বিদেশি বিনিয়োগে থাইল্যান্ডের সাফল্য: বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?
- আপডেট সময় : ০২:৪৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
বৈশ্বিক বিনিয়োগের মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক সাফল্য বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ৩ হাজার ৩৭০টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ২৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেশি। এমন বিনিয়োগ প্রবাহের পেছনে দেশটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতিমালা সহজীকরণকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার মধ্যে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ২৩ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেশি। তবে এসব পরিসংখ্যান বিনিয়োগের আবেদন ও প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ নির্দেশ করে, বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া বিনিয়োগের পরিমাণ নয়। দেশটির অন্যতম কৌশল হলো সব শিল্পকে সমান সুবিধা না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বিনিয়োগের এই জোয়ার শুধু বছরজুড়ে নয়, বরং বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্যেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ উন্নয়ন সুবিধার জন্য জমা দেওয়া আবেদনের প্রস্তাবিত মূল্য ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কোটি বাথ, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ডিজিটাল খাত। ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ২৬০ কোটি বাথ। এছাড়া তথ্যকেন্দ্র বা ডাটা সেন্টার নির্মাণের জন্য ২৮টি আলাদা প্রকল্প থেকে ৫২ হাজার ১২০ কোটি বাথ বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে, যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে থাইল্যান্ডের ঝোঁক স্পষ্ট করে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোর মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ টানতে দেশটি পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ও পণ্য খালাসের জটিলতা কমিয়ে আনা এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বন্দর ও প্রধান পরিবহনপথের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক পর্যায়ে কোনো বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের জন্য বিলম্ব হলে তার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার একটি কঠোর কাঠামো গড়ে তোলার দাবিও উঠেছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, চুক্তি বাস্তবায়নের শতভাগ নিশ্চয়তা এবং যেকোনো অভিযোগ দ্রুত খতিয়ে দেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর থাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনায় বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন এবং শিল্পায়নের বিশাল সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। থাই বিনিয়োগকারীরা এই ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে তিনি জানান। অন্যদিকে, বাংলাদেশও থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ শিল্পায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইছে। তা সত্ত্বেও এগুলো দেখায়, ভবিষ্যৎ শিল্পের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড সক্রিয় রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরদার করতে সামুদ্রিক যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রেনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এই ধরনের আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের চিত্র বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
























