ঢাকা ১১:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাঁ-হাতি বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড স্টার্কের এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে পদক লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে পারে ভারত-পাকিস্তান কোকোর নামে বগুড়ায় জাতীয় প্যারা স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কারাবন্দি ও পলাতক আসামিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা আইন পাস করল লেবানন মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত দাবি সিনেটরদের জাপানের দাবিকৃত কুরিল দ্বীপপুঞ্জ সফর পুতিনের সুদানের রাজধানী খার্তুমে টানা দ্বিতীয় দিন আধাসামরিক বাহিনীর ড্রোন হামলা সকলের মতামত নিয়েই সংবিধান সংশোধন করা হবে: চিফ হুইপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দু’জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিল, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই: ইসি সচিব রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

এগিয়ে চলছে ২৬টি তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ

  • আপডেট সময় : ০৮:১৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মার্চ ২০২৪
  • / 511
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আহমেদ তেপান্তর

লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন। এ শব্দ তিনটি আমাদের বলে দেয় এক অনবদ্য সৃষ্টিশীলতার কথা। যে সৃষ্টির সঙ্গে চলচ্চিত্র, নাটক অথবা তথ্যচিত্র জড়িত।

পূর্ব পাকিস্তানে তথা পূর্ববাংলায় নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা সেলুলয়েডের ফিতায় তুলে ধরতে বঙ্গবন্ধুর অবদান অসামান্য। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও একাগ্রতার জোরে ওই সময়ে চলচ্চিত্রশিল্প সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। শুধু তাই নয়, তার ঐকান্তিক ইচ্ছায় জাতীয়তাবোধসমৃদ্ধ সিনেমা নির্মাণ হতে থাকে। তৈরি হয় জীবন থেকে নেয়া, ময়নামতী, নীল আকাশের নিচে, আবির্ভাব, সংসার প্রভৃতি ছবি। স্বাধীনতার পর দেশীয় কলাকুশলীদের নিয়ে সিনেমার স্বতন্ত্র চিন্তাধারাকে বেগবান করতে বঙ্গবন্ধু বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলেই তাঁর সরকারের সমালোচনা করে নির্মিত হয় ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এবং ‘আলোর মিছিলের’ মতো সিনেমা।

বঙ্গবন্ধু সমালোচনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে এ সময় চলচ্চিত্র যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সমৃদ্ধ ও গতি পায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে সে গতি বাধাগ্রস্ত হয়। উগ্রবাদী মানসিকতায় সিনেমা নির্মাণে স্বাতন্ত্র্যবোধ, সমাজ বিনির্মাণে বিষয়বস্তুগুলোর ভাবধারায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। ইতিহাস পঙ্কিলতায় ভুল তথ্য সেলুলয়েডে স্থান করে নেয়।

একপর্যায়ে অশ্লীল ও নিম্নরুচির সিনেমা নির্মাণের হিড়িক পড়ে। পঁচাত্তর-পূর্ববর্তী সিনেমাশিল্পে যে চেতনায় আঁচড় পড়েছিল, তা সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত হয়। সরকারের উন্নাসিক মানসিকতার বলি হয় বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার সিনেমাশিল্প। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে একবিংশ শতকের শূন্য দশকে সিনেমা অঙ্গন চরিত্রহননকারী কালোটাকার মালিকদের পয়মন্ত মাঠে পরিণত হয়। ওই সময় সেলুলয়েডে মুক্তিযুদ্ধ আর সংগ্রাম উপেক্ষিত হয়।

মুক্তচিন্তার বাহকরা সেলুলয়েড থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন। পারিবারিক দর্শক সংখ্যা কমতে থাকায় এ শিল্পে অচলায়তন সৃষ্টি হয়। জোট শাসনামলের খেসারত দিতে বন্ধ হয় কয়েক শ সিনেমা হল! হলগুলো গুদাম, স্কুটারের গ্যারেজে পরিণত হয়, যা ওই সময়ের দেশের সামগ্রিক সংকটময় দৃশ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এমন অচলায়তনের মুখে দ্বিতীয়বারের মতো শাসনভার গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি ২০১২ সালে চলচ্চিত্রকে ‘শিল্প’ ঘোষণা করলেন। এতে মৃত্যুর ঘোর কাটিয়ে প্রাণ ফিরে পায় সিনেমা অঙ্গন। যদিও শিল্পের সুবিধা এখনো অধরা। তারপরও মানসিকভাবে উজ্জীবিত হয় সিনেমাসংশ্লিষ্টরা।

এক দশক পর অন্ধকার গুহার শেষবিন্দুতে আলোকশিখার দেখা মেলে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন সিনেমা হল সংস্কার, পুনর্বিন্যাস এবং নতুন করে গড়ার ক্ষেত্রে হাজার কোটি টাকা ঋণ-প্রণোদনার। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন সিনেমা হল মালিকরা। প্রদর্শনের জায়গার অভাবে সিনেমা নির্মাণের মতো বিশাল যজ্ঞের কাজটি ততদিনে ঝিমিয়ে পড়েছে। ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন ঘোষণা মরুর বুকে পানির ফোঁটার মতো আশার সঞ্চার করে চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক, নির্মাতা এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে। ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি একনেক সভায় এ সংক্রান্ত বিলটি অনুমোদন লাভ করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব লাভ করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। সহযোগী হিসাবে যুক্ত থাকছে গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তর। যেখানে একটি করে দেড়শ আসনের আধুনিক সিনেপ্লেক্স যুক্ত হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপলব্ধিÑস্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যেমন উপযুক্ত দর্শক চাই; তেমনই বিশ^ায়নের পথে এগিয়ে নিতে দক্ষ নির্মাতা প্রয়োজন। কারণ, স্বাধীন (ইনডিপেনডেন্ট) নির্মাতারা নির্মাণশৈলী দিয়ে বিশ^ অঙ্গনে সফল হলেও খোদ নিজ দেশে তাঁরা অবহেলিত। প্রদর্শনের অভাবে অঙ্কুরেই আশাহত হন তরুণরা। বঞ্চিত হন দর্শকও। এতে দেশ মেধাবীদের হারায়। সুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে প্রতিভা। সে অবস্থার পরিবর্তনে একনেকে বিল পাশ করে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, মাগুরায় জমি অধিগ্রহণ করে নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। দুই বছরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবেÑএমনটাই জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান।

তিনি প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে ব্যাপক নিরীক্ষা চালানো হয়। এর ভিত্তিতে পাঁচটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমরা এগোচ্ছি।’

প্রথমত, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য ব্যয়সাশ্রয়ী এবং তথ্য ও যোগাযোগনির্ভর তথ্যকেন্দ্র (হাব) প্রতিষ্ঠা করে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের জেলা তথ্য অফিসের সেবা প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা।

দ্বিতীয়ত, তথ্য কমপ্লেক্সে নির্মিতব্য ডিজিটাল মাল্টিপারপাস সিনেমা হলে জনগণের মধ্যে সুস্থধারার চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়ন সাধন করা।

তৃতীয়ত, সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

চতুর্থত, তথ্য কমপ্লেক্সটিকে পরামর্শকেন্দ্রে পরিণত করে সর্বস্তরের জনগণ, সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রেস ক্লাব, কমিউনিটি রেডিয়ো, পর্যটন করপোরেশন ও প্রবাসী কল্যাণের জন্য পরস্পরের মাঝে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্পর্কিত তথ্যাবলি সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল লাইব্রেরি, ডিজিটাল আর্কাইভ ইত্যাদি নির্মাণ করা।

পঞ্চমত, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা যেমন ভিশন ২০২১, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রভৃতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ডিজিটাল ধারণা এবং আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

প্রকল্পের যৌক্তিকতার প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড প্রচার এবং দেশের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল রাখার ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রচারের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে তথ্য প্রদান, অবহিত ও উদ্বুদ্ধকরণ।

এক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে যা টিভি, বেতার ব্যবহারের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের তথ্য অফিসের অন্যতম প্রচার কৌশল আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার হয়ে থাকে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের ৬৪টি জেলা তথ্য অফিস জনগণের প্রতিক্রিয়া যথাযথ মাধ্যমে সরকারকে অবহিত করছে এবং সরকার, গণমাধ্যমকর্মী ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসাবে কাজ করছে। তবে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে তথ্য অফিসগুলোর নিজস্ব কোনো ভবন না থাকায় এ অধিদপ্তরের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পটভূমিতে ৭টি বিভাগ এবং ১৯টি জেলা তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে ‘জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে।

জানা যায়, ৭টি বিভাগ ছাড়াও ১৯টি জেলাজুড়ে প্রথম পর্যায়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগীয় তথ্য অফিস ছাড়াও গোপালগঞ্জ, মাগুরা, বান্দরবান, নোয়াখালী, পঞ্চগড়, পাবনা, জয়পুরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, বাগেরহাট, কুমিল্লা, কক্সবাজার, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলা তথ্য অফিস।
প্রকল্পের ১ম পর্যায়ে ঢাকা ব্যতীত ৭টি বিভাগে সাততলা তথ্য কমপ্লেক্স এবং ১৯ জেলায় পাঁচতলা তথ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হবে।

তথ্য কমপ্লেক্সর মূল লক্ষ্য অফিস, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এখানে সিনেপ্লেক্স ও আইসিটি বিষয়াদি যেমন ইন্টারনেট, সাইবার ক্যাফে, ইনফরমেশন ডেস্ক, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের সংস্থান রাখা। আইসিটি বিষয়াদিসহ ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হলে তথ্য কমপ্লেক্স একটি তথ্যভান্ডার হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। অন্যদিকে সিনেপ্লেক্সে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুস্থধারার চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়ন সাধন হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, জাতির পিতার কর্ম ও জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখে সুস্থ ও বিনোদনসমৃদ্ধ প্রজন্ম এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে।

এদিকে তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিনেমা হল গড়তে ঋণ-প্রণোদনা ঘোষণায় গত দুই বছরে বন্ধ হওয়া সিনেমা হলগুলো খুলতে শুরু করেছে। ফলে বর্তমানে মাল্টিপ্লেক্সসহ মোট স্ক্রিনের সংখ্যা ১৭৯টি। ২০২৪ সালের মধ্যে এ সংখ্যা আড়াইশতে উন্নীত হবে। এর সঙ্গে তথ্য কমপ্লেক্সগুলো প্রস্তুত হলে বিশ^ায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুবসমাজ নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে, যা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ভিশন ২০৪১ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

এগিয়ে চলছে ২৬টি তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ

আপডেট সময় : ০৮:১৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মার্চ ২০২৪

আহমেদ তেপান্তর

লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন। এ শব্দ তিনটি আমাদের বলে দেয় এক অনবদ্য সৃষ্টিশীলতার কথা। যে সৃষ্টির সঙ্গে চলচ্চিত্র, নাটক অথবা তথ্যচিত্র জড়িত।

পূর্ব পাকিস্তানে তথা পূর্ববাংলায় নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা সেলুলয়েডের ফিতায় তুলে ধরতে বঙ্গবন্ধুর অবদান অসামান্য। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও একাগ্রতার জোরে ওই সময়ে চলচ্চিত্রশিল্প সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। শুধু তাই নয়, তার ঐকান্তিক ইচ্ছায় জাতীয়তাবোধসমৃদ্ধ সিনেমা নির্মাণ হতে থাকে। তৈরি হয় জীবন থেকে নেয়া, ময়নামতী, নীল আকাশের নিচে, আবির্ভাব, সংসার প্রভৃতি ছবি। স্বাধীনতার পর দেশীয় কলাকুশলীদের নিয়ে সিনেমার স্বতন্ত্র চিন্তাধারাকে বেগবান করতে বঙ্গবন্ধু বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলেই তাঁর সরকারের সমালোচনা করে নির্মিত হয় ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এবং ‘আলোর মিছিলের’ মতো সিনেমা।

বঙ্গবন্ধু সমালোচনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে এ সময় চলচ্চিত্র যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সমৃদ্ধ ও গতি পায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে সে গতি বাধাগ্রস্ত হয়। উগ্রবাদী মানসিকতায় সিনেমা নির্মাণে স্বাতন্ত্র্যবোধ, সমাজ বিনির্মাণে বিষয়বস্তুগুলোর ভাবধারায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। ইতিহাস পঙ্কিলতায় ভুল তথ্য সেলুলয়েডে স্থান করে নেয়।

একপর্যায়ে অশ্লীল ও নিম্নরুচির সিনেমা নির্মাণের হিড়িক পড়ে। পঁচাত্তর-পূর্ববর্তী সিনেমাশিল্পে যে চেতনায় আঁচড় পড়েছিল, তা সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত হয়। সরকারের উন্নাসিক মানসিকতার বলি হয় বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার সিনেমাশিল্প। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে একবিংশ শতকের শূন্য দশকে সিনেমা অঙ্গন চরিত্রহননকারী কালোটাকার মালিকদের পয়মন্ত মাঠে পরিণত হয়। ওই সময় সেলুলয়েডে মুক্তিযুদ্ধ আর সংগ্রাম উপেক্ষিত হয়।

মুক্তচিন্তার বাহকরা সেলুলয়েড থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন। পারিবারিক দর্শক সংখ্যা কমতে থাকায় এ শিল্পে অচলায়তন সৃষ্টি হয়। জোট শাসনামলের খেসারত দিতে বন্ধ হয় কয়েক শ সিনেমা হল! হলগুলো গুদাম, স্কুটারের গ্যারেজে পরিণত হয়, যা ওই সময়ের দেশের সামগ্রিক সংকটময় দৃশ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এমন অচলায়তনের মুখে দ্বিতীয়বারের মতো শাসনভার গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি ২০১২ সালে চলচ্চিত্রকে ‘শিল্প’ ঘোষণা করলেন। এতে মৃত্যুর ঘোর কাটিয়ে প্রাণ ফিরে পায় সিনেমা অঙ্গন। যদিও শিল্পের সুবিধা এখনো অধরা। তারপরও মানসিকভাবে উজ্জীবিত হয় সিনেমাসংশ্লিষ্টরা।

এক দশক পর অন্ধকার গুহার শেষবিন্দুতে আলোকশিখার দেখা মেলে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন সিনেমা হল সংস্কার, পুনর্বিন্যাস এবং নতুন করে গড়ার ক্ষেত্রে হাজার কোটি টাকা ঋণ-প্রণোদনার। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন সিনেমা হল মালিকরা। প্রদর্শনের জায়গার অভাবে সিনেমা নির্মাণের মতো বিশাল যজ্ঞের কাজটি ততদিনে ঝিমিয়ে পড়েছে। ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন ঘোষণা মরুর বুকে পানির ফোঁটার মতো আশার সঞ্চার করে চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক, নির্মাতা এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে। ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি একনেক সভায় এ সংক্রান্ত বিলটি অনুমোদন লাভ করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব লাভ করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। সহযোগী হিসাবে যুক্ত থাকছে গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তর। যেখানে একটি করে দেড়শ আসনের আধুনিক সিনেপ্লেক্স যুক্ত হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপলব্ধিÑস্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যেমন উপযুক্ত দর্শক চাই; তেমনই বিশ^ায়নের পথে এগিয়ে নিতে দক্ষ নির্মাতা প্রয়োজন। কারণ, স্বাধীন (ইনডিপেনডেন্ট) নির্মাতারা নির্মাণশৈলী দিয়ে বিশ^ অঙ্গনে সফল হলেও খোদ নিজ দেশে তাঁরা অবহেলিত। প্রদর্শনের অভাবে অঙ্কুরেই আশাহত হন তরুণরা। বঞ্চিত হন দর্শকও। এতে দেশ মেধাবীদের হারায়। সুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে প্রতিভা। সে অবস্থার পরিবর্তনে একনেকে বিল পাশ করে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, মাগুরায় জমি অধিগ্রহণ করে নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। দুই বছরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবেÑএমনটাই জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান।

তিনি প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে ব্যাপক নিরীক্ষা চালানো হয়। এর ভিত্তিতে পাঁচটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমরা এগোচ্ছি।’

প্রথমত, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য ব্যয়সাশ্রয়ী এবং তথ্য ও যোগাযোগনির্ভর তথ্যকেন্দ্র (হাব) প্রতিষ্ঠা করে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের জেলা তথ্য অফিসের সেবা প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা।

দ্বিতীয়ত, তথ্য কমপ্লেক্সে নির্মিতব্য ডিজিটাল মাল্টিপারপাস সিনেমা হলে জনগণের মধ্যে সুস্থধারার চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়ন সাধন করা।

তৃতীয়ত, সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

চতুর্থত, তথ্য কমপ্লেক্সটিকে পরামর্শকেন্দ্রে পরিণত করে সর্বস্তরের জনগণ, সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রেস ক্লাব, কমিউনিটি রেডিয়ো, পর্যটন করপোরেশন ও প্রবাসী কল্যাণের জন্য পরস্পরের মাঝে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্পর্কিত তথ্যাবলি সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল লাইব্রেরি, ডিজিটাল আর্কাইভ ইত্যাদি নির্মাণ করা।

পঞ্চমত, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা যেমন ভিশন ২০২১, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রভৃতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ডিজিটাল ধারণা এবং আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

প্রকল্পের যৌক্তিকতার প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড প্রচার এবং দেশের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল রাখার ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রচারের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে তথ্য প্রদান, অবহিত ও উদ্বুদ্ধকরণ।

এক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে যা টিভি, বেতার ব্যবহারের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের তথ্য অফিসের অন্যতম প্রচার কৌশল আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার হয়ে থাকে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের ৬৪টি জেলা তথ্য অফিস জনগণের প্রতিক্রিয়া যথাযথ মাধ্যমে সরকারকে অবহিত করছে এবং সরকার, গণমাধ্যমকর্মী ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসাবে কাজ করছে। তবে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে তথ্য অফিসগুলোর নিজস্ব কোনো ভবন না থাকায় এ অধিদপ্তরের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পটভূমিতে ৭টি বিভাগ এবং ১৯টি জেলা তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে ‘জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে।

জানা যায়, ৭টি বিভাগ ছাড়াও ১৯টি জেলাজুড়ে প্রথম পর্যায়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগীয় তথ্য অফিস ছাড়াও গোপালগঞ্জ, মাগুরা, বান্দরবান, নোয়াখালী, পঞ্চগড়, পাবনা, জয়পুরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, বাগেরহাট, কুমিল্লা, কক্সবাজার, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলা তথ্য অফিস।
প্রকল্পের ১ম পর্যায়ে ঢাকা ব্যতীত ৭টি বিভাগে সাততলা তথ্য কমপ্লেক্স এবং ১৯ জেলায় পাঁচতলা তথ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হবে।

তথ্য কমপ্লেক্সর মূল লক্ষ্য অফিস, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এখানে সিনেপ্লেক্স ও আইসিটি বিষয়াদি যেমন ইন্টারনেট, সাইবার ক্যাফে, ইনফরমেশন ডেস্ক, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের সংস্থান রাখা। আইসিটি বিষয়াদিসহ ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হলে তথ্য কমপ্লেক্স একটি তথ্যভান্ডার হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। অন্যদিকে সিনেপ্লেক্সে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুস্থধারার চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়ন সাধন হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, জাতির পিতার কর্ম ও জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখে সুস্থ ও বিনোদনসমৃদ্ধ প্রজন্ম এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে।

এদিকে তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিনেমা হল গড়তে ঋণ-প্রণোদনা ঘোষণায় গত দুই বছরে বন্ধ হওয়া সিনেমা হলগুলো খুলতে শুরু করেছে। ফলে বর্তমানে মাল্টিপ্লেক্সসহ মোট স্ক্রিনের সংখ্যা ১৭৯টি। ২০২৪ সালের মধ্যে এ সংখ্যা আড়াইশতে উন্নীত হবে। এর সঙ্গে তথ্য কমপ্লেক্সগুলো প্রস্তুত হলে বিশ^ায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুবসমাজ নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে, যা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ভিশন ২০৪১ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।