শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন
- আপডেট সময় : ০১:৫৪:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
- / 8
জুলাই মাসে সংঘটিত গণআন্দোলনের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেছিলেন নূর হোসেন নামের এক যুবক। তবে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, বাদীর আহত হওয়ার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি মামলার সমর্থনে জমা দেওয়া চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্রগুলোও জাল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাসহ মোট ৮৪ জন আসামিকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি বিষয়টি আদালতের নজরে এলে ম্যাজিস্ট্রেট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন এবং আগামী ১ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, নূর হোসেন দাবি করেছিলেন যে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকালে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনের সময় তিনি হামলার শিকার হন। তার ভাষ্যমতে, পিঠে ছয়টি, বাঁ হাঁটুর ওপরে দুটি এবং ডান হাঁটুর পাশে একটি গুলি লেগে তিনি আহত হন। এরপর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেলে আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মামলার এজাহারের সঙ্গে নূর হোসেন যে ব্যবস্থাপত্র ও কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, সেগুলো প্রতারণামূলক।
হাসপাতালের মূল রেজিস্টার যাচাই করে দেখা গেছে, ওই তারিখে নূর হোসেন নামে কোনো রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে আসেননি।
প্রতিবেদনে দুটি বড় অসংগতি শনাক্ত করা হয়েছে। প্রথমত, হাসপাতালের চিকিৎসকরা সাধারণত হাতে ব্যবস্থাপত্র লিখলেও নূর হোসেনের দাখিল করা নথিটি ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা। দ্বিতীয়ত, ব্যবস্থাপত্রে থাকা ক্যাশ মেমো এবং পেশেন্ট আইডি নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, সেগুলো যথাক্রমে আব্দুস সাত্তার ও জুয়েল নামের অন্য রোগীদের নামে বরাদ্দ ছিল। দ্বিতীয়ত, ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা ক্যাশ মেমো নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, সেটি আব্দুস সাত্তার নামের ৫৪ বছর বয়সী এক রোগীর নামে বরাদ্দ ছিল। একইভাবে চিকিৎসাপত্রে উল্লেখ করা পেশেন্ট আইডি নম্বরটি ছিল জুয়েল নামের ৩২ বছর বয়সী অন্য এক ব্যক্তির।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের যে আনুষ্ঠানিক গেজেট সরকার প্রকাশ করেছে, সেখানেও নূর হোসেনের কোনো তথ্য নেই। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট যে বাদী বাস্তবে আহত হননি, বরং অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।
মামলার অব্যাহতি পাওয়া উল্লেখযোগ্য আসামিদের তালিকায় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের ছাড়াও রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী ও মিলন হোসেন, এবং মহিলা লীগ নেত্রী ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মামলা দায়েরের পর অন্য মামলায় কারাগারে থাকা আট আসামিকে এই মামলায় গ্রেফতার বা শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল। তবে এ মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে সরাসরি কাউকে আটক করা হয়নি। মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও আদালতের এখতিয়ার রয়েছে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার।











