর্তীকালে এই দাস ব্যবসার রীতি প্রায় চারশ’ বছর ধরে টিকে ছিল। কলম্বাস তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, এখন থেকে সকল বিক্রয়যোগ্য দাসকে পবিত্র ত্রয়ীর নামে স্পেনে পাঠানো যেতে পারে।
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সবসময়ই দেশীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং দাসত্বের পথ বেছে নিয়েছিল। কলম্বাস যখন তার অভিযানে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দেওয়ার চাপের মুখে পড়লেন, তখন হাইতির সিরাও প্রদেশের স্থানীয়দের ওপর তিনি অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে স্বর্ণ সংগ্রহের আদেশ দেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ জমা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর চলত নিষ্ঠুর নিপীড়ন।
পরিশেষে, উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আলোচনায় এই ঐতিহাসিক সত্যগুলো সামনে থাকা জরুরি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কিংবা কলম্বাসের আমেরিকা অভিযান—উভয় ক্ষেত্রেই তথাকথিত সভ্যতা বিস্তারের আড়ালে ছিল শোষণ ও দাসত্বের বীভৎস ইতিহাস। আজকের বিশ্বরাজনীতিতে ঔপনিবেশিক মানসিকতার যে রেশ রয়ে গেছে, তা এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতারই এক ধারাবাহিক ফলাফল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-৩। চাকরির আরও তথ্য: দেশে-বিদেশে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়ার ফলে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স জেনারেল ডায়ারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয় এবং তাকে চাকরি থেকে ‘অব্যাহতি’ দেয়া হয়; কিন্তু অনতিবিলম্বে ‘হাউস অব লর্ডস’ সে নিন্দা প্রস্তাব প্রত্যাহার। 6. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ নাগরিক একটি রত্নখচিত তরবারি ও চাঁদা তুলে সংগৃহীত ২৬,৩১৭ পাউন্ড উপহার দিয়ে বীরের সম্মান দান করে।৭ এই কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে উপনিবেশিত জনগণের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের হীনদৃষ্টিভঙ্গি যেমন প্রকটিত হয়, তেমনি ভারতীয়দের হত্যা করার জন্য ভারতীয় সৈন্য ব্যবহারের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এই ভারতীয় গরিব সৈন্যদের শুধু ভারতবর্ষে নিজেদের শাসন জারি রাখার জন্যই ব্যবহার করেনি, ‘দুনিয়াব্যাপী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখতে, বিশেষত পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ। 8. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতদসত্ত্বেও, ফার্গুসনের স্বপ্রণোদিত প্রশ্নের কিছুটা ন্যায্যতা আছে, কিন্তু তার উত্তরটি নিতান্তই অসম্পূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেননা, কোনো উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র বা তার পৃষ্ঠপোষকতাভোগী কোনো সশস্ত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো দেশকে ছলে বা বলে, কিংবা উভয় উপায়ে, একবার দখল করে উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই, দখলীকৃত দেশ বা তার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির বশীভূত হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তিকে নানা সময়ে, নানা কারণে, নানা ধরনের বিদ্রোহ, শুধু বল প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করলেই চলে না, বরং সেসব দ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করে নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করার জন্য দখলদার শক্তিকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মন ও মননের ওপর।


























