মদিনা ফ্লাইটের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানি: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
- আপডেট সময় : ১২:৩৭:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
গত ১ অক্টোবর মদিনা থেকে ২৭২ জন যাত্রী নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটটি ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এই ফ্লাইটে ওমরাহযাত্রীদের পাশাপাশি বিরোধী দলীয় ৩৪ জন সংসদ সদস্যসহ ৫৪ জন ভিআইপি যাত্রী ছিলেন। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটির নির্ধারিত আগমনের সময় ছিল, কিন্তু অবতরণের পর বিমানটিকে বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধা না দিয়ে দূরে পার্কিং করানো নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ফ্লাইটটিতে বিরোধী দলের ৩৪ জন এমপিসহ মোট ৫৪ জন ভিআইপি মর্যাদার যাত্রী ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাখাওয়াত ফ্লাইটটির LDM (Load Distribution Message) আগেই গ্রহণ করেছিলেন।
বিমানবন্দরের তৎকালীন সক্ষমতা অনুযায়ী আটটি বোর্ডিং ব্রিজের মধ্যে দুটি রক্ষণাবেক্ষণে থাকলেও ছয়টি সচল ছিল। অথচ মদিনা থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ এই ফ্লাইটটিকে সংশ্লিষ্টরা ৪ ও ৮ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধা দেয়নি। ফ্লাইটটি থার্ড টার্মিনালের ব্রাভো-১৪ নম্বর বে-তে পার্কিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যা যাত্রীদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে দুটি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে ব্যবহার করা হচ্ছিল না। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন বাকি ছয়টি বোর্ডিং ব্রিজ সচল ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এর পরবর্তী এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত ৪ ও ৮ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজ অব্যবহৃত থাকার পরও মদিনা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক ওমরাহযাত্রী ও ভিআইপি যাত্রী বহনকারী ফ্লাইটটিকে বোর্ডিং ব্রিজের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি।
যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার তালিকায় যুক্ত হয়েছে জমজমের পানির কন্টেইনার নির্ধারিত সময়ে না পাওয়ার অভিযোগ। ফ্লাইটের ব্যাগেজ বেল্টের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিমান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত এবং তার সহযোগী সাদ্দাম হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, সাখাওয়াত ফ্লাইটের লোড ডিস্ট্রিবিউশন মেসেজ (এলডিএম) আগে থেকেই গ্রহণ করেছিলেন। ব্যাগেজ আপলোডের সময় সংশ্লিষ্টদের সরাসরি উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ তাদের গাফিলতিতেই জমজমের পানির কন্টেইনারটি সময়মতো পৌঁছায়নি। এতে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভিআইপি প্রটোকল নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সহকারী ব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন (বস্তা জসিম) তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে, ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সাখাওয়াতসহ দুই কর্মীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। তবে ইন্ডিগো ও সৌদিয়ার মতো ফরেন ক্যারিয়ারের দায়িত্বে থাকা কর্মী মনিরুলকে কেন এ ঘটনায় শাস্তির আওতায় আনা হলো, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, অনেক কর্মীই বিমান শ্রমিক লীগের সক্রিয় নেতা, কর্মী বা ডোনার হিসেবে পরিচিত। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঘটনাটির সময় তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। স্টেশন ম্যানেজমেন্টের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহিদ এবং পুরো ব্যবস্থাপনা দলের গাফিলতি ছিল কি না, তা বের করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা সম্ভব। জমজমের পানির কন্টেইনার দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা কোথায় ছিল এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তখন কোথায় ছিলেন, তা ফুটেজে স্পষ্ট হওয়া উচিত। কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাগেজ এরিয়ার ফুটেজ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করেনি, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতাভুক্ত করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর ট্রলির সংকট যাত্রীদের জন্য নিত্যদিনের ভোগান্তি। মদিনা থেকে আসা ফ্লাইটটি বোর্ডিং ব্রিজের সঙ্গে যুক্ত করা হলে এ ধরনের অনেক সমস্যার সমাধান করা সহজ হতো। অপারেশনাল রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে এই ব্যর্থতার কারণ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়া দরকার।
ঘটনাটি শুধুই প্রশাসনিক বিচ্যুতি, নাকি এর পেছনে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা ছিল—সেটিরও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান জরুরি। কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে, যাতে কেউ অন্যায্যভাবে হয়রানির শিকার না হন।
ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের রেকর্ড, ফ্লাইটের এলডিএম, ব্যাগেজ লোডিং ও আনলোডিংয়ের নথিপত্র, কর্মীদের ডিউটি রোস্টার এবং স্টেশন ম্যানেজমেন্টের নির্দেশনাবলী পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সামগ্রিক পরিস্থিতির স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের বিকল্প নেই।





















