ঢাকা ১১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাঁ-হাতি বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড স্টার্কের এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে পদক লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে পারে ভারত-পাকিস্তান কোকোর নামে বগুড়ায় জাতীয় প্যারা স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কারাবন্দি ও পলাতক আসামিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা আইন পাস করল লেবানন মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত দাবি সিনেটরদের জাপানের দাবিকৃত কুরিল দ্বীপপুঞ্জ সফর পুতিনের সুদানের রাজধানী খার্তুমে টানা দ্বিতীয় দিন আধাসামরিক বাহিনীর ড্রোন হামলা সকলের মতামত নিয়েই সংবিধান সংশোধন করা হবে: চিফ হুইপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দু’জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিল, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই: ইসি সচিব রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

‘নিজেকে পাঠক অঙ্গনে দেখতে চাই’

  • আপডেট সময় : ০৭:৩২:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০
  • / 490
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিডিসংবাদ ডেস্কঃ

এই সময়ের তরুণ লেখকদের মধ্যে মারুফ ইসলাম ধীরে ধীরে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। তিনি মূলত গল্পকার। সম্প্রতি হাত দিয়েছেন উপন্যাসে। তাঁর বিস্ময়কর উত্থান পত্রিকায় ফিচার লেখার মধ্য দিয়ে। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে দশ বছর ধরে এক হাজারের অধিক ফিচার লিখেছেন। লিখেছেন প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলাম। অনুবাদেও কুড়িয়েছেন প্রশংসা। তাঁর লেখালেখি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন বিডিসংবাদ ডট কম-এর এ এইচ সামি।

প্রশ্ন: অনেক দিন ধরেই একটা কথা শোনা যায়, বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ লেখালেখির জগতে মানুষের সংখ্যা বেশি। এর কারণ কী বলে মনে করেন।

মারুফ ইসলাম: প্রথমেই বলে রাখি, কাকের সঙ্গে কবির তুলনা আপত্তিকর। এতে না কাককে সম্মান জানানো হয়, না কবিকে। দুটি প্রাণীকেই অসম্মান করা হয়। সংখ্যাধিক্য বুঝাতে কেন কাককে ব্যবহার করা হয় তা আমার বোধগম্য নয়। কে প্রথম এই উপমা চালু করেছিলেন তা-ও আমার জানা নেই। বাংলাদেশে কাকের সংখ্যা কী খুব বেশি? আমার তা মনে হয় না। পাখি ও পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন তারা তো বলছেন অন্যান্য পাখির মতো কাকও বিলুপ্তির পথে। সে যাই হোক, আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশে আসি—বাংলাদেশে এত লেখক কেন? আপনার এই অভিযোগও অস্বীকার করতে পারতাম, তবে প্রতি বইমেলায় যখন পাঁচ হাজারের উপর বই প্রকাশ হতে দেখি, তখন আপনার অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় থাকে না। স্বীকার করতেই হবে, এদেশে লেখকের সংখ্যা বেশি। এর পেছনের কারণটা হচ্ছে, এদেশে বই প্রকাশ করা অতি সহজ একটা ব্যাপার। পৃথিবীর অপরাপর সভ্য দেশে বই ছাপাতে গেলে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন পাণ্ডুলিপি বাছাই, সম্পাদনা, কপিরাইট চুক্তি, প্রচারণা পরিকল্পনা, বুক ট্যুরের আয়োজন, রয়্যালটি চু্ক্তি ইত্যাদি। বাংলাদেশে এসব কিছুই করতে হয় না। জনৈক ‘ক’ নামের একজন ব্যক্তির হয়তো হঠাৎ একদিন মনে হলো, তার বই প্রকাশ করা দরকার। তিনি ততক্ষণাৎ চলে যান কোনো প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক যদি পরিচিত হয় এবং মন-মর্জি ভালো থাকে, তাহলে বইটা ছাপিয়ে দেন। আর অপরিচিত হলে হাজার বিশ-তিরিশেক টাকা চান নতুবা তিন শ কপি বই লেখককে কিনে নিতে বলেন। এই শর্তে রাজি হলে ততক্ষণাৎ বই ছাপিয়ে দেন। এত সহজ পদ্ধতিতে পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভবত বই ছাপা হয় না। এই সহজলভ্যতার কারণেই এ দেশে এত এত লেখক।

এ বছর একুশে বইমেলায় (২০২০) প্রকাশিত হয় মারুফ ইসলামের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জীবন এখানে এমন’

প্রশ্ন: চমৎকার বলেছেন। আচ্ছা মারুফ ভাই, কেউ বলেন আমি নিজের জন্য লিখি। কেউ বলেন পাঠকের জন্য লিখি। আবার কেউ কেউ বলেন, তারা সমাজ বদলের জন্য লেখেন। আপনি কোন দলে?

মারুফ: কূটনৈতিক উত্তর হচ্ছে, আমি কোনো দলেই নই, অথবা সব দলে আছি। তবে আমি কূটনৈতিক উত্তর দিব না। আমার লেখালেখির উদ্দেশ্যটা একটু ভিন্ন। সেটা হচ্ছে, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে ভাবনা বিনিময় করতে পারে। তার চিন্তাকে লেখার মাধ্যমে কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। একটা গরু কখনো তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, চিন্তা, দর্শন আর একটি গরুর জন্য লিখে রাখতে পারে না। আমি যেহেতু মানুষ, আমি চাই আমার চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতি আরও দশজন মানুষ জানুক। কিংবা আমি হয়তো কোনো একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বা কিছু একটা শিখেছি, সেটা অন্যকে জানাতে চাই, শেখাতে চাই। আমি জ্ঞান কুক্ষিগত করে রাখার পক্ষে না, ছড়িয়ে দেয়ার পক্ষে। আমি তাই লিখি।

প্রশ্ন: লেখক হওয়ার সবচেয়ে ভালো দিক এবং সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটি?

মারুফ: জটিল প্রশ্ন। তারপরও নিজের মতো করে বলি। লেখক হওয়ার ভালো দিক হচ্ছে, লেখকরা সকলের মাঝে থেকেও আলাদা হতে পারেন। জীবনানন্দের ভাষায়—‘সকলের মাঝে থেকে নিজেরই মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা’। তাছাড়া, লেখক হলে সোসাইটিতে একটা ভ্যালু ক্রিয়েট হয়। এটাও একটা ভালো দিক বলে মনে করি। আর খারাপ দিক আসলে একেক দেশে একেক রকম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খারাপ দিক হচ্ছে, এখানে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে এখনও গ্রহণ করা যায় না। একজন পেশাজীবী লেখক এদেশে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারেন না। জানি, হুমায়ূন আহমেদের উদাহরণ দিবেন। দেখুন, হুমায়ূন আহমেদ একটা ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের পাঠকদের ব্যাপারে দুই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। এক. এদেশে পাঠক সংখ্যা অত্যন্ত কম। দুই. যে অল্প সংখ্যক পাঠক রয়েছে তাদেরও ‘পাঠকরুচি’ তৈরি হয়নি। আপনিও কি তাই মনে করেন?

মারুফ: দুটো অভিযোগই সঠিক বলে মনে করি। এ দেশে পাঠক কম। সেটা অবশ্য নতুন নয়। এদেশে পাঠক আগেও কম ছিল। এখন আরও কম মনে হচ্ছে, কারণ বইয়ের পাঠক অন্যান্য মাধ্যমে ভাগ হয়ে গেছে। যেমন টেলিভিশন, এফএম, ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন ইত্যাদি। আগে ছিল শুধুই বই পড়া অথবা টিভি দেখা নয়তো রেডিও শোনা। এখন প্রযুক্তির কারণে হাজারটা বিনোদন মাধ্যম আসাতে বইয়ের ওই পাঠকরা ভাগ হয়ে গেছে। আর পাঠকের রুচি তৈরি না হওয়ার পেছনে লেখকদের দায় আছে। কেমন দায়? সেটা বলতে গেলে বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন। আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা একটি প্রবন্ধই লিখব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তখন নিশ্চয় জানতে পারবেন।

মারুফ ইসলামের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জীবন এখানে এমন’ নিয়ে বইমেলায় পাঠক লেখক

প্রশ্ন: বাংলা উপন্যাস কি হুমায়ূন আহমেদীয় ধারায় আটকা পড়ে যাচ্ছে? প্রশ্নটা এ জন্য করা যে, এই সময়ের প্রায় সব তরুণই হুমায়ূন আহমেদের মতো করে গদ্য লেখেন। আপনার কী মত?

মারুফ: হুমায়ূন আহমেদ একটা দানবীয় প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার প্রভাব এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ তিনি একটা দীর্ঘ সময় এদেশের সাহিত্যে রাজত্ব করেছেন। অন্তত কয়েক প্রজন্ম শুধু হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েই বড় হয়েছে। তারা আর কিছু পড়েনি। ফলে অন্য কিছু না পড়ে শুধু হুমায়ূন পড়ে যদি কেউ সাহিত্য করতে আসে, তবে তার লেখাতে হুমায়ূনী ধারা ফুটে উঠেবে—এটাই তো স্বাভাবিক। হুমায়ূন আহমেদকে আমি এ কারণেই দানবীয় বলি যে, তিনি দিনের পর দিন কয়েক প্রজন্মকে শুধু তাঁরই বই পড়িয়েছেন। আর কারও বই পড়তে দেননি। এটা সচরাচর হয় না। কেউ যদি দস্তয়ভস্কি পড়ে, তবে সে ক্রমশ তলস্তয় পড়ে, পুশকিন পড়ে, গোগল পড়ে। কেউ যদি বিভূতি পড়তে শুরু করে, দেখা যায় সে পরবর্তীতে তারাশঙ্কর পড়ছে, তারপর মানিক পড়ছে ইত্যাদি। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদই একমাত্র লেখক, যাঁর পাঠকরা শুধুই তাঁর বই পড়ে। কতটা দানবিক প্রতিভা থাকলে সমগ্র পাঠককূলকে নিজের লেখার মধ্যে বুঁদ করে রাখা যায়, ভাবতে পারেন?

প্রশ্ন: সত্যিই হুমায়ূন আহমেদ এক অদ্ভূত প্রতিভা। এবার কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন। আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়ালেখা, কর্মজীবন ইত্যাদি।

মারুফ: নিজের সম্পর্কে আসলে বলার মতো তেমন কিছু নেই। অকৃতী অধম আমি। ক্ষুদ্রপ্রাণ লেখক। আমার জন্ম উত্তরবঙ্গের বগুড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানের কাদা জলেই বেড়ে ওঠা। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছি গ্রামেই, তারপর কলেজ পর্যায়ে পড়েছি বগুড়া শহরে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ঢাকায়—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর কর্মজীবন বলতে, টিউশনি দিয়ে কর্মজীবন শুরু, তারপর পত্রিকায় লেখালেখি, এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছি।

প্রশ্ন: এ পর্যন্ত কতটি বই বেরিয়েছে আপনার।

মারুফ: মাত্র তিনটি। দুটো গল্পগ্রন্থ আর একটি অনুবাদ।

প্রশ্ন: এবারের বইমেলায় কতটি বই বেরিয়েছে?

মারুফ: একটি মাত্র বই বেরিয়েছে। বইয়ের নাম জীবন এখানে এমন । এটি আমার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। বলে রাখি, এই বইটি বের হলো পাঁচ বছর পর।

প্রশ্ন: এত দীর্ঘ বিরতি কেন? বইটি সম্পর্কে পাঠকদের একটু ধারণা দেবেন?

মারুফ: নিজেকে লেখালেখির জন্য প্রস্তুত করছিলাম। তাই এই বিরতি। তাছাড়া পারিবারিক কিছু ঝামেলাও ছিল। মায়ের অসুস্থতাসহ নানা কিছু।

প্রশ্ন: আচ্ছা, শেষ প্রশ্ন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

মারুফ: বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে কী কোনো স্টপেজ আছে? গাবতলী স্টপেজ কিংবা সায়েদাবাদ স্টপেজ—এমন কিছু? নিশ্চয় নেই। আমি তাই পাঠকের অঙ্গনে নিজেকে দেখতে চাই। আমার গন্তব্য একটাই—পাঠক।

বিডিসংবাদ/এএইচএস

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

‘নিজেকে পাঠক অঙ্গনে দেখতে চাই’

আপডেট সময় : ০৭:৩২:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০

বিডিসংবাদ ডেস্কঃ

এই সময়ের তরুণ লেখকদের মধ্যে মারুফ ইসলাম ধীরে ধীরে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। তিনি মূলত গল্পকার। সম্প্রতি হাত দিয়েছেন উপন্যাসে। তাঁর বিস্ময়কর উত্থান পত্রিকায় ফিচার লেখার মধ্য দিয়ে। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে দশ বছর ধরে এক হাজারের অধিক ফিচার লিখেছেন। লিখেছেন প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলাম। অনুবাদেও কুড়িয়েছেন প্রশংসা। তাঁর লেখালেখি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন বিডিসংবাদ ডট কম-এর এ এইচ সামি।

প্রশ্ন: অনেক দিন ধরেই একটা কথা শোনা যায়, বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ লেখালেখির জগতে মানুষের সংখ্যা বেশি। এর কারণ কী বলে মনে করেন।

মারুফ ইসলাম: প্রথমেই বলে রাখি, কাকের সঙ্গে কবির তুলনা আপত্তিকর। এতে না কাককে সম্মান জানানো হয়, না কবিকে। দুটি প্রাণীকেই অসম্মান করা হয়। সংখ্যাধিক্য বুঝাতে কেন কাককে ব্যবহার করা হয় তা আমার বোধগম্য নয়। কে প্রথম এই উপমা চালু করেছিলেন তা-ও আমার জানা নেই। বাংলাদেশে কাকের সংখ্যা কী খুব বেশি? আমার তা মনে হয় না। পাখি ও পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন তারা তো বলছেন অন্যান্য পাখির মতো কাকও বিলুপ্তির পথে। সে যাই হোক, আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশে আসি—বাংলাদেশে এত লেখক কেন? আপনার এই অভিযোগও অস্বীকার করতে পারতাম, তবে প্রতি বইমেলায় যখন পাঁচ হাজারের উপর বই প্রকাশ হতে দেখি, তখন আপনার অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় থাকে না। স্বীকার করতেই হবে, এদেশে লেখকের সংখ্যা বেশি। এর পেছনের কারণটা হচ্ছে, এদেশে বই প্রকাশ করা অতি সহজ একটা ব্যাপার। পৃথিবীর অপরাপর সভ্য দেশে বই ছাপাতে গেলে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন পাণ্ডুলিপি বাছাই, সম্পাদনা, কপিরাইট চুক্তি, প্রচারণা পরিকল্পনা, বুক ট্যুরের আয়োজন, রয়্যালটি চু্ক্তি ইত্যাদি। বাংলাদেশে এসব কিছুই করতে হয় না। জনৈক ‘ক’ নামের একজন ব্যক্তির হয়তো হঠাৎ একদিন মনে হলো, তার বই প্রকাশ করা দরকার। তিনি ততক্ষণাৎ চলে যান কোনো প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক যদি পরিচিত হয় এবং মন-মর্জি ভালো থাকে, তাহলে বইটা ছাপিয়ে দেন। আর অপরিচিত হলে হাজার বিশ-তিরিশেক টাকা চান নতুবা তিন শ কপি বই লেখককে কিনে নিতে বলেন। এই শর্তে রাজি হলে ততক্ষণাৎ বই ছাপিয়ে দেন। এত সহজ পদ্ধতিতে পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভবত বই ছাপা হয় না। এই সহজলভ্যতার কারণেই এ দেশে এত এত লেখক।

এ বছর একুশে বইমেলায় (২০২০) প্রকাশিত হয় মারুফ ইসলামের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জীবন এখানে এমন’

প্রশ্ন: চমৎকার বলেছেন। আচ্ছা মারুফ ভাই, কেউ বলেন আমি নিজের জন্য লিখি। কেউ বলেন পাঠকের জন্য লিখি। আবার কেউ কেউ বলেন, তারা সমাজ বদলের জন্য লেখেন। আপনি কোন দলে?

মারুফ: কূটনৈতিক উত্তর হচ্ছে, আমি কোনো দলেই নই, অথবা সব দলে আছি। তবে আমি কূটনৈতিক উত্তর দিব না। আমার লেখালেখির উদ্দেশ্যটা একটু ভিন্ন। সেটা হচ্ছে, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে ভাবনা বিনিময় করতে পারে। তার চিন্তাকে লেখার মাধ্যমে কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। একটা গরু কখনো তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, চিন্তা, দর্শন আর একটি গরুর জন্য লিখে রাখতে পারে না। আমি যেহেতু মানুষ, আমি চাই আমার চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতি আরও দশজন মানুষ জানুক। কিংবা আমি হয়তো কোনো একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বা কিছু একটা শিখেছি, সেটা অন্যকে জানাতে চাই, শেখাতে চাই। আমি জ্ঞান কুক্ষিগত করে রাখার পক্ষে না, ছড়িয়ে দেয়ার পক্ষে। আমি তাই লিখি।

প্রশ্ন: লেখক হওয়ার সবচেয়ে ভালো দিক এবং সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটি?

মারুফ: জটিল প্রশ্ন। তারপরও নিজের মতো করে বলি। লেখক হওয়ার ভালো দিক হচ্ছে, লেখকরা সকলের মাঝে থেকেও আলাদা হতে পারেন। জীবনানন্দের ভাষায়—‘সকলের মাঝে থেকে নিজেরই মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা’। তাছাড়া, লেখক হলে সোসাইটিতে একটা ভ্যালু ক্রিয়েট হয়। এটাও একটা ভালো দিক বলে মনে করি। আর খারাপ দিক আসলে একেক দেশে একেক রকম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খারাপ দিক হচ্ছে, এখানে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে এখনও গ্রহণ করা যায় না। একজন পেশাজীবী লেখক এদেশে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারেন না। জানি, হুমায়ূন আহমেদের উদাহরণ দিবেন। দেখুন, হুমায়ূন আহমেদ একটা ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের পাঠকদের ব্যাপারে দুই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। এক. এদেশে পাঠক সংখ্যা অত্যন্ত কম। দুই. যে অল্প সংখ্যক পাঠক রয়েছে তাদেরও ‘পাঠকরুচি’ তৈরি হয়নি। আপনিও কি তাই মনে করেন?

মারুফ: দুটো অভিযোগই সঠিক বলে মনে করি। এ দেশে পাঠক কম। সেটা অবশ্য নতুন নয়। এদেশে পাঠক আগেও কম ছিল। এখন আরও কম মনে হচ্ছে, কারণ বইয়ের পাঠক অন্যান্য মাধ্যমে ভাগ হয়ে গেছে। যেমন টেলিভিশন, এফএম, ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন ইত্যাদি। আগে ছিল শুধুই বই পড়া অথবা টিভি দেখা নয়তো রেডিও শোনা। এখন প্রযুক্তির কারণে হাজারটা বিনোদন মাধ্যম আসাতে বইয়ের ওই পাঠকরা ভাগ হয়ে গেছে। আর পাঠকের রুচি তৈরি না হওয়ার পেছনে লেখকদের দায় আছে। কেমন দায়? সেটা বলতে গেলে বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন। আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা একটি প্রবন্ধই লিখব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তখন নিশ্চয় জানতে পারবেন।

মারুফ ইসলামের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জীবন এখানে এমন’ নিয়ে বইমেলায় পাঠক লেখক

প্রশ্ন: বাংলা উপন্যাস কি হুমায়ূন আহমেদীয় ধারায় আটকা পড়ে যাচ্ছে? প্রশ্নটা এ জন্য করা যে, এই সময়ের প্রায় সব তরুণই হুমায়ূন আহমেদের মতো করে গদ্য লেখেন। আপনার কী মত?

মারুফ: হুমায়ূন আহমেদ একটা দানবীয় প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার প্রভাব এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ তিনি একটা দীর্ঘ সময় এদেশের সাহিত্যে রাজত্ব করেছেন। অন্তত কয়েক প্রজন্ম শুধু হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েই বড় হয়েছে। তারা আর কিছু পড়েনি। ফলে অন্য কিছু না পড়ে শুধু হুমায়ূন পড়ে যদি কেউ সাহিত্য করতে আসে, তবে তার লেখাতে হুমায়ূনী ধারা ফুটে উঠেবে—এটাই তো স্বাভাবিক। হুমায়ূন আহমেদকে আমি এ কারণেই দানবীয় বলি যে, তিনি দিনের পর দিন কয়েক প্রজন্মকে শুধু তাঁরই বই পড়িয়েছেন। আর কারও বই পড়তে দেননি। এটা সচরাচর হয় না। কেউ যদি দস্তয়ভস্কি পড়ে, তবে সে ক্রমশ তলস্তয় পড়ে, পুশকিন পড়ে, গোগল পড়ে। কেউ যদি বিভূতি পড়তে শুরু করে, দেখা যায় সে পরবর্তীতে তারাশঙ্কর পড়ছে, তারপর মানিক পড়ছে ইত্যাদি। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদই একমাত্র লেখক, যাঁর পাঠকরা শুধুই তাঁর বই পড়ে। কতটা দানবিক প্রতিভা থাকলে সমগ্র পাঠককূলকে নিজের লেখার মধ্যে বুঁদ করে রাখা যায়, ভাবতে পারেন?

প্রশ্ন: সত্যিই হুমায়ূন আহমেদ এক অদ্ভূত প্রতিভা। এবার কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন। আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়ালেখা, কর্মজীবন ইত্যাদি।

মারুফ: নিজের সম্পর্কে আসলে বলার মতো তেমন কিছু নেই। অকৃতী অধম আমি। ক্ষুদ্রপ্রাণ লেখক। আমার জন্ম উত্তরবঙ্গের বগুড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানের কাদা জলেই বেড়ে ওঠা। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছি গ্রামেই, তারপর কলেজ পর্যায়ে পড়েছি বগুড়া শহরে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ঢাকায়—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর কর্মজীবন বলতে, টিউশনি দিয়ে কর্মজীবন শুরু, তারপর পত্রিকায় লেখালেখি, এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছি।

প্রশ্ন: এ পর্যন্ত কতটি বই বেরিয়েছে আপনার।

মারুফ: মাত্র তিনটি। দুটো গল্পগ্রন্থ আর একটি অনুবাদ।

প্রশ্ন: এবারের বইমেলায় কতটি বই বেরিয়েছে?

মারুফ: একটি মাত্র বই বেরিয়েছে। বইয়ের নাম জীবন এখানে এমন । এটি আমার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। বলে রাখি, এই বইটি বের হলো পাঁচ বছর পর।

প্রশ্ন: এত দীর্ঘ বিরতি কেন? বইটি সম্পর্কে পাঠকদের একটু ধারণা দেবেন?

মারুফ: নিজেকে লেখালেখির জন্য প্রস্তুত করছিলাম। তাই এই বিরতি। তাছাড়া পারিবারিক কিছু ঝামেলাও ছিল। মায়ের অসুস্থতাসহ নানা কিছু।

প্রশ্ন: আচ্ছা, শেষ প্রশ্ন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

মারুফ: বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে কী কোনো স্টপেজ আছে? গাবতলী স্টপেজ কিংবা সায়েদাবাদ স্টপেজ—এমন কিছু? নিশ্চয় নেই। আমি তাই পাঠকের অঙ্গনে নিজেকে দেখতে চাই। আমার গন্তব্য একটাই—পাঠক।

বিডিসংবাদ/এএইচএস