মতিঝিলের বাংলার বাণী ভবন এখন প্রতিমন্ত্রীর অনুসারীদের দখলে
- আপডেট সময় : ০৬:৫৬:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
মতিঝিলের ৮১ নম্বর ঠিকানার চারতলা বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ‘বাংলার বাণী ভবন’টি বর্তমানে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৫৩ বছর আগে নির্মিত এই ভবনটির গায়ে জড়িয়ে আছে নানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ। এক সময় এখান থেকে উর্দু ভাষায় খবর ছাপা হতো এবং পরবর্তীতে এটি অন্যতম প্রভাবশালী বাংলা দৈনিকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ভবনটি বারবার দখলের চেষ্টার শিকার হয়েছে। সবশেষ প্রাপ্ত তথ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির সিংহভাগ অংশ এখন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের কব্জায় চলে গেছে। মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বহু ইতিহাসের সাক্ষী চারতলা ভবনটি। ৫৩ বছরের পুরাতন এই ভবনটির দেয়ালে লেপ্টে আছে বহু ইতিহাস। ভবনে থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী, আশপাশের ভবনে চাকরি করেন এমন ব্যক্তি ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা মিলেছে।
ভবনটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, কেবল একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা বাদে ভবনের বাকি অংশ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। ৫ই আগস্টের ঘটনার পর থেকে ভবনটি ঘিরে অস্থিরতা শুরু হয়। প্রথম দফায় উত্তেজিত জনতা ভবনটিতে হামলা চালায়। পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তি এবং এরপর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও ভবনটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালান, তবে তারা শেষ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। সবশেষে মাঠে নামে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। দলটির সভাপতি নুরুল হক নুরের নির্দেশেই ভবনটির দুটি তলায় তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ভবনের পেছনের অংশে ‘পানসি’ নামে একটি রেস্টুরেন্টও চালু করা হয়েছে, যার মালিকানায় গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন। শুধুমাত্র একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রমে ব্যবহার হওয়া অংশ তারা দখলে নিতে পারেনি। প্রকৃত মালিকের অনুপস্থিতিতে সমন্বয়ক পরিচয়ধারী নেতারা ভবন দখলে নিতে হানা দেন। ভবনটির পেছনের অংশে সম্প্রতি একটি খাবারের রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মালিকানায় গণঅধিকার পরিষদ পরিচয় দেয়া এমন ব্যক্তিরাও আছেন।
ভবনটির মালিকানায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কদিন আগেই তিনি বিদেশে পাড়ি জমান এবং এখনো ফেরেননি। প্রিমিয়ার ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০০২ সাল থেকে বৈধ চুক্তির মাধ্যমে তারা ভবনের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অভ্যুত্থানের পরবর্তী কয়েক দিনে সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া কিছু যুবক ব্যাংকের শাখায় গিয়ে ভাড়া দাবি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছিল, কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো অর্থ দেয়নি। এছাড়া ওই সময়ে ভবনের তিন ও চারতলায় থাকা তাপসের ব্যক্তিগত ল চেম্বার ও রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে জিনিসপত্র লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পুরো বিষয়টি তদারকি করছেন নুরুল হক নুরের আত্মীয় পরিচয়দানকারী সারোয়ার হোসেন সানী এবং তার সহযোগী সুমন নামের এক ব্যক্তি। সুমন বিএনপির একটি অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলেও এলাকায় পরিচিত। ভবনের নিচতলায় ‘ওহ চিটাগাং’ নামক ছোট দোকানের মালিক মামুন বাবু জানিয়েছেন, তিনি ছয় হাজার টাকা ভাড়ায় দোকানটি সুমনের কাছ থেকে নিয়েছেন। ব্যাংক সূত্র আরও জানায়, তারা গণঅধিকার পরিষদের লোকজনের পক্ষ থেকে বারবার হুমকি ও ভাড়া দাবি পাওয়ার পরেও ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বর্তমানে ভবনের সিঁড়ির মুখে তালা লাগিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ তলার নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে বজায় রাখা হচ্ছে।
ভবনের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭১ সালের আগে এটি ছিল পাকিস্তানপন্থি উর্দু দৈনিক ‘পাসবান’-এর কার্যালয়। স্বাধীনতার পর এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১৯৭২ সালে শেখ ফজলুল হক মণি এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘বাংলার বাণী’র কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে আধুনিক অফসেট প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছিল এখানে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মণি নিহত হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যায়। পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক শাসনামলে ভবনটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এর দখল ফিরে পান এবং সেখানে নিজের অফিস খোলেন। ওই বছরই ভবনের নিচে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, যা ছিল বেশ আলোচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে মতিঝিল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামান তালুকদার জানিয়েছেন, এ বিষয়ে থানায় এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি।























