তিনটি আইন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আইনমন্ত্রীকে অ্যামনেস্টির চিঠি
- আপডেট সময় : ০৮:১৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 7
বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রস্তাবিত ও প্রণীত তিনটি পৃথক আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন ২০২৬ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
বৈঠকের ধারাবাহিকতা ও চিঠির উদ্দেশ্য
গত ২৬ অক্টোবর পাঠানো এই চিঠিতে উল্লিখিত আইনগুলোর বিভিন্ন ধারা ও বিধান নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। সংস্থাটি জানায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে আইনমন্ত্রীর সাথে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিবের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ধারাবাহিকতায় চিঠিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা সংশোধনীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঝুঁকি
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটি উল্লেখ করে যে, অতীতের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ নাগরিকের স্বাধীন বাকস্বাধীনতা হরণে ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন সংশোধনী সেই বিতর্কিত ধারাগুলোর সমাধান না করে বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
- প্রস্তাবিত আইনের ৮(২) ধারায় অনলাইনে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অপসারণ বা ব্লক করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা অতিরিক্ত কিছু সংস্থাকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, বিশৃঙ্খলা ছড়ানো, ব্যক্তির মানহানি কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি ‘অশ্রদ্ধা’ প্রকাশের মতো অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট সরাবে কর্তৃপক্ষ।
- অ্যামনেস্টির মতে, স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় এসব বিধানের অপব্যবহার করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হবে।
- কনটেন্ট বা তথ্য সরাতে তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের পূর্ব অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবটিকেও আশঙ্কাজনক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইনের সংশোধনীতে অপমান, মানহানি, হয়রানি এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয়গুলোকে অপরাধের আওতায় এনে শাস্তির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। অ্যামনেস্টি আশঙ্কা করছে, অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সরকারের সমালোচকদের কণ্ঠরোধে এটি ব্যবহার হতে পারে। প্রস্তাবিত আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার সুযোগ রাখা হয়েছে, ফলে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা।
গুম প্রতিরোধ আইন সংস্কারের সুপারিশ
বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগকে অ্যামনেস্টি স্বাগত জানিয়েছে, তবে তা আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদের সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কয়েকটি সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করার পর তা অস্বীকার করা অথবা ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখার দায়িত্ব একই কর্মকর্তার হতে হবে—এমন শর্ত আইনে রাখা অনুচিত।
আইনি জটিলতা ও শাস্তির বিধানের প্রতিক্রিয়া
অ্যামনেস্টি চিঠিতে উল্লেখ করেছে, কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর জাতীয় নিরাপত্তার অযুহাতে তার গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখার ব্যবস্থা বাতিল করা দরকার। এছাড়া আইনের ৬ ধারায় থাকা মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং ১৮ ধারায় থাকা আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের সুযোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে সংস্থাটি। অ্যামনেস্টি মৃত্যুদণ্ড স্থগিত ও বিলোপের আহ্বান জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ এবং পরবর্তী সময়ে এ দণ্ডের পূর্ণ বিলোপের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
একই সাথে, গুম প্রতিরোধ আইনের ২১ ধারায় মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের বিধান নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এই কঠোর শাস্তির আশঙ্কায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার অভিযোগ জানাতে সংকুচিত হতে পারে।
এসআরবি গঠন ও র্যাবের অতীতের দায়বদ্ধতা
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন ২০২৬ নিয়েও আপত্তি তুলেছে সংস্থাটি। অ্যামনেস্টি স্পষ্ট করে যে, নাম পরিবর্তন করে নতুন এই বিশেষ বাহিনী গঠন করা হলেও মূলত পূর্বের র্যাবের সদস্য, সম্পদ ও সকল ক্ষমতা নতুন ইউনিটে দেওয়া হয়েছে।
- র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর এবং বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ বিদ্যমান।
- কোনো রকম নিরপেক্ষ তদন্ত বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই পুরনো সদস্যদের নতুন বাহিনীতে নেওয়া এসআরবি আইনের একটি বড় দুর্বলতা।
- কেবল কাঠামোগত নাম পরিবর্তন করলেই অতীতের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না; তাই নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা আবশ্যক।

























