ঢাকা ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাঁ-হাতি বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড স্টার্কের এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে পদক লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে পারে ভারত-পাকিস্তান কোকোর নামে বগুড়ায় জাতীয় প্যারা স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কারাবন্দি ও পলাতক আসামিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা আইন পাস করল লেবানন মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত দাবি সিনেটরদের জাপানের দাবিকৃত কুরিল দ্বীপপুঞ্জ সফর পুতিনের সুদানের রাজধানী খার্তুমে টানা দ্বিতীয় দিন আধাসামরিক বাহিনীর ড্রোন হামলা সকলের মতামত নিয়েই সংবিধান সংশোধন করা হবে: চিফ হুইপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দু’জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিল, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই: ইসি সচিব রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

জনগণের জান-মাল রক্ষায় আত্মোৎসর্গ করার বড় দৃষ্টান্ত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স: মহাপরিচালক

  • আপডেট সময় : ০৮:০৯:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
  • / 758
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই” – কবি যাদেরকে প্রেরণা জোগানোর উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন এই বাণী – ঠিক তেমনি একটি অনন্য মানবীয় প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। শুধু পেশাদারির জন্য নয়; মহান আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্তের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিপদের বন্ধু হিসেবে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বীর অগ্নিযোদ্ধারা মানবিকতার জন্য প্রশংসীত হয়েছে দেশ-বিদেশেও। বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিদেশের মাটিতেও সফল উদ্ধার অভিযানের অভিযাত্রী হিসেবে দুর্দান্ত কাজ করে দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছেন আমাদের সুযোগ্য ফায়ার কর্মকর্তা ও কর্মীগণ। অনেক ফায়ার কর্মী মানুষের জান-মাল রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করে পেয়েছেন-মরণোত্তর বীরের খেতাব ও মর্যাদা। এই বাহিনীর প্রত্যেক কর্তব্য পালনকারী ব্যক্তিই মানবিকতার ক্ষেত্রে এক-একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাষ্ট্র কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে পরের তরে জীবন উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হয়নি আত্মত্যাগী মনোভাবসম্পন্ন এ প্রতিষ্ঠানটি! তাই রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় জনসেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৩’ পদকটি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এছাড়াও এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুদক্ষ ও সাহসী কর্মতৎপরতার অবদান রাখার জন্য ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক, সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেশ-বিদেশ থেকেও পেয়েছে একাধিক  সম্মাননা স্মারক ও পুরস্কার। এমন এক মানবিক প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হিসেবে যিনি সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন

বিডিসংবাদ- এর নির্বাহী সম্পাদক মোঃ আশরাফ উদ্দিন মুকুলের সাথে মহাপরিচালকের একান্ত আলাপচারিতায় বর্তমান কর্মক্ষেত্রের বাইরেও তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উঠে আসে সফলতার অজানা গল্পকথা! বাংলাদেশের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশে বজ্রকন্ঠে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এক ভাষণ দিয়ে দেশের মুক্তিকামী সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে এক সারিতে দাঁড় করেছিলেন!! দীর্ঘ শোষন-বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শুনিয়েছিলেন অমিয় বাণী : “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এমন ঘোষণায় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর আকাশে-বাতাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হুংকারে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। ২৫ মার্চ কালরাতে ঘুমন্ত নিরীহ নিরস্ত্র বাংলাভাষীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রাজপথ রক্তাক্ত করে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছিল হানাদার বাহিনী। দেশের আনাচে-কানাচে বেজে চলছিল যুদ্ধের দামামা। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ মাসের ১০ তারিখে নোয়াখালী জেলার সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি লেখাপড়া করেছেন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে তিনি কমিশন লাভ করেন। আর্টিলারি ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি একটি পদাতিক ব্রিগেডের তৃতীয় গ্রেডের স্টাফ অফিসার (অপারেশন্স), বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্লাটুন কমান্ডার, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাকটিক্স (ট্যাকটিকস উইং)-এর বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দ্বিতীয় গ্রেডের অফিসার (ফরেন অ্যাফেয়ার্স) হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুই বছরের অধিক সময় একটি ফিল্ড রেজিমেন্টের আর্টিলারি কমান্ড করেছেন। তিনি  সেনা সদর দপ্তরে মিলিটারি অপারেশন্স পরিদপ্তরে ১ম গ্রেডের স্টাফ অফিসার (জয়েন্ট অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড, টাম্পা, ফ্লোরিডাতে কাজ করেছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য তিনি বীরত্বসূচক পুরস্কার ‘জয়েন্ট সার্ভিসেস কমেন্ডেশন মেডেল’ লাভ করেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে তিনি আর্মি ট্রেনিং ও ডকট্রিন কমান্ডে, ফর্মেশন ট্রেনিং ইভালুয়েটর এবং ডকট্রিন ডিভিশন-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব  পালন করেছেন। তিনি একটি আর্টিলারি ব্রিগেড কমান্ড করেছেন এবং স্বর্ণ দ্বীপের টাস্কফোর্স কমান্ডার ছিলেন। সেনা সদর দপ্তরের মিলিটারি ট্রেনিং ডিরেক্টরেট-এর পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের গর্বিত পিতা। বর্তমানে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি জনগুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর মহাপরিচালক-এর দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনায়। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১ বছর সময়ের মধ্যেই তাঁর সফল নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিসে দৃশ্যমান হয়েছে কিছু ঐতিহাসিক সাফল্য। শুরু হয়েছে উল্লেখ করার মতো নানান কর্মযজ্ঞ। এসব বিষয়ে তাঁর সাথে

বিডিসংবাদ-এর কথপোকথনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিম্নে তুলে ধরা হলো :

বিডিসংবাদ :  আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩’ পদক অর্জন করেছে। এত বড় অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জনসাধারণের জীবন ও সম্পদ রক্ষায়, অপারেশনাল সেবার মান বৃদ্ধিতে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

মহাপরিচালক : নিঃসন্দেহে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩’ প্রাপ্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও গর্বের বিষয়। কিন্তু এটি আমার একার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমাকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন এ প্রাপ্তি ও অর্জন তাদের সকলেরই। এ প্রতিষ্ঠানে এর আগে যারা কাজ করেছেন, এটি তাদেরও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। তবে আমাদের সেবা ও কাজের মাধ্যমে এ সম্মান ধরে রাখা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আপনি নিশ্চই জানেন যে, অগ্নিকান্ডসহ সকল দুর্যোগ মোকাবিলায় এশিয়ায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য সামনে নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। যেমন বিশেষ উদ্ধার কর্মীদের নিয়ে HAZMAT টিম গঠন করা হয়েছে, যারা যে কোন কেমিক্যাল দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজে বিশেষভাবে পারদর্শী ও উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এছাড়া নৌ দুর্ঘটনায় আন্ডার ওয়াটার রেসকিউ কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর/দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার জন্য স্পেশাল ডুবুরি দল গঠন করা হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স সেবা বৃদ্ধির জন্য ‘অ্যাম্বুলেন্স সম্প্রসারণ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে, কর্মীদের জন্য দেশে-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, নতুন জনবল সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আরো আধুনিক ও কার্যকর উদ্ধার সরঞ্জামাদি সংগ্রহ  কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিডিসংবাদ :  ‘সেফটি ফার্স্ট’ অর্থাৎ নিরাপত্তাই প্রথম। এই বিষয়ে জনগণের নিজ নিজ ক্ষেত্রে কতটুকু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

বিডিসংবাদ -এর নির্বাহী সম্পাদকের সাথে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোকে প্রশ্নোত্তরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতিনিয়তই আমরা প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রকম দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে থাকি। নিজ গৃহে হোক, কর্মস্থলে হোক, যানবাহনে চলাকালে হোক সর্বত্রই আমাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। অগ্নিদুর্ঘটনা, ভবনধস, জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে দুর্ঘটনা বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ‍পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। প্রাথমিকভাবে নিজের ও নিজের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান থাকা এবং প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। যাতে করে দুর্যোগ-দুর্ঘটনা প্রশমনে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়।

বিডিসংবাদ :  : শিল্প কল-কারখানা/ গার্মেন্টস সেক্টরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক ভাবে অগ্নিনিয়ন্ত্রণ না করার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য আপনাদের পক্ষ থেকে করণীয় কি?

মহাপরিচালক : দেশে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে দ্রুত হারে শিল্প কল-কারখানা গড়ে উঠছে। উক্ত শিল্প কারখানায় সম্ভাব্য অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় সরকারি বিধি-বিধানের আলোকে বিভিন্ন ধরনের অগ্নিপ্রতিরোধ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও সেগুলি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও নিয়মিত মহড়া (ফায়ার ও ইভাকুয়েশন ড্রিল) অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ লক্ষ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২০২১ সালে ১১১৭৪টি, ২০২২ সালে ১৮০৭২টি এবং ২০২৩ সালে এখন পর্যন্ত ৬৬২৯টি সচেতনতা বৃদ্ধির মহড়া ও ইভাকুয়েশন ড্রিল সম্পন্ন করা হয়েছে। শিল্প-কারখানায় কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে জানুয়ারি ২০২১ খ্রিঃ হতে মে ২০২৩ খ্রিঃ পর্যন্ত সর্বমোট ৭১৮৪টি প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে ২,৮৭,৩৬০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং ৪৪৫০টি মহড়া ও ১৬৫টি সার্ভে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

বিডিসংবাদ : শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে করণীয় বিষয়সমূহ কি?

মহাপরিচালক : আমরা জানি অগ্নিপ্রতিরোধ অগ্নিনির্বাপণের চেয়ে উত্তম। শিল্প-কারখানায় অগ্নিঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়। শিল্প-কারখানায় অগ্নিপ্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :

১. প্রতিটি ভবন ও শিল্প-কারখানায় নিজস্ব ফায়ার সেফটি প্লান প্রণয়ন করতে হবে এবং ফায়ার সেফটি প্লানের শর্ত অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।

২. সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৩. ভবনে ফায়ার ডিটেকশন ও অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন করতে হবে।

৪. ভবনে প্রয়োজনীয় ইমারজেন্সি এক্সিট (জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি) স্থাপন করতে হবে।

৫. ভবনে মানসম্মত বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম স্থাপন করতে হবে।

৬. প্রতিটি শিল্প-কারখানায় অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী অগ্নি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।

৭. শিল্প-কারখানায় ধূমপান নিষিদ্ধ করতে হবে এবং দৃশ্যমান স্থানে সতর্কীকরণ পোস্টার লাগাতে হবে।

৮. শিল্প-কারখানায় কর্মীদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হতে ফায়ার সেফটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।

৯.  শিল্প-কারখানায় নিয়মিত ফায়ার ড্রিল ও ইভাকুয়েশন মহড়ার আয়োজন করতে হবে। 

১০. জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে কি করতে হবে এ বিষয়ে সকলের স্বচ্ছ ধারণা ও জ্ঞান থাকতে হবে।

১১. শিল্প-কারখানায় দৃশ্যমান স্থানে ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুম/নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশনের টেলিফোন নম্বর বড় হরফে লিখে রাখতে হবে এবং যে কোন অগ্নিদুর্ঘটনায় সাহায্যের জন্য দ্রুত সংবাদ দিতে হবে। 

১২. ভবনের সকল জরুরি বর্হিগমন পথ সবসময় বাধামুক্ত ও খোলা রাখতে হবে।

১৩. সিঁড়ি পথে ছাদে ওঠার দরজা সবসময় খোলা রাখতে হবে এবং ছাদ উন্মুক্ত রাখতে হবে।

১৪. আপদকালীন নির্গমন নির্দেশিকা সহ বর্হিগমন পথে ব্যাটারি চালিত এক্সিট সাইন স্থাপন করতে হবে।

১৫. জরুরি নির্গমন সিঁড়িগুলি ধোঁয়ামুক্ত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১৬. ইমারজেন্সি এক্সিটের দরজাগুলি অগ্নি প্রতিরোধমূলক দরজা (Fire Door) হতে হবে।

১৭। Fire & rescue app-এ ভবন মালিক কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন করে সকল তথ্য দিয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহযোগিতা করা।

বিডিসংবাদ:  অতীতে সংঘটিত ঘটনার মূল্যায়নে লক্ষণীয় যে, দুর্যোগে আক্রান্ত জনগণকে ও সম্পদ রক্ষায় আপনারা অপারেশনকালীন কাজে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। এ কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একটি জন-সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। অগ্নি দুর্ঘটনার হাত থেকে জন-সাধারণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য এ বিভাগের প্রতিটি কর্মী অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সর্বদা নিয়োজিত থাকে। সেক্ষেত্রে অপারেশনাল কার্যক্রমে দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় রাস্তায় যানজট সমস্যার কারণে দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। রাস্তায় চলমান যেকোন ধরনের যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের আরো সহানুভূতিশীল হয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে জরুরি গমনে সহযোগিতা করতে হবে। দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে উৎসুক জনগণ অহেতুক ভিড় না করে উদ্ধার কার্যক্রম, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার পরিচালনায় নিয়োজিত টিমকে দ্রুত চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো থেকে বিরত থেকে উদ্ধারকারীদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া উচিত। দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে ফিতা বা রশি দিয়ে কর্ডন করা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় উদ্ধারকর্মী ব্যতীত অন্যরা প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। নগরীতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বিহীন অপরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরি থেকে জনগণকে বিরত থাকা উচিত। অপারেশন চলাকালীন বিভিন্ন স্থানে আপনারা লক্ষ করেছেন যে, আমাদের সদস্যদের পাশাপাশি অনেক স্বেচ্ছাসেবক অথবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজ উদ্যোগে আমাদের কাজে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তাদেরকে আমরা পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ভবিষ্যতে যে কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুত করে রাখি। আপনারা এ-ও লক্ষ করেছেন, বিগত কয়েক বছরে আমরা যে সব স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা অনেকে বিভিন্ন বড় বড় দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় আমাদের সাথে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতেও যারা মানবতার কল্যাণে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে আগ্রহী হবেন তাদেরকে আমরা অবশ্যই প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলবো। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্পৃক্ততা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। বিগত সময়ে বিভিন্ন বড় বড় অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষ এবং স্বেচ্ছাসেবকগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাজে সহযোগিতা করেছেন। জনসম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বিডিসংবাদ :   বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আমাদের দেশের তুলনায় অগ্রগামী ও আধুনিক। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তথা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগকে আরো আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে সরকারের এবং আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আধুনিকায়ন এবং সমৃদ্ধ করার জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নতুন নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি আধুনিক অগ্নিনির্বাপক গাড়ি-পাম্প ও উদ্ধার সরঞ্জামাদি সংগ্রহ এবং কর্মীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার গঠনের পর এই অধিদপ্তরের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হয়েছে। যেখানে ২০০৮ সালে ফায়ার স্টেশন ছিল ২০৪ টি বর্তমানে সারাদেশে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ৪৯৫টি এবং জনবল ১৪,৪৬৮ জন। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলি সম্পন্ন হলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা হবে ৫৪৩টি এবং জনবল বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৬,০০০।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম ১টি করে ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এছাড়া অধিদপ্তরের কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফায়ার একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় ইতোমধ্যে ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একাডেমি নির্মাণের ডিপিপি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ১১ মডার্ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন আধুনিক গাড়ি-পাম্প আমরা সংগ্রহ করেছি। যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ৫টি টার্ন টেবিল লেডার  (উচ্চতা ৬৮ মিটার)। এসব আধুনিক গাড়ি ও সরঞ্জামাদি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর বহরে যুক্ত হওয়ায় আমাদের অপারেশনাল দক্ষতা ও সামর্থ অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায়  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে বিভিন্ন ধরনের অগ্নিনির্বাপক  গাড়ি ও উদ্ধার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে যা আমাদের অপারেশনাল ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর উন্নয়নে সহযোগিতা করছেন। জাপানি সহযোগী সংস্থা JICA-এর অর্থায়নে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর আধুনিক হেডকোয়ার্টার ভবন নির্মাণ এবং ১০টি জরাজীর্ণ ফায়ার স্টেশন ভবন রেট্রোফিটিং/ পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। KOICA-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় আধুনিক ERCC ভবন ( ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টার) নির্মিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শেড ও ওয়্যারহাউজ শেড নির্মিত হয়েছে। সার্বিকভাবে বলা যায় যে, বর্তমান সরকারের সঠিক দিকনির্দেশনায় ও সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে।

বিডিসংবাদ :  : যে কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় আপনাদের পাশাপাশি অনেক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন নিজ ‍উদ্যোগে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। সেক্ষেত্রে গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা ও জেলায় উদ্যোগী স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে আপনাদের কি কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা আছে?

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জনগণের প্রতিষ্ঠান। জনগণের জানমাল রক্ষায় আত্মোৎসর্গ করা বড় দৃষ্টান্ত এই প্রতিষ্ঠান। জনকল্যাণের জন্য এ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়, বরং জনগণের সম্পৃক্ততাই এ প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। স্বেচ্ছাসেবকগণ এ প্রতিষ্ঠানের সহায়ক শক্তি। প্রতিটি জেলা পর্যায়ে আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নিয়মিত জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এর সহযোগিতায় ইতোমধ্যে ৫০০০০ ভলান্টিয়ারকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর অপারেশনাল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন এবং সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছেন।

বিডিসংবাদ :  : এ পর্যন্ত আলোচিত ভয়াবহ দুর্ঘটনায় যারা আপনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছে, তাদের কি কোনভাবে মূল্যায়ন করেছেন?

মহাপরিচালকঃ আমি আগেই বলেছি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক ইতোমধ্যে ৫৪,৫০০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকগণ বিভিন্ন বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনায় যেমন রানা প্লাজা ভবনধস, বেগুনবাড়ী ভবনধস, নিমতলী অগ্নিকান্ড, তাজরিন ফ্যাশন্সে অগ্নিকান্ড, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ড, এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড, বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ড, বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ড, নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য অগ্নিদুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যদের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবায় ভূমিকা রেখেছেন। স্বেচ্ছাসেবকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদানের জন্য স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা প্রদান, বৈদেশিক সফর, টিওটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা, সতেজকরণ কোর্সের মাধ্যমে তাদের মূল ধারায় যুক্ত রাখা প্রভৃতি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিডিসংবাদ :  ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর পূর্ব প্রস্তুতি কি?

মহাপরিচালক : আপনি জানেন যে, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা প্রতি বৎসর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস প্রভৃতি দুর্যোগের শিকার হয়ে থাকি। অন্যদিকে ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার কোনো পূর্বাভাষ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও পূর্ব প্রস্তুতিই ভূমিকম্প মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায়। বর্তমান সরকারের সুপরিকল্পনা এবং সার্বিক সহযোগিতায় বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। একদিকে বিভিন্ন আধুনিক উদ্ধার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত গণসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা, মহড়া অনুষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ  প্রদান, স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা প্রভৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা ও যৌথ মহড়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত SOD-তে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে।

উদ্ধারকারী দলের তুরস্কে যাওয়া উপলক্ষে আজ বুধবার বিকেলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন।

বিডিসংবাদ: তুরস্কের মতো এমন ভয়াবহ ভূমিকম্প যদি বাংলাদেশে সংঘটিত হয়, সেক্ষেত্রে জানমালের কেমন ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে?

মহাপরিচালক : দেখুন, বাংলাদেশে প্রায়ই ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু তার মাত্রা মৃদু বা মাঝারি মানের। তবে ভূবিজ্ঞানীদের মতে বাংলাদেশে বড় মাপের ভূমিকম্পের সমূহ আশংকা রয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশকে তিনটি নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করা হয়েছে। রেড জোন (অতি ঝুঁকিপূর্ণ), ইয়েলো জোন (মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ) এবং গ্রিন জোন (কম ঝুঁকিপূর্ণ)। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রেড জোন এলাকায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট প্রভৃতি জেলা) তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। ঢাকা শহরে বিশেষ করে পুরান ঢাকা এলাকায় ঘনবসতি, অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট এবং বেশির ভাগ ভবন ব্রিক বিল্ট হওয়ায় অধিক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে ভূমিকম্প সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ভূমিকম্পের ‘এপিসেন্টার’ এবং ভূমিকম্প সংঘটনের ‘সময়’। ‘এপিসেন্টার’ দূরে হলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি যেমন ঘরবাড়ি ও ভবনধসের সংখ্যা কম হয়। আর দিনের বেলা ভূমিকম্প হলে হতাহতের সংখ্যা কম হয়, কারণ মানুষ জাগ্রত অবস্থায় দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে; রাতের বেলা ঘুমন্ত অবস্থায় যা সম্ভব হয় না।

বিডিসংবাদ : যানবাহনে রাজনৈতিক ও যে কোন ধরনের সহিংসতায় অগ্নিসংযোগ হয়। আগুন থেকে বাঁচার জন্য প্রাথমিক কৌশল ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা হিসেবে যানবাহনে কি ধরনের ব্যবস্থা রাখা উচিত বলে মনে করেন?

মহাপরিচালক : প্রথমত গাড়ির  চালক, হেলপার ও যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। অগ্নি ভয়াবহতা ও দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে থাকার প্রাথমিক কৌশল আয়ত্ব করা, গায়ে আগুন লাগলে দৌড়াদৌড়ি না করে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে হবে এবং শরীরের পুড়ে যাওয়া অঙ্গে অন্তত ৩০ মিনিট ঠাণ্ডা পানি ঢালতে হবে। যানবাহনে চলাচলের সময় গাড়ির জানালার গ্লাস বন্ধ রাখতে হবে। রাস্তার পাশে কিংবা অরক্ষিত স্থানে গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। গাড়ি থেকে নামার পথ সর্বদা বাধামুক্ত রাখতে হবে। প্রতিটি যানবাহনে ডিসিপি টাইপ ফায়ার এক্সটিংগুইসার (৫ কেজি) সংরক্ষণ করতে হবে এবং এক্সটিংগুইসারের সচিত্র ব্যবহার বিধি টাঙিয়ে রাখতে হবে। গাড়িতে সবসময় এক ক্যান (ন্যূনতম ৫ লিটার) পানি সংরক্ষণ করতে হবে। গাড়িতে ২টি চটের বস্তা/ ফায়ার ব্লাংকেট সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি যানবাহনের পিছনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের টেলিফোন নম্বর (০২২২৩৩৫৫৫৫৫ এবং ১৬১৬৩) বড় ও স্পষ্ট করে লিখে রাখতে হবে।

বিডিসংবাদ : অধিদপ্তরে যোগদানের পর উল্লেখযোগ্য সাফল্য ও আপনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা ও কর্মীদের সুবিধা বৃদ্ধিতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের অর্জনও উল্লেখ করার মতো। স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩ প্রাপ্তির পাশাপাশি আমাদের আরেকটি বড় অর্জন হলো ১৩ জনের ‘অগ্নি বীর’ খেতাব লাভ। সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নি নির্বাপণকালীন শহিদ ১৩ জন ফায়ারফাইটারকে সরকারিভাবে ‘অগ্নিবীর’ খেতাব প্রদান করা হয়েছে। ২০২২ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহের শুভ উদ্বোধন করেছেন। প্রধান অতিথির ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ অধিদপ্তরের কর্মীদের আজীবন রেশন প্রদানের পরিকল্পনার কথা সানুগ্রহ ঘোষণা করেন। একই সাথে তিনি ফায়ার সার্ভিস ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টে আরো ২০ কোটি টাকার অনুদান প্রদানের সানুগ্রহ ঘোষণা দিয়েছেন। এ বছরের ৬ মার্চ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত পল্লবী ফায়ার স্টেশনের উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাননীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, এসবিপি (বার), ওএসপি, এনডিইউ, পিএসসি, পিএইচডি। ফায়ার সার্ভিসের ইতিহাসে এটিই প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান কর্তৃক কোনো ফায়ার স্টেশন উদ্বোধনের ঘটনা।

এছাড়া তুরস্কে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রথমবারের মতো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর ১২ সদস্যকে উদ্ধারকাজে পাঠানো হয়। তাদের উদ্ধারকাজ সারা বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে। বিশ্বের সর্বাধিক ৬৮ মিটার উচ্চতার লেডার সংবলিত টিটিএল গাড়ি যুক্ত হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর যান্ত্রিক বহরে। এছাড়া অপারেশনাল কাজে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল বিভাগে টার্ন টেবল লেডার প্রদান করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সকল দপ্তরের জমির নামজারিতে শৃঙ্খলা আনা হয়েছে এবং সকল জমিজমায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।

আমার সময়ে গৃহীত অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের চত্বরে অগ্নিসেনা উদ্যান নির্মাণ, অধিদপ্তরে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন গেইট ও কনফারেন্স রুম নির্মাণ, সরকারি খরচে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের হজ পালনের সুবিধা সৃষ্টি, ফায়ার সার্ভিসের শহিদ পরিবারকে বিভিন্ন উৎসবে শুভেচ্ছা উপহার প্রদান, দেশের সর্বত্র পপুলার হাসপাতালে ডিসকাউন্ট মূল্যে চিকিৎসা সুবিধা সৃষ্টি, শীতবস্ত্র ও ওষুধ এবং ইফতার প্রণোদনা প্রদান, বাংলালিংক কর্পোরেট সিম চালুকরণ, সীতাকুন্ড ও বঙ্গবাজার এবং নিউমার্কেট অগ্নিদুর্ঘটনায় সফল নেতৃত্ব প্রদান, অবসর গ্রহণকারীদের প্রত্যয়ন পত্র প্রদান, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ২য় তলা ক্যান্টিন নির্মাণ, পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে বিভিন্ন তথ্যবহুল পুস্তক প্রকাশসহ আরো কিছু কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কিছু কাজ চলমান রয়েছে। চলমান সকল কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমি সকলের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করছি।

অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করার পরও এ অধিদপ্তর দেশব্যাপী যথেষ্ট সুনামের সাথে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সংবাদ প্রাপ্তির ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দুর্ঘটনা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা যে কোন বিচারেই প্রশংসাযোগ্য। জনগণের সহযোগিতা থাকলে ভবিষ্যতেও এ বিভাগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনসাধারণের আরো আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। যে কোন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সামর্থ্য অনুযায়ী এ বিভাগের কর্মীরা সেবা প্রদানে ও জনগণের জানমাল হেফাজতে অংগীকারবদ্ধ।

মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

জনগণের জান-মাল রক্ষায় আত্মোৎসর্গ করার বড় দৃষ্টান্ত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স: মহাপরিচালক

আপডেট সময় : ০৮:০৯:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই” – কবি যাদেরকে প্রেরণা জোগানোর উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন এই বাণী – ঠিক তেমনি একটি অনন্য মানবীয় প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। শুধু পেশাদারির জন্য নয়; মহান আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্তের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিপদের বন্ধু হিসেবে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বীর অগ্নিযোদ্ধারা মানবিকতার জন্য প্রশংসীত হয়েছে দেশ-বিদেশেও। বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিদেশের মাটিতেও সফল উদ্ধার অভিযানের অভিযাত্রী হিসেবে দুর্দান্ত কাজ করে দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছেন আমাদের সুযোগ্য ফায়ার কর্মকর্তা ও কর্মীগণ। অনেক ফায়ার কর্মী মানুষের জান-মাল রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করে পেয়েছেন-মরণোত্তর বীরের খেতাব ও মর্যাদা। এই বাহিনীর প্রত্যেক কর্তব্য পালনকারী ব্যক্তিই মানবিকতার ক্ষেত্রে এক-একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাষ্ট্র কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে পরের তরে জীবন উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হয়নি আত্মত্যাগী মনোভাবসম্পন্ন এ প্রতিষ্ঠানটি! তাই রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় জনসেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৩’ পদকটি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এছাড়াও এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুদক্ষ ও সাহসী কর্মতৎপরতার অবদান রাখার জন্য ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক, সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেশ-বিদেশ থেকেও পেয়েছে একাধিক  সম্মাননা স্মারক ও পুরস্কার। এমন এক মানবিক প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হিসেবে যিনি সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন

বিডিসংবাদ- এর নির্বাহী সম্পাদক মোঃ আশরাফ উদ্দিন মুকুলের সাথে মহাপরিচালকের একান্ত আলাপচারিতায় বর্তমান কর্মক্ষেত্রের বাইরেও তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উঠে আসে সফলতার অজানা গল্পকথা! বাংলাদেশের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশে বজ্রকন্ঠে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এক ভাষণ দিয়ে দেশের মুক্তিকামী সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে এক সারিতে দাঁড় করেছিলেন!! দীর্ঘ শোষন-বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শুনিয়েছিলেন অমিয় বাণী : “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এমন ঘোষণায় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর আকাশে-বাতাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হুংকারে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। ২৫ মার্চ কালরাতে ঘুমন্ত নিরীহ নিরস্ত্র বাংলাভাষীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রাজপথ রক্তাক্ত করে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছিল হানাদার বাহিনী। দেশের আনাচে-কানাচে বেজে চলছিল যুদ্ধের দামামা। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ মাসের ১০ তারিখে নোয়াখালী জেলার সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি লেখাপড়া করেছেন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে তিনি কমিশন লাভ করেন। আর্টিলারি ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি একটি পদাতিক ব্রিগেডের তৃতীয় গ্রেডের স্টাফ অফিসার (অপারেশন্স), বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্লাটুন কমান্ডার, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাকটিক্স (ট্যাকটিকস উইং)-এর বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দ্বিতীয় গ্রেডের অফিসার (ফরেন অ্যাফেয়ার্স) হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুই বছরের অধিক সময় একটি ফিল্ড রেজিমেন্টের আর্টিলারি কমান্ড করেছেন। তিনি  সেনা সদর দপ্তরে মিলিটারি অপারেশন্স পরিদপ্তরে ১ম গ্রেডের স্টাফ অফিসার (জয়েন্ট অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড, টাম্পা, ফ্লোরিডাতে কাজ করেছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য তিনি বীরত্বসূচক পুরস্কার ‘জয়েন্ট সার্ভিসেস কমেন্ডেশন মেডেল’ লাভ করেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে তিনি আর্মি ট্রেনিং ও ডকট্রিন কমান্ডে, ফর্মেশন ট্রেনিং ইভালুয়েটর এবং ডকট্রিন ডিভিশন-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব  পালন করেছেন। তিনি একটি আর্টিলারি ব্রিগেড কমান্ড করেছেন এবং স্বর্ণ দ্বীপের টাস্কফোর্স কমান্ডার ছিলেন। সেনা সদর দপ্তরের মিলিটারি ট্রেনিং ডিরেক্টরেট-এর পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের গর্বিত পিতা। বর্তমানে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি জনগুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর মহাপরিচালক-এর দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনায়। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১ বছর সময়ের মধ্যেই তাঁর সফল নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিসে দৃশ্যমান হয়েছে কিছু ঐতিহাসিক সাফল্য। শুরু হয়েছে উল্লেখ করার মতো নানান কর্মযজ্ঞ। এসব বিষয়ে তাঁর সাথে

বিডিসংবাদ-এর কথপোকথনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিম্নে তুলে ধরা হলো :

বিডিসংবাদ :  আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩’ পদক অর্জন করেছে। এত বড় অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জনসাধারণের জীবন ও সম্পদ রক্ষায়, অপারেশনাল সেবার মান বৃদ্ধিতে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

মহাপরিচালক : নিঃসন্দেহে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩’ প্রাপ্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও গর্বের বিষয়। কিন্তু এটি আমার একার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমাকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন এ প্রাপ্তি ও অর্জন তাদের সকলেরই। এ প্রতিষ্ঠানে এর আগে যারা কাজ করেছেন, এটি তাদেরও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। তবে আমাদের সেবা ও কাজের মাধ্যমে এ সম্মান ধরে রাখা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আপনি নিশ্চই জানেন যে, অগ্নিকান্ডসহ সকল দুর্যোগ মোকাবিলায় এশিয়ায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য সামনে নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। যেমন বিশেষ উদ্ধার কর্মীদের নিয়ে HAZMAT টিম গঠন করা হয়েছে, যারা যে কোন কেমিক্যাল দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজে বিশেষভাবে পারদর্শী ও উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এছাড়া নৌ দুর্ঘটনায় আন্ডার ওয়াটার রেসকিউ কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর/দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার জন্য স্পেশাল ডুবুরি দল গঠন করা হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স সেবা বৃদ্ধির জন্য ‘অ্যাম্বুলেন্স সম্প্রসারণ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে, কর্মীদের জন্য দেশে-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, নতুন জনবল সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আরো আধুনিক ও কার্যকর উদ্ধার সরঞ্জামাদি সংগ্রহ  কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিডিসংবাদ :  ‘সেফটি ফার্স্ট’ অর্থাৎ নিরাপত্তাই প্রথম। এই বিষয়ে জনগণের নিজ নিজ ক্ষেত্রে কতটুকু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

বিডিসংবাদ -এর নির্বাহী সম্পাদকের সাথে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোকে প্রশ্নোত্তরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতিনিয়তই আমরা প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রকম দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে থাকি। নিজ গৃহে হোক, কর্মস্থলে হোক, যানবাহনে চলাকালে হোক সর্বত্রই আমাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। অগ্নিদুর্ঘটনা, ভবনধস, জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে দুর্ঘটনা বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ‍পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। প্রাথমিকভাবে নিজের ও নিজের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান থাকা এবং প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। যাতে করে দুর্যোগ-দুর্ঘটনা প্রশমনে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়।

বিডিসংবাদ :  : শিল্প কল-কারখানা/ গার্মেন্টস সেক্টরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক ভাবে অগ্নিনিয়ন্ত্রণ না করার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য আপনাদের পক্ষ থেকে করণীয় কি?

মহাপরিচালক : দেশে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে দ্রুত হারে শিল্প কল-কারখানা গড়ে উঠছে। উক্ত শিল্প কারখানায় সম্ভাব্য অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় সরকারি বিধি-বিধানের আলোকে বিভিন্ন ধরনের অগ্নিপ্রতিরোধ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও সেগুলি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও নিয়মিত মহড়া (ফায়ার ও ইভাকুয়েশন ড্রিল) অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ লক্ষ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২০২১ সালে ১১১৭৪টি, ২০২২ সালে ১৮০৭২টি এবং ২০২৩ সালে এখন পর্যন্ত ৬৬২৯টি সচেতনতা বৃদ্ধির মহড়া ও ইভাকুয়েশন ড্রিল সম্পন্ন করা হয়েছে। শিল্প-কারখানায় কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে জানুয়ারি ২০২১ খ্রিঃ হতে মে ২০২৩ খ্রিঃ পর্যন্ত সর্বমোট ৭১৮৪টি প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে ২,৮৭,৩৬০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং ৪৪৫০টি মহড়া ও ১৬৫টি সার্ভে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

বিডিসংবাদ : শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে করণীয় বিষয়সমূহ কি?

মহাপরিচালক : আমরা জানি অগ্নিপ্রতিরোধ অগ্নিনির্বাপণের চেয়ে উত্তম। শিল্প-কারখানায় অগ্নিঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়। শিল্প-কারখানায় অগ্নিপ্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :

১. প্রতিটি ভবন ও শিল্প-কারখানায় নিজস্ব ফায়ার সেফটি প্লান প্রণয়ন করতে হবে এবং ফায়ার সেফটি প্লানের শর্ত অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।

২. সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৩. ভবনে ফায়ার ডিটেকশন ও অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন করতে হবে।

৪. ভবনে প্রয়োজনীয় ইমারজেন্সি এক্সিট (জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি) স্থাপন করতে হবে।

৫. ভবনে মানসম্মত বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম স্থাপন করতে হবে।

৬. প্রতিটি শিল্প-কারখানায় অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী অগ্নি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।

৭. শিল্প-কারখানায় ধূমপান নিষিদ্ধ করতে হবে এবং দৃশ্যমান স্থানে সতর্কীকরণ পোস্টার লাগাতে হবে।

৮. শিল্প-কারখানায় কর্মীদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হতে ফায়ার সেফটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।

৯.  শিল্প-কারখানায় নিয়মিত ফায়ার ড্রিল ও ইভাকুয়েশন মহড়ার আয়োজন করতে হবে। 

১০. জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে কি করতে হবে এ বিষয়ে সকলের স্বচ্ছ ধারণা ও জ্ঞান থাকতে হবে।

১১. শিল্প-কারখানায় দৃশ্যমান স্থানে ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুম/নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশনের টেলিফোন নম্বর বড় হরফে লিখে রাখতে হবে এবং যে কোন অগ্নিদুর্ঘটনায় সাহায্যের জন্য দ্রুত সংবাদ দিতে হবে। 

১২. ভবনের সকল জরুরি বর্হিগমন পথ সবসময় বাধামুক্ত ও খোলা রাখতে হবে।

১৩. সিঁড়ি পথে ছাদে ওঠার দরজা সবসময় খোলা রাখতে হবে এবং ছাদ উন্মুক্ত রাখতে হবে।

১৪. আপদকালীন নির্গমন নির্দেশিকা সহ বর্হিগমন পথে ব্যাটারি চালিত এক্সিট সাইন স্থাপন করতে হবে।

১৫. জরুরি নির্গমন সিঁড়িগুলি ধোঁয়ামুক্ত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১৬. ইমারজেন্সি এক্সিটের দরজাগুলি অগ্নি প্রতিরোধমূলক দরজা (Fire Door) হতে হবে।

১৭। Fire & rescue app-এ ভবন মালিক কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন করে সকল তথ্য দিয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহযোগিতা করা।

বিডিসংবাদ:  অতীতে সংঘটিত ঘটনার মূল্যায়নে লক্ষণীয় যে, দুর্যোগে আক্রান্ত জনগণকে ও সম্পদ রক্ষায় আপনারা অপারেশনকালীন কাজে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। এ কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একটি জন-সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। অগ্নি দুর্ঘটনার হাত থেকে জন-সাধারণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য এ বিভাগের প্রতিটি কর্মী অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সর্বদা নিয়োজিত থাকে। সেক্ষেত্রে অপারেশনাল কার্যক্রমে দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় রাস্তায় যানজট সমস্যার কারণে দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। রাস্তায় চলমান যেকোন ধরনের যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের আরো সহানুভূতিশীল হয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে জরুরি গমনে সহযোগিতা করতে হবে। দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে উৎসুক জনগণ অহেতুক ভিড় না করে উদ্ধার কার্যক্রম, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার পরিচালনায় নিয়োজিত টিমকে দ্রুত চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো থেকে বিরত থেকে উদ্ধারকারীদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া উচিত। দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে ফিতা বা রশি দিয়ে কর্ডন করা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় উদ্ধারকর্মী ব্যতীত অন্যরা প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। নগরীতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বিহীন অপরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরি থেকে জনগণকে বিরত থাকা উচিত। অপারেশন চলাকালীন বিভিন্ন স্থানে আপনারা লক্ষ করেছেন যে, আমাদের সদস্যদের পাশাপাশি অনেক স্বেচ্ছাসেবক অথবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজ উদ্যোগে আমাদের কাজে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তাদেরকে আমরা পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ভবিষ্যতে যে কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুত করে রাখি। আপনারা এ-ও লক্ষ করেছেন, বিগত কয়েক বছরে আমরা যে সব স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা অনেকে বিভিন্ন বড় বড় দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় আমাদের সাথে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতেও যারা মানবতার কল্যাণে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে আগ্রহী হবেন তাদেরকে আমরা অবশ্যই প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলবো। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্পৃক্ততা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। বিগত সময়ে বিভিন্ন বড় বড় অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষ এবং স্বেচ্ছাসেবকগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাজে সহযোগিতা করেছেন। জনসম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বিডিসংবাদ :   বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আমাদের দেশের তুলনায় অগ্রগামী ও আধুনিক। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তথা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগকে আরো আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে সরকারের এবং আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আধুনিকায়ন এবং সমৃদ্ধ করার জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নতুন নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি আধুনিক অগ্নিনির্বাপক গাড়ি-পাম্প ও উদ্ধার সরঞ্জামাদি সংগ্রহ এবং কর্মীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার গঠনের পর এই অধিদপ্তরের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হয়েছে। যেখানে ২০০৮ সালে ফায়ার স্টেশন ছিল ২০৪ টি বর্তমানে সারাদেশে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ৪৯৫টি এবং জনবল ১৪,৪৬৮ জন। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলি সম্পন্ন হলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা হবে ৫৪৩টি এবং জনবল বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৬,০০০।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম ১টি করে ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এছাড়া অধিদপ্তরের কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফায়ার একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় ইতোমধ্যে ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একাডেমি নির্মাণের ডিপিপি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ১১ মডার্ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন আধুনিক গাড়ি-পাম্প আমরা সংগ্রহ করেছি। যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ৫টি টার্ন টেবিল লেডার  (উচ্চতা ৬৮ মিটার)। এসব আধুনিক গাড়ি ও সরঞ্জামাদি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর বহরে যুক্ত হওয়ায় আমাদের অপারেশনাল দক্ষতা ও সামর্থ অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায়  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে বিভিন্ন ধরনের অগ্নিনির্বাপক  গাড়ি ও উদ্ধার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে যা আমাদের অপারেশনাল ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর উন্নয়নে সহযোগিতা করছেন। জাপানি সহযোগী সংস্থা JICA-এর অর্থায়নে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর আধুনিক হেডকোয়ার্টার ভবন নির্মাণ এবং ১০টি জরাজীর্ণ ফায়ার স্টেশন ভবন রেট্রোফিটিং/ পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। KOICA-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় আধুনিক ERCC ভবন ( ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টার) নির্মিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শেড ও ওয়্যারহাউজ শেড নির্মিত হয়েছে। সার্বিকভাবে বলা যায় যে, বর্তমান সরকারের সঠিক দিকনির্দেশনায় ও সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে।

বিডিসংবাদ :  : যে কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় আপনাদের পাশাপাশি অনেক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন নিজ ‍উদ্যোগে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। সেক্ষেত্রে গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা ও জেলায় উদ্যোগী স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে আপনাদের কি কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা আছে?

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জনগণের প্রতিষ্ঠান। জনগণের জানমাল রক্ষায় আত্মোৎসর্গ করা বড় দৃষ্টান্ত এই প্রতিষ্ঠান। জনকল্যাণের জন্য এ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়, বরং জনগণের সম্পৃক্ততাই এ প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। স্বেচ্ছাসেবকগণ এ প্রতিষ্ঠানের সহায়ক শক্তি। প্রতিটি জেলা পর্যায়ে আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নিয়মিত জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এর সহযোগিতায় ইতোমধ্যে ৫০০০০ ভলান্টিয়ারকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর অপারেশনাল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন এবং সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছেন।

বিডিসংবাদ :  : এ পর্যন্ত আলোচিত ভয়াবহ দুর্ঘটনায় যারা আপনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছে, তাদের কি কোনভাবে মূল্যায়ন করেছেন?

মহাপরিচালকঃ আমি আগেই বলেছি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক ইতোমধ্যে ৫৪,৫০০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকগণ বিভিন্ন বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনায় যেমন রানা প্লাজা ভবনধস, বেগুনবাড়ী ভবনধস, নিমতলী অগ্নিকান্ড, তাজরিন ফ্যাশন্সে অগ্নিকান্ড, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ড, এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড, বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ড, বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ড, নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য অগ্নিদুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যদের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবায় ভূমিকা রেখেছেন। স্বেচ্ছাসেবকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদানের জন্য স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা প্রদান, বৈদেশিক সফর, টিওটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা, সতেজকরণ কোর্সের মাধ্যমে তাদের মূল ধারায় যুক্ত রাখা প্রভৃতি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিডিসংবাদ :  ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর পূর্ব প্রস্তুতি কি?

মহাপরিচালক : আপনি জানেন যে, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা প্রতি বৎসর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস প্রভৃতি দুর্যোগের শিকার হয়ে থাকি। অন্যদিকে ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার কোনো পূর্বাভাষ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও পূর্ব প্রস্তুতিই ভূমিকম্প মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায়। বর্তমান সরকারের সুপরিকল্পনা এবং সার্বিক সহযোগিতায় বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। একদিকে বিভিন্ন আধুনিক উদ্ধার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত গণসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা, মহড়া অনুষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ  প্রদান, স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা প্রভৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা ও যৌথ মহড়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত SOD-তে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে।

উদ্ধারকারী দলের তুরস্কে যাওয়া উপলক্ষে আজ বুধবার বিকেলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন।

বিডিসংবাদ: তুরস্কের মতো এমন ভয়াবহ ভূমিকম্প যদি বাংলাদেশে সংঘটিত হয়, সেক্ষেত্রে জানমালের কেমন ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে?

মহাপরিচালক : দেখুন, বাংলাদেশে প্রায়ই ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু তার মাত্রা মৃদু বা মাঝারি মানের। তবে ভূবিজ্ঞানীদের মতে বাংলাদেশে বড় মাপের ভূমিকম্পের সমূহ আশংকা রয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশকে তিনটি নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করা হয়েছে। রেড জোন (অতি ঝুঁকিপূর্ণ), ইয়েলো জোন (মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ) এবং গ্রিন জোন (কম ঝুঁকিপূর্ণ)। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রেড জোন এলাকায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট প্রভৃতি জেলা) তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। ঢাকা শহরে বিশেষ করে পুরান ঢাকা এলাকায় ঘনবসতি, অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট এবং বেশির ভাগ ভবন ব্রিক বিল্ট হওয়ায় অধিক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে ভূমিকম্প সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ভূমিকম্পের ‘এপিসেন্টার’ এবং ভূমিকম্প সংঘটনের ‘সময়’। ‘এপিসেন্টার’ দূরে হলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি যেমন ঘরবাড়ি ও ভবনধসের সংখ্যা কম হয়। আর দিনের বেলা ভূমিকম্প হলে হতাহতের সংখ্যা কম হয়, কারণ মানুষ জাগ্রত অবস্থায় দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে; রাতের বেলা ঘুমন্ত অবস্থায় যা সম্ভব হয় না।

বিডিসংবাদ : যানবাহনে রাজনৈতিক ও যে কোন ধরনের সহিংসতায় অগ্নিসংযোগ হয়। আগুন থেকে বাঁচার জন্য প্রাথমিক কৌশল ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা হিসেবে যানবাহনে কি ধরনের ব্যবস্থা রাখা উচিত বলে মনে করেন?

মহাপরিচালক : প্রথমত গাড়ির  চালক, হেলপার ও যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। অগ্নি ভয়াবহতা ও দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে থাকার প্রাথমিক কৌশল আয়ত্ব করা, গায়ে আগুন লাগলে দৌড়াদৌড়ি না করে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে হবে এবং শরীরের পুড়ে যাওয়া অঙ্গে অন্তত ৩০ মিনিট ঠাণ্ডা পানি ঢালতে হবে। যানবাহনে চলাচলের সময় গাড়ির জানালার গ্লাস বন্ধ রাখতে হবে। রাস্তার পাশে কিংবা অরক্ষিত স্থানে গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। গাড়ি থেকে নামার পথ সর্বদা বাধামুক্ত রাখতে হবে। প্রতিটি যানবাহনে ডিসিপি টাইপ ফায়ার এক্সটিংগুইসার (৫ কেজি) সংরক্ষণ করতে হবে এবং এক্সটিংগুইসারের সচিত্র ব্যবহার বিধি টাঙিয়ে রাখতে হবে। গাড়িতে সবসময় এক ক্যান (ন্যূনতম ৫ লিটার) পানি সংরক্ষণ করতে হবে। গাড়িতে ২টি চটের বস্তা/ ফায়ার ব্লাংকেট সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি যানবাহনের পিছনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের টেলিফোন নম্বর (০২২২৩৩৫৫৫৫৫ এবং ১৬১৬৩) বড় ও স্পষ্ট করে লিখে রাখতে হবে।

বিডিসংবাদ : অধিদপ্তরে যোগদানের পর উল্লেখযোগ্য সাফল্য ও আপনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।

মহাপরিচালক : ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা ও কর্মীদের সুবিধা বৃদ্ধিতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের অর্জনও উল্লেখ করার মতো। স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩ প্রাপ্তির পাশাপাশি আমাদের আরেকটি বড় অর্জন হলো ১৩ জনের ‘অগ্নি বীর’ খেতাব লাভ। সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নি নির্বাপণকালীন শহিদ ১৩ জন ফায়ারফাইটারকে সরকারিভাবে ‘অগ্নিবীর’ খেতাব প্রদান করা হয়েছে। ২০২২ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহের শুভ উদ্বোধন করেছেন। প্রধান অতিথির ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ অধিদপ্তরের কর্মীদের আজীবন রেশন প্রদানের পরিকল্পনার কথা সানুগ্রহ ঘোষণা করেন। একই সাথে তিনি ফায়ার সার্ভিস ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টে আরো ২০ কোটি টাকার অনুদান প্রদানের সানুগ্রহ ঘোষণা দিয়েছেন। এ বছরের ৬ মার্চ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত পল্লবী ফায়ার স্টেশনের উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাননীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, এসবিপি (বার), ওএসপি, এনডিইউ, পিএসসি, পিএইচডি। ফায়ার সার্ভিসের ইতিহাসে এটিই প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান কর্তৃক কোনো ফায়ার স্টেশন উদ্বোধনের ঘটনা।

এছাড়া তুরস্কে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রথমবারের মতো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর ১২ সদস্যকে উদ্ধারকাজে পাঠানো হয়। তাদের উদ্ধারকাজ সারা বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে। বিশ্বের সর্বাধিক ৬৮ মিটার উচ্চতার লেডার সংবলিত টিটিএল গাড়ি যুক্ত হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর যান্ত্রিক বহরে। এছাড়া অপারেশনাল কাজে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল বিভাগে টার্ন টেবল লেডার প্রদান করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সকল দপ্তরের জমির নামজারিতে শৃঙ্খলা আনা হয়েছে এবং সকল জমিজমায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।

আমার সময়ে গৃহীত অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের চত্বরে অগ্নিসেনা উদ্যান নির্মাণ, অধিদপ্তরে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন গেইট ও কনফারেন্স রুম নির্মাণ, সরকারি খরচে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের হজ পালনের সুবিধা সৃষ্টি, ফায়ার সার্ভিসের শহিদ পরিবারকে বিভিন্ন উৎসবে শুভেচ্ছা উপহার প্রদান, দেশের সর্বত্র পপুলার হাসপাতালে ডিসকাউন্ট মূল্যে চিকিৎসা সুবিধা সৃষ্টি, শীতবস্ত্র ও ওষুধ এবং ইফতার প্রণোদনা প্রদান, বাংলালিংক কর্পোরেট সিম চালুকরণ, সীতাকুন্ড ও বঙ্গবাজার এবং নিউমার্কেট অগ্নিদুর্ঘটনায় সফল নেতৃত্ব প্রদান, অবসর গ্রহণকারীদের প্রত্যয়ন পত্র প্রদান, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ২য় তলা ক্যান্টিন নির্মাণ, পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে বিভিন্ন তথ্যবহুল পুস্তক প্রকাশসহ আরো কিছু কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কিছু কাজ চলমান রয়েছে। চলমান সকল কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমি সকলের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করছি।

অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করার পরও এ অধিদপ্তর দেশব্যাপী যথেষ্ট সুনামের সাথে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সংবাদ প্রাপ্তির ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দুর্ঘটনা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা যে কোন বিচারেই প্রশংসাযোগ্য। জনগণের সহযোগিতা থাকলে ভবিষ্যতেও এ বিভাগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনসাধারণের আরো আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। যে কোন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সামর্থ্য অনুযায়ী এ বিভাগের কর্মীরা সেবা প্রদানে ও জনগণের জানমাল হেফাজতে অংগীকারবদ্ধ।

মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।