ফ্রান্সে কেন ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা? নেপথ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ
- আপডেট সময় : ০৩:১৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
- / 3
শ্রেণিকক্ষে থাকার বয়সে আজ ফ্রান্সের রাজপথে সোচ্চার কিশোর-কিশোরীরা। শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন এখন আর ছোট কোনো সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি বড় জাতীয় বিতর্কে রূপ নিয়েছে। মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাস্তায় নেমে এসেছেন শিক্ষক, অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্সের শিক্ষাঙ্গন। ৬ অক্টোবর দেশটির মোট ৩ হাজার ৭০০টি লিসের মধ্যে প্রায় ৮৯১টিতে পাঠদান পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বিক্ষোভের ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা স্পষ্ট হয় সরকারি পরিসংখ্যান থেকে। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবারের এই আন্দোলনে সারা দেশে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন শহরের মিছিলে অংশ নিয়েছেন ৮৬ হাজার বিক্ষোভকারী। এছাড়া রাজধানী প্যারিসের মিছিলে আরও ২০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত ছিল। আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ১০০ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যার বড় একটি অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যেখানে ১ হাজার ৪৮৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার দৈনন্দিন নানা সংকট। শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষক সংকট এবং শ্রেণিকক্ষে বিকল্প শিক্ষকের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে ভবনগুলোর বেহাল দশা—যেমন পানি পড়া, টয়লেটের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ইঁদুরের উপদ্রব তাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত পড়ার চাপ ও দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তি। বিশেষ করে ‘Parcoursup’ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে তারা মনে করছে। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের অভিযোগ তুলে বলছে, সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত নয়। কিছু শিক্ষার্থী স্কুল ভবনের পানি পড়া, অতিরিক্ত গরম, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট এমনকি ইঁদুরের উপদ্রবের কথাও জানিয়েছে। ক্লাসের পাশাপাশি বাড়িতে পড়াশোনা, দীর্ঘ যাতায়াত এবং পরীক্ষার ফল নিয়ে চাপ অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। ‘Parcoursup’ নামের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থাও তাদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, তাদের ভবিষ্যৎ ক্রমেই নম্বর ও প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কোথাও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, আবার কোথাও মৌলিক অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে, শুধু তাদের কথা শোনা নয়, বাস্তব পরিবর্তনও দেখতে চায় তারা।
আন্দোলন চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর মতে, অন্তত ২১৫ জন কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী এতে আহত হয়েছেন। পুলিশের আহতের সংখ্যা সাত শতাধিক। উত্তর ফ্রান্সের লঁসে এক ১৫ বছর বয়সী কিশোর পুলিশের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণে হাত ও বাহুর একাংশ হারিয়েছে। যদিও সরকার দাবি করেছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে এই কঠোর অবস্থান নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ও অভিভাবকরা প্রশ্ন তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের হিসাবে ৭০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে উত্তর ফ্রান্সের লঁসে।
বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে সরকার নানা পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি, স্কুলের সময়সূচি পর্যালোচনা, দুপুরের খাবার বিরতি বাড়ানো ও জরাজীর্ণ ভবন মেরামতের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রথম প্রস্তাবনা আসার কথা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণের বোঝা ও ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাপে থাকা সরকারের পক্ষে শিক্ষা খাতে নতুন অর্থ বরাদ্দ করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। যদিও রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, এটি সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলন নয়, তবে তরুণদের এই বিক্ষোভ দীর্ঘদিনের সামাজিক অসন্তোষ ও বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন, নেপালের ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলন কিংবা স্পেনের ২০২৬ সালের আবাসন সংকট—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে, তরুণদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উপেক্ষা করলে তা কীভাবে জাতীয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। ফ্রান্সের এই আন্দোলনের পরিণতি এখন বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে। সরকার অবশ্য বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের প্রতিক্রিয়া ছিল পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কিছু জায়গায় বিক্ষোভ সহিংসতায় পরিণত হওয়ায় পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

























