ঢাকা ১২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নাবলুসে ইউসুফ (আ.)-এর মাজার ঘিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে তিন মাসে ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে আদায় ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, কেশমে তীব্র বিস্ফোরণ শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানের কঠিন শর্ত মানল বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন উৎসবে বন্দুক হামলায় ঝরল ২৪ প্রাণ গাজীপুরে অস্থিরতা এড়াতে ২৫ পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন হামলা অব্যাহত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নতুন গ্যাসকূপের সন্ধান, মিলবে ২০ বছর ভারতে বিমানের টিকিটের ভাড়ায় আসছে নতুন নিয়ম

নাবলুসে ইউসুফ (আ.)-এর মাজার ঘিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান

  • আপডেট সময় : ১২:৫৭:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • / 0
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মাজার হিসেবে পরিচিত স্থাপনায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এ অভিযানের পাশাপাশি সেনারা শহরের আশপাশের আবাসিক বাড়িঘরেও তল্লাশি চালায়।

নাবলুসের পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে সেনারা মাজার এলাকা ও নিকটস্থ আসকার আল-বালাদ এলাকার একটি বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। নাবলুসের ঘটনাটি বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি।

একই দিনে শহরের দক্ষিণ দিকের বুরিন গ্রামে একটানা চতুর্থ দিনের মতো সামরিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই সময় সেনারা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে জিনিসপত্র তছনছ করেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্যমতে, নাবলুসের বাইরে বেথলেহেমের কয়েকটি এলাকা এবং তুলকারেম অঞ্চলের কাফর আবুশ ও কাফর সুর থেকে চার ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। তবে মাজার অভিযানের সময় কোনো আটকের খবর পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাজারটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় অবস্থিত। তাই এখানে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবেশ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনায় সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। মাজারটি কাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থাপনাটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব বহন করে। মুসলিম বিশ্বে এটি মাকাম ইউসুফ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ইহুদি ঐতিহ্যে এটি নবী জোসেফের সমাধিস্থল হিসেবে স্বীকৃত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মিসর থেকে তার দেহাবশেষ এনে এখানে সমাহিত করা হয়েছিল।

সামারিটান, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিম—সব সম্প্রদায়ের জন্যই স্থানটি ঐতিহাসিক গুরুত্বের দাবিদার। তবে সমাধিটির পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালের লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজের এক গবেষণায় উঠে আসে যে, বর্তমান স্থাপনাটি মূলত কয়েক শতাব্দী আগের ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন। গবেষকদের মতে, এখানে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর দেহাবশেষ থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও ধর্মীয় আবেগের সমন্বয় ঘটিয়ে স্থানটির মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। তবে এর প্রকৃত সমাধিস্থলগত পরিচয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত গবেষণায় লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজ দেখিয়েছেন, স্থাপনাটি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়া কোনো স্থাপনার পরিচয়কে এককভাবে প্রতিষ্ঠা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

মাজারটিকে ঘিরে বিরোধ নতুন নয়। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার শুরুর দিকে ২০০০ সালের অক্টোবরে এটি তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সে সময় নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সমঝোতা হলেও পরে সেখানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের কাছে পাঠানো ৭ অক্টোবর ২০০০ সালের এক চিঠিতে ইসরায়েলি প্রতিনিধি তৎকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের দিকেও সংঘর্ষের পর স্থাপনাটি সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ চালানো হয়। ২০০০ সালের সংঘর্ষ ও মাজারটির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইতিহাস। ইউসুফের মাজারকে ঘিরে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিরোধ নতুন নয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘে ইসরাইলের স্থায়ী প্রতিনিধির ৭ অক্টোবর ২০০০ তারিখের একটি চিঠিতে সে সময়কার ঘটনা ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল, যেখানে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়ভার নির্দিষ্ট ছিল। ২০০০ সালের সংঘাতের পর মাজারের নিরাপত্তা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তরের যে ব্যবস্থা হয়েছিল, তা জাতিসংঘের নথিতে সংরক্ষিত আছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

সম্প্রতি ১ অক্টোবর ২০২৬ সালে শত শত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সেনাবাহিনীর পাহারায় সেখানে ধর্মীয় আচার পালন করেন। ওই সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া ও স্নাইপার মোতায়েনের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ১৩ মে ২০২৬ তারিখেও একই ধরনের অভিযানের খবর প্রকাশ করে আনাদোলু এজেন্সি। তবে ৩০ অক্টোবরের সামরিক অভিযানটি ছিল ভিন্ন প্রকৃতির, কারণ এতে কোনো বসতি স্থাপনকারীর প্রবেশ নয়, বরং সেনাবাহিনী নিজেই সরাসরি সামরিক তৎপরতা চালিয়েছে। সে সময় আশপাশের বাড়িঘর থেকে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া, বাড়ির ছাদে স্নাইপার মোতায়েন এবং সামরিক যান দিয়ে এলাকাটি ঘিরে রাখার অভিযোগও ওঠে। তথ্যসূত্র: ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা, আলজাজিরা, আল-কুদস, নিয়ার ইস্টার্ন আর্কিওলজি, মিডল ইস্ট আই, জার্নাল অব হলি ল্যান্ড অ্যান্ড প্যালেস্টাইন স্টাডিজ, জাতিসংঘের নথি ও আনাদোলু এজেন্সি।

১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ ও ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেসামরিক সম্পদ ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশনেও সশস্ত্র সংঘাতের সময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলাধীন ভূখণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে বিবেচিত। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং ৫৩ অনুচ্ছেদে দখলদার শক্তির দ্বারা ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। এ ধরনের স্থাপনা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, নিরপেক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর প্রবেশাধিকার এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নাবলুসের এই পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পশ্চিম তীরের বিভিন্ন গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়মিত তল্লাশি ও অভিযান এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ৩০ অক্টোবরের ওয়াফার প্রতিবেদনে নাবলুসের পাশাপাশি বুরিন, বেথলেহেম ও তুলকারেম এলাকায় সমান্তরাল অভিযান পরিচালনার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। দুটি ঘটনাকে এক করে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি অস্পষ্ট হয়ে যাবে।

একটি ধর্মীয় স্থাপনায় সামরিক অভিযানের প্রভাব কেবল ওই সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা স্থানীয় শিক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচার পালনের অধিকারেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায়। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট তাই কেবল একটি স্থাপনার নয়, বরং পুরো সমাজব্যবস্থার নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

নাবলুসে ইউসুফ (আ.)-এর মাজার ঘিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান

আপডেট সময় : ১২:৫৭:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মাজার হিসেবে পরিচিত স্থাপনায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এ অভিযানের পাশাপাশি সেনারা শহরের আশপাশের আবাসিক বাড়িঘরেও তল্লাশি চালায়।

নাবলুসের পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে সেনারা মাজার এলাকা ও নিকটস্থ আসকার আল-বালাদ এলাকার একটি বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। নাবলুসের ঘটনাটি বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি।

একই দিনে শহরের দক্ষিণ দিকের বুরিন গ্রামে একটানা চতুর্থ দিনের মতো সামরিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই সময় সেনারা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে জিনিসপত্র তছনছ করেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্যমতে, নাবলুসের বাইরে বেথলেহেমের কয়েকটি এলাকা এবং তুলকারেম অঞ্চলের কাফর আবুশ ও কাফর সুর থেকে চার ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। তবে মাজার অভিযানের সময় কোনো আটকের খবর পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাজারটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় অবস্থিত। তাই এখানে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবেশ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনায় সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। মাজারটি কাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থাপনাটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব বহন করে। মুসলিম বিশ্বে এটি মাকাম ইউসুফ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ইহুদি ঐতিহ্যে এটি নবী জোসেফের সমাধিস্থল হিসেবে স্বীকৃত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মিসর থেকে তার দেহাবশেষ এনে এখানে সমাহিত করা হয়েছিল।

সামারিটান, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিম—সব সম্প্রদায়ের জন্যই স্থানটি ঐতিহাসিক গুরুত্বের দাবিদার। তবে সমাধিটির পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালের লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজের এক গবেষণায় উঠে আসে যে, বর্তমান স্থাপনাটি মূলত কয়েক শতাব্দী আগের ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন। গবেষকদের মতে, এখানে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর দেহাবশেষ থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও ধর্মীয় আবেগের সমন্বয় ঘটিয়ে স্থানটির মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। তবে এর প্রকৃত সমাধিস্থলগত পরিচয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত গবেষণায় লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজ দেখিয়েছেন, স্থাপনাটি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়া কোনো স্থাপনার পরিচয়কে এককভাবে প্রতিষ্ঠা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

মাজারটিকে ঘিরে বিরোধ নতুন নয়। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার শুরুর দিকে ২০০০ সালের অক্টোবরে এটি তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সে সময় নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সমঝোতা হলেও পরে সেখানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের কাছে পাঠানো ৭ অক্টোবর ২০০০ সালের এক চিঠিতে ইসরায়েলি প্রতিনিধি তৎকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের দিকেও সংঘর্ষের পর স্থাপনাটি সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ চালানো হয়। ২০০০ সালের সংঘর্ষ ও মাজারটির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইতিহাস। ইউসুফের মাজারকে ঘিরে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিরোধ নতুন নয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘে ইসরাইলের স্থায়ী প্রতিনিধির ৭ অক্টোবর ২০০০ তারিখের একটি চিঠিতে সে সময়কার ঘটনা ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল, যেখানে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়ভার নির্দিষ্ট ছিল। ২০০০ সালের সংঘাতের পর মাজারের নিরাপত্তা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তরের যে ব্যবস্থা হয়েছিল, তা জাতিসংঘের নথিতে সংরক্ষিত আছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

সম্প্রতি ১ অক্টোবর ২০২৬ সালে শত শত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সেনাবাহিনীর পাহারায় সেখানে ধর্মীয় আচার পালন করেন। ওই সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া ও স্নাইপার মোতায়েনের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ১৩ মে ২০২৬ তারিখেও একই ধরনের অভিযানের খবর প্রকাশ করে আনাদোলু এজেন্সি। তবে ৩০ অক্টোবরের সামরিক অভিযানটি ছিল ভিন্ন প্রকৃতির, কারণ এতে কোনো বসতি স্থাপনকারীর প্রবেশ নয়, বরং সেনাবাহিনী নিজেই সরাসরি সামরিক তৎপরতা চালিয়েছে। সে সময় আশপাশের বাড়িঘর থেকে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া, বাড়ির ছাদে স্নাইপার মোতায়েন এবং সামরিক যান দিয়ে এলাকাটি ঘিরে রাখার অভিযোগও ওঠে। তথ্যসূত্র: ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা, আলজাজিরা, আল-কুদস, নিয়ার ইস্টার্ন আর্কিওলজি, মিডল ইস্ট আই, জার্নাল অব হলি ল্যান্ড অ্যান্ড প্যালেস্টাইন স্টাডিজ, জাতিসংঘের নথি ও আনাদোলু এজেন্সি।

১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ ও ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেসামরিক সম্পদ ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশনেও সশস্ত্র সংঘাতের সময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলাধীন ভূখণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে বিবেচিত। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং ৫৩ অনুচ্ছেদে দখলদার শক্তির দ্বারা ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। এ ধরনের স্থাপনা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, নিরপেক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর প্রবেশাধিকার এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নাবলুসের এই পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পশ্চিম তীরের বিভিন্ন গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়মিত তল্লাশি ও অভিযান এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ৩০ অক্টোবরের ওয়াফার প্রতিবেদনে নাবলুসের পাশাপাশি বুরিন, বেথলেহেম ও তুলকারেম এলাকায় সমান্তরাল অভিযান পরিচালনার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। দুটি ঘটনাকে এক করে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি অস্পষ্ট হয়ে যাবে।

একটি ধর্মীয় স্থাপনায় সামরিক অভিযানের প্রভাব কেবল ওই সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা স্থানীয় শিক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচার পালনের অধিকারেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায়। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট তাই কেবল একটি স্থাপনার নয়, বরং পুরো সমাজব্যবস্থার নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।