স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনে সরকারের বিশাল কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ
- আপডেট সময় : ১১:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / 0
দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ব্যাপক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৫ বছরের দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ভেঙে পড়া পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যে এই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান সরকার পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় বাংলাদেশে নার্সের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, কেবল এক বা দুটি প্রকল্প নয়, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকাঠামো পুনর্গঠনই সরকারের মূল লক্ষ্য। এরই অংশ হিসেবে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের জন্য ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীরও ঘাটতি রয়েছে। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী একে দেশে প্রথম এ ধরনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বর্তমানে অনেক উপজেলার জনসংখ্যা ৮ থেকে ১০ লাখ হলেও সেখানে ৩০ বা ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। কোনো কোনো উপজেলায় এখন ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষকে সেবা দিতে হচ্ছে।
এ সমস্যা সমাধানে দেশের ৫০৩টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে।
এর মধ্যে ১৮টি হাসপাতাল ৫১ শয্যায়, ৩০৫টি ১০১ শয্যায়, ৮৩টি ১৩২ শয্যায়, ১৩টি ১২০ শয্যায় এবং ২৪টি হাসপাতাল ১৫১ শয্যার উন্নীত হবে। পাশাপাশি ৪৪৩টি উপজেলায় বহুতল সেবাভবন এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক-নার্সদের আবাসন নির্মাণ করা হবে।
উন্নীত এসব হাসপাতালে আইসিইউ, করোনারি কেয়ার, ওয়ান স্টপ জরুরি সেবাসহ সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসার শনাক্তকরণ, ফিজিওথেরাপি এবং স্ট্রোক রোগীদের চিকিৎসার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। নতুন ও পুনর্নির্মিত স্থাপনাগুলোতে আসবাবপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশপথ নিশ্চিত করা হবে। ফলে দূরবর্তী এলাকার রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আরও ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর অধীনে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ১ হাজার ৬৩১টি স্বাস্থ্য হাব স্থাপন করা হবে। ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল মেয়াদী এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫ হাজার ৯৩৬টি স্থাপনা পুনর্নির্মাণ ও ৮ হাজার ৩৪৮টি আধুনিকায়ন করা হবে। এর আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসক-নার্সসহ বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, আধুনিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা চালু এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মেরামত হয়নি। অন্যদিকে কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪২৮টি পুনর্নির্মাণ, ৬০৫টি সংস্কার এবং ৫৯৮টি নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ প্রশিক্ষিত এসব কর্মী অন্তত দুই মাসে একবার প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেবেন। এতে চিকিৎসার ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত খরচও বহন করতে গিয়ে রোগী ও তাদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েন।
এই নতুন স্বাস্থ্য কাঠামোতে ১ লাখ ৪০ হাজার প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী যুক্ত হবেন। তারা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি রক্তচাপ ও গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করবেন, যাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায়।
জনবল সংকট দূর করতেও বড় ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং এরই মধ্যে প্রথম আট মাসে হাজার হাজার চিকিৎসক উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার ৫০০ নার্স এবং আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সব মিলিয়ে বর্তমানে কর্মরত ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আরও ১ লাখ কর্মী যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজারে উন্নীত হবে। একই সঙ্গে আরও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ক্যানসার চিকিৎসার ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। দেশের সক্ষমতা বাড়াতে ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর এবং পাঁচটি রোবটিক সার্জারি যন্ত্র কেনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাভারে একটি বিশেষায়িত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট স্থাপন করছে সরকার, যা আগামী ১ জানুয়ারি উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে। এখানে সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের মূলত রোগীর চিকিৎসাসেবার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট কাটাতে ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের দরপত্র শিগগিরই আহ্বান করা হবে। অনেক উপজেলায় অচল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রের মতো মৌলিক রোগ নির্ণয় সুবিধার অভাব রয়েছে, যা এই কর্মসূচির মাধ্যমে দূর করা হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসা এখনো মূলত ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক।
























