চিরনিদ্রায় শায়িত নায়করাজ
- আপডেট সময় : ০৯:২০:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৭
- / 360
বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। আজ বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান নায়করাজ রাজ্জাক। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) নেওয়া হয় এই কিংবদন্তির লাশ। সেখানে একে একে শ্রদ্ধা জানান রাজ্জাকের দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা। শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে সেখানে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এর পর এফডিসি থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ।
নায়করাজ রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের (বর্তমান ভারত) কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার খানপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতী পূজা চলাকালীন মঞ্চনাটকে অভিনয়ের জন্য তাঁর শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁকে বেছে নেন নায়ক, অর্থাৎ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে।
শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক ‘বিদ্রোহী’তে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নায়করাজের অভিনয় জীবন শুরু। ১৯৬৪ সালে রাজ্জাক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খানের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
পরে ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন। এরপর ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’তেও অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’। সেই থেকে তিনি তিন শতাধিক বাংলা ও কয়েকটি উর্দু চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। পরিচালনা করেন ১৬টি চলচ্চিত্র।
নায়করাজ রাজ্জাকের অভিনয় করা উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে—বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, দর্পচূর্ণ, এতুটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, কখগঘঙ, জীবন থেকে নেয়া, নাচের পুতুল, অশ্রু দিয়ে লেখা, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, শুভ দা, অভিযান, যোগাযোগ, অন্ধবিশ্বাস, টাকা আনা পাই, ছন্দ হারিয়ে গেল, মানুষের মন, অতিথি, যোগ বিয়োগ, মধুমিলন, যে আগুনে পুড়ি, দুই পয়সার আলতা, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, দ্বীপ নেভে নাই, পীচঢালা পথ, দুই ভাই, আবির্ভাব, বন্ধু, বাঁশরী, আশার আলো, কে তুমি, মতিমহল, আনোয়ারা, নাত বউ, অবাক পৃথিবী, কি যে করি, গুণ্ডা, অনন্ত প্রেম, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, মহানগর, বড় ভাল লোক ছিল, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, স্বরলিপি, বাঁদী থেকে বেগম, বাবা কেন চাকর।
ভালোবাসায় সিক্ত নায়করাজ
সারা জীবন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন নায়করাজ রাজ্জাক। শেষ বিদায়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সহস্র মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হলেন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, এফডিসি সর্বত্র হাজার হাজার মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানান। সবার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা সঙ্গে নিয়েই আজ বুধবার চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি। ভোরে তার মেজো ছেলে রওশন হোসেন বাপ্পি দেশে ফেরার পর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মঙ্গলবার সকালে হিমঘর থেকে নায়করাজকে নেয়া হয় তার বাসভবনে। সেখান থেকে প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে। দুপুরে নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। প্রতিটি স্থানে সর্বস্তরের মানুষ নায়করাজকে শ্রদ্ধা জানান। এফডিসি ও গুলশান আজাদ মসজিদে রাজ্জাকের দুই দফা জানাজা সম্পন্ন হয়।
রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল, মুকুটহীন সম্রাট নায়করাজ রাজ্জাক। সেখান থেকে মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ শেষবারের মতো নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের বাসভবন ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’-তে। মরদেহ সেখানে পৌঁছতেই স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে আশপাশ।
সেখান থেকে বেলা ১১টায় মরদেহ নিয়ে আসা হয় তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে। শেষবারের মতো নায়করাজের এফডিসিতে আগমনে শোকার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আগত শিল্পী-কলা-কুশলীরা ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে ওঠেন।
এফডিসিতে লাশবাহী গাড়ি খোলা রেখেই শেষবারের মতো সবাই দেখেন নায়করাজকে। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, চলচ্চিত্র পরিবার, সিনেম্যাক্স মুভি পরিবার, আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগ, বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব, চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থা, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, সিনে স্থিরচিত্রগ্রাহক সমিতি, জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
ব্যক্তিগতভাবে রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, অভিনেতা আলমগীর, চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী, সুচন্দা, ববিতা, চম্পা, শাবনূর, চিত্রনায়ক শাকিব খান, ফেরদৌস, আমিন খান, রুবেল, আহমেদ শরীফ, ওমর সানি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর, চলচ্চিত্র পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম প্রমুখ। শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানেই তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
উপস্থিত সবার উদ্দেশে রাজ্জাকের বড় ছেলে অভিনেতা বাপ্পারাজ বলেন, ‘আমার আব্বা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। তিনি জীবনের পুরোটা সময় আপনাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, এর মধ্যে যদি কারও সঙ্গে কোনো লেনদেন থেকে থাকে, তাহলে আমার বা আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।’
এফডিসিতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এ দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু নায়করাজ রাজ্জাক ভেবেছেন। আমরা সরকারিভাবে তার এই কর্মকাণ্ডকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব। যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তার কর্মময় জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারে।’
এফডিসিতে শেষবারের মতো রাজ্জাককে দেখতে এসেছিলেন তার প্রথম নায়িকা সুচন্দা। তিনি বলেন, ‘রাজ্জাক নায়কের মতো রুপালি পর্দায় এসেছিলেন। তার চলে যাওয়াটাও নায়কের মতোই। তিনি কখনও কারও কাছে ছোট হননি। বাস্তব জীবনেও তিনি মহানায়ক ছিলেন।’ ববিতা বলেন, ‘আমার জীবনের ব্যবসাসফল ও ভালো ছবি রাজ্জাকের সঙ্গে।
রাজ্জাকের পর্দা উপস্থিতি ছিল ভিন্ন রকমের। এখনকার নায়করাও তাকে অনুসরণ করে।’ আলমগীর বলেন, ‘আসলে আমার বলার কিছুই নেই। একজন সন্তান পিতাকে হারালে যেমন কষ্ট পায়, আমি তেমনিই কষ্ট পাচ্ছি।’ গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল- এ দেশের চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে স্থান করে নেবে।
এটা হলেই তার স্বপ্ন সার্থক হবে, আত্মা শান্তি পাবে।’ চম্পা বলেন, ‘আমি উনার সঙ্গে খুব কম ছবিতেই কাজ করেছি। তবে তার মতো অভিভাবক আমরা আর পাব কিনা জানি না।’ শাবনূর বলেন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না, রাজ্জাক আঙ্কেল আর নেই। পর্দার নায়করাজের চেয়ে, পর্দার পেছনের রাজ্জাক আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
শাকিব খান বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম এবং আগামী যত প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে নায়করাজ প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। আমরা আমাদের একজন আইডল হারালাম।’ ওমর সানী বলেন, ‘তাকে আমরা অবেলায় হারালাম। তার আরও অনেক কিছু দেয়ার ছিল। তবে নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে আজীবন বেঁচে থাকবেন।’
রুবেল বলেন, ‘রাজ্জাক ভাই এমন একজন মানুষ ছিলেন, যার অভাব পূরণ হওয়ার নয়। বছরখানেক আগে আমাদের দেখা হয়েছিল, কুশলবিনিময় হয়েছিল। এ ছাড়া তেমন কোনো কথা হয়নি। বেশকিছু ছবিতে রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করা হয়েছে।’
এফডিসি থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয় রাজ্জাকের লাশ। তার অনেক আগেই সেখানে আসতে শুরু করেন রাজ্জাকের ভক্ত-অনুরাগীরা। হাজার হাজার মানুষ ফুল হাতে অপেক্ষা করতে থাকেন তাদের প্রিয় অভিনেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় এ নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের যে ঢল নামে তা ছিল দেখার মতো। আয়োজনের পুরোটা সময় রাজ্জাকের মরদেহের পাশে ছিলেন দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট, চিত্রনায়ক জাভেদ ও শাকিব খান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।
শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।
বিএনপির পক্ষে শ্রদ্ধা জানায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ আরও অনেকে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানায় বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, অভিনয় শিল্পী সংঘ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, এনটিভি, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, ঋষিজ, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ওয়ার্কার্স পার্টি, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ, মুক্তধারা সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাউল একাডেমি ফাউন্ডেশন, যুব সমিতি, সুবচন নাট্য সংসদ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, ডিরেক্টরস গিল্ড, দেশ টিভি, প্রজন্ম ৭১, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি ইত্যাদি।
সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ দশক তিনি আমাদের চলচ্চিত্রে অবদান রেখেছেন। তার চলে যাওয়ার ক্ষতি অপূরণীয়। রাজ্জাক ছিলেন এ বাংলার উত্তম কুমার।’
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বাংলা ছবির নির্মাণের ইতিহাস দেখলে বলতে হয়, যে ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা চলচ্চিত্র দাঁড়িয়েছিল তিনি রাজ্জাক। নিজের দক্ষতা, নিজের গুণে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি আমাদের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। আজ বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান স্থপতি চলে গেলেন।’
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘রাজ্জাকের বিনয়ের প্রেমে পড়েনি, এমন মানুষ বোধহয় নেই। এত জনপ্রিয় মানুষ হয়েও সে তার অতীতকে ভোলেনি। সিনিয়রদের সম্মান করা ছিল তার স্বভাবগত ব্যাপার। সে সব শ্রেণীর মানুষকে শ্রদ্ধা করত।’
রোজিনা বলেন, ‘আমার জীবনের প্রথম ছবি ‘আয়না’-তে নায়ক হিসেবে তাকে পেয়েছিলাম। তার সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল। সেটা বুঝে তিনি আমাকে সাহস দিয়েছিলেন। অভিনয়ের অনেক কিছু শিখেছি তার কাছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন।’
জয়া আহসান বলেন, ‘উনার বাচনভঙ্গি থেকে শুরু করে সবকিছু দারুণ মার্জিত। এরকম পারফেক্ট একটা মানুষকে হিরো হিসেবে দেখি না এখনও। যাওয়ার সময় হলে তো সবাই যায়, কিন্তু আমাদের এখানে তো একটা জায়গা ফাঁকা হয়ে গেলে পূরণ হতে অনেক সময় লাগে। তার চলে যাওয়ায় এ জায়গাটা আর কখনও হয়তো পূরণ হবে না।’
পাঁচশর বেশি চলচ্চিত্রের অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে নায়করাজ নামেই খ্যাত ছিলেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাদা কালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেন রাজ্জাক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ২৫ বছর প্রায় একাই টেনেছেন এই চিত্রনায়ক।শেষ দিকে অন্য চরিত্রে অভিনয় করলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন তাকে চিরসবুজ নায়ক হিসেবেই দেখত।
হালের অভিনেতা রিয়াজ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “হি ইজ দ্য কিং। আমাদের কাছে তিনি এখনও রাজা। একারণেই নায়করাজকে আমরা সবাই এখনও ফলো করি। তার কথা বলার স্টাইল, অভিনয়- সব কিছুই আমরা ফলো করি। তাকে দেখে বড় হয়েছি, তাকে ফলো করেই আমরা অভিনয় শিখেছি।”
রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। শৈশবেই তিনি বাবা-মাকে হারান।
টালিগঞ্জের খানপুর হাইস্কুলে পড়ার সময় নাটকে অভিনয় করেন রাজ্জাক। কলেজে পড়ার সময় তিনি ‘রতন লাল বাঙালি’ নামে একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
অভিনেতা হওয়ার মানসে ১৯৬১ সালে কলকাতা থেকে মুম্বাই পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি; সেখানে সফল না হয়ে ফিরেছিলেন টালিগঞ্জে।
কলকাতায়ও পরিস্থিতি অনুকূলে না হওয়ায় ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন রাজ্জাক। টিকে থাকতে এই সময় বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছিল তাকে।
১৯৬৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সেখানে অভিনয়ের সুযোগ নেন রাজ্জাক। তখন ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। আবদুল জব্বার খানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান তিনি তবে নায়ক হিসেবে নয়। সহকারী পরিচালক হিসেবে।
রাজ্জাক নিজেই বলে গেছেন, “আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি, না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি।”
সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মধ্যেই ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি ভূমিকায় অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর ‘ডাকবাবু’, উর্দু ছবি ‘আখেরি স্টেশন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
এক সময় জহির রায়হানের নজরে পড়েন রাজ্জাক। তিনি ‘বেহুলা’য় লখিন্দরের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ দিলেন রাজ্জাককে, সুচন্দার বিপরীতে। ‘বেহুলা’ ব্যবসাসফল হওয়ায় আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে।
সুদর্শন রাজ্জাক সুচন্দার পর শবনম, কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র দেন ঢালিউডকে। এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়।
সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির শুরু। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেছেন তারা। ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘ঢেউ এর পরে ঢেউ’ এবং স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্র উপহার দেন এই জুটি।
কবরী তার বইয়ে লিখেছেন, “সিনেমামোদী যারা এসব সিনেমা দেখেছেন, তারাও হয়ে যেতেন রাজ্জাক আর অপরপক্ষ নিজেকে ভাবত কবরী, তাই না?”
রাজ্জাকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আনোয়ারা’, ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’, ‘দুই ভাই’, ‘মনের মতো বউ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বেঈমান’।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ দিয়ে বাংলাদেশে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের সূচনাও ঘটান রাজ্জাক।
রিয়াজ বলেন, “রংবাজ’ সিনেমায় যেভাবে নিজেকে ভেঙেছিলেন, আর সেই সিনেমা যেভাবে বাংলা ছবিতে একটা চেইঞ্জ নিয়ে এসেছিল, সেটা অনেকদিন মনে থাকবে।”
‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘কি যে করি’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘আনার কলি’, ‘বাজিমাত’, ‘লাইলি মজনু’, ‘নাতবউ’, ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘পাগলা রাজা’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘নাজমা’সহ অসংখ্য ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নায়ক রাজ্জাক।
তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র কার্তুজ, পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র আয়না কাহিনী।
অভিনয়ের জন্য রাজ্জাক পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় তাকে। ২০১৫ সালে তিনি পান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার।
বদনাম, সৎ ভাই, চাপা ডাঙ্গার বউসহ প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন রাজ্জাক। তার মালিকানার রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়।
অভিনয় জীবনের বাইরে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করেন রাজ্জাক।

























