এ্যানি ফেরদৌসের কন্যা তাসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৬:২০:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / 3
আবীর আলমগীর: জীবন যে কতটা অনিশ্চিত, কতটা নির্মম হতে পারে, তারই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে রইল তাসিন ফেরদৌসের আকস্মিক মৃত্যু। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, জীবনের সম্ভাবনাময় সময়ে, স্বামী, শিশুসন্তান, মা-বাবা আর অসংখ্য প্রিয়জনকে রেখে চিরবিদায় নিলেন নিউইয়র্কের মেধাবী নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাসিন ফেরদৌস। গত ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই চলে যাওয়াকে জীবনের অনিশ্চয়তার এক চরম বাস্তবতায় দেখছেন স্বজনরা। তাসিন ছিলেন নিউইয়র্কের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এ্যানি ফেরদৌস এবং বিশিষ্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জাফর ফেরদৌসের একমাত্র কন্যা। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাসিন দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন।
নতুন স্বপ্নের অকাল সমাপ্তি
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই স্বামী এড্রিয়ান ও শিশুপুত্র লুকাসকে নিয়ে কুইন্সে নিজেদের সদ্য কেনা নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন তাসিন। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন করে সংসার সাজানোর কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা! কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই স্বপ্নের সংসার আর সাজানো হলো না। তাসিনের অকালমৃত্যুতে পরিবারসহ পুরো কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য গুণগ্রাহী, যারা তাঁর এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। একটি সাজানো সংসারের স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোক আর অপূরণীয় শূন্যতায়। যে বয়সে নিজের সন্তানকে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখার কথা, নতুন বাড়িতে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার কথা, নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করার কথা, ঠিক সেই বয়সেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তাসিন। তাঁকে ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। নতুন বাড়ির প্রতিটি ঘর, প্রতিটি কোণে হয়তো জড়িয়ে ছিল তাসিনের অসংখ্য স্বপ্ন।
শারীরিক অসুস্থতা ও হাসপাতালের ভূমিকা
তাসিন ফেরদৌসের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। মৃত্যুর আগের দিনগুলোর কষ্টের কথা স্মরণ করে পরিবার জানিয়েছে, গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার তাসিন হঠাৎ হাতে অসহনীয় ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার কারণে তিনি তৎক্ষণাৎ মা এ্যানি ফেরদৌসকে ফোন করে বিষয়টি জানান। পরিবারের পরিচিত এক চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করার পর, দ্রুত তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তাসিনের পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তির পরও তাঁর শারীরিক সমস্যাকে শুরুতে তেমন গুরুত্বসহকারে দেখা হয়নি। পরিবারের দাবি, সেখানেও তাঁর শারীরিক সমস্যাকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি, যার ফলে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তাসিন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এই সংক্রমণ কেন আগে শনাক্ত করা যায়নি এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা নিয়ে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন দানা বেঁধেছে। তাসিনের অকাল প্রস্থান এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতনের মতো, যার শূন্যতা পরিবার কোনোভাবেই পূরণ করতে পারবে না। সামান্য হাতব্যথা থেকে মৃত্যু, কী ঘটেছিল সেই কয়েক দিনে: তাসিনের মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি আপাতসাধারণ শারীরিক সমস্যা এত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, পেশিতে টান বা মাসল পুলের কারণে ব্যথা হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে একই সমস্যা নিয়ে তিনি নিউইয়র্ক প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালেও যান। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা শুনে উদ্বিগ্ন মা ছুটে যান তাঁর বাসায়। সেখানে গিয়ে মেয়ের হাতের অবস্থা দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এ্যানি ফেরদৌস। পাশাপাশি হাতে ছোট ছোট ক্ষতও দেখা যাচ্ছিল। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। শুক্রবার রাত থেকে রোববার ভোর, এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি প্রাণবন্ত তরুণীর এমন করুণ পরিণতি পরিবার, স্বজন এবং পরিচিতজনদের কাছে এখনো অবিশ্বাস্য। প্রাথমিকভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আশঙ্কা করা হলেও কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটল কেন, এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত বা অটোপসির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে পরিবার আশা করছে। সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া গেলে কি তাসিনের জীবন বাঁচানো যেত। এসব প্রশ্ন এখন শোকাহত পরিবারের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে প্রথম দুটি হাসপাতালে তাসিনের চিকিৎসার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।





















