ঢাকা ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শাহজালাল বিমানবন্দরেই দায়িত্ব পালন করছেন ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খান সিরাজগঞ্জে মাদক মামলায় দুই যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তিন সিটির উন্নয়নসহ ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন লটারি বাতিল করে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ রসায়নে নোবেল পেলেন জাপান ও ফ্রান্সের দুই বিজ্ঞানী দেশের চারটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে কমছে যাত্রী সংখ্যা জেট ফুয়েলের দাম বাড়ল, লিটারে বৃদ্ধি ১৭ টাকা বড়াইগ্রামের সানাউল্লাহ বাবু নিহতের ১৬ বছর: বিচারের অপেক্ষায় পরিবার দিল্লিতে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর উচ্চপর্যায়ের সিরিজ বৈঠক রাজাপুরে যুবদল নেতাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাল ৫৪০ টন মিথানল

  • আপডেট সময় : ১০:২৯:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • / 2
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশভাগের অনেক আগে ব্যবহৃত ডিব্রুগড়-ঢাকা নৌপথটি দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভারতের পূর্ব আসামের চা-নগরী ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা হয়ে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র নদীবন্দরটি ১৯৫৬ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই নৌপথে ছেদ ঘটায়। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। ফলে আসামের পণ্য কলকাতায় পৌঁছাতে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।

বগীবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের মিথানলবাহী এই জাহাজটির যাত্রার উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। ডিব্রুগড়ের স্মৃতিচারণ করে সনোয়াল জানান, স্থানীয় প্রবীণরা একসময় ব্রহ্মপুত্র নদে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে অভ্যস্ত ছিলেন। ৭০ বছর ধরে এই রুটটি বন্ধ থাকায় সেই শব্দ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, নদী আমাদের কখনো ব্যর্থ করেনি, শুধু দীর্ঘ সময় ধরে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিল। এখন ডিব্রুগড় থেকে পুনরায় জাহাজ যাত্রা শুরু করায় নদীটি তার হৃত গৌরব ফিরে পাচ্ছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর কেবল সীমান্তবর্তী এলাকা নয়, বরং এটি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। এই যাত্রাকে ব্রহ্মপুত্র নদকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডর হিসেবে ব্যবহারের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বগীবিল ও ধুবড়িতে নতুন করে কাস্টমস ও অভিবাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এই পণ্য পরিবহন সম্ভব হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ডিব্রুগড় একসময় ভারতের ব্যস্ততম নদীবন্দরগুলোর একটি ছিল। ১৮৫৬ সাল থেকে কলকাতা ও ডিব্রুগড়ের মধ্যে সরকারি স্টিমার চলাচল করত। ১৯১৩ সাল নাগাদ নিয়মিত স্টিমারে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন হতো। তবে ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে নদীর গঠন বদলে যায় এবং ১৯৫৪ সালে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়। এরপর ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি পুরোপুরি কার্যক্রম হারায়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আন্তঃসীমান্ত নৌবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল সই হলেও নিয়মিত পণ্য পরিবহনের জন্য আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় জলপথ-২ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে নিয়মিত বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালে পান্ডুতে টাটা স্টিলের বার্জ এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ প্রমোদতরি এই পথ ব্যবহার করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালটি চালু করা হয়। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ‘ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে’ চলাচল শুরু করে। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় নদীর তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

সর্বানন্দ সনোয়ালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলের জলপথ উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যার মধ্যে পান্ডু বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও জাহাজ মেরামতের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। সনোয়াল জোর দিয়ে বলেন, সড়কপথের পরিবর্তে জলপথ ব্যবহার করলে জ্বালানি সাশ্রয় হয় এবং মহাসড়কে ট্রাকের চাপ কমে। বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভারত কাজ করছে। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাল ৫৪০ টন মিথানল

আপডেট সময় : ১০:২৯:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

দেশভাগের অনেক আগে ব্যবহৃত ডিব্রুগড়-ঢাকা নৌপথটি দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভারতের পূর্ব আসামের চা-নগরী ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা হয়ে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র নদীবন্দরটি ১৯৫৬ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই নৌপথে ছেদ ঘটায়। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। ফলে আসামের পণ্য কলকাতায় পৌঁছাতে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।

বগীবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের মিথানলবাহী এই জাহাজটির যাত্রার উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। ডিব্রুগড়ের স্মৃতিচারণ করে সনোয়াল জানান, স্থানীয় প্রবীণরা একসময় ব্রহ্মপুত্র নদে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে অভ্যস্ত ছিলেন। ৭০ বছর ধরে এই রুটটি বন্ধ থাকায় সেই শব্দ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, নদী আমাদের কখনো ব্যর্থ করেনি, শুধু দীর্ঘ সময় ধরে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিল। এখন ডিব্রুগড় থেকে পুনরায় জাহাজ যাত্রা শুরু করায় নদীটি তার হৃত গৌরব ফিরে পাচ্ছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর কেবল সীমান্তবর্তী এলাকা নয়, বরং এটি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। এই যাত্রাকে ব্রহ্মপুত্র নদকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডর হিসেবে ব্যবহারের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বগীবিল ও ধুবড়িতে নতুন করে কাস্টমস ও অভিবাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এই পণ্য পরিবহন সম্ভব হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ডিব্রুগড় একসময় ভারতের ব্যস্ততম নদীবন্দরগুলোর একটি ছিল। ১৮৫৬ সাল থেকে কলকাতা ও ডিব্রুগড়ের মধ্যে সরকারি স্টিমার চলাচল করত। ১৯১৩ সাল নাগাদ নিয়মিত স্টিমারে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন হতো। তবে ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে নদীর গঠন বদলে যায় এবং ১৯৫৪ সালে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়। এরপর ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি পুরোপুরি কার্যক্রম হারায়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আন্তঃসীমান্ত নৌবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল সই হলেও নিয়মিত পণ্য পরিবহনের জন্য আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় জলপথ-২ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে নিয়মিত বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালে পান্ডুতে টাটা স্টিলের বার্জ এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ প্রমোদতরি এই পথ ব্যবহার করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালটি চালু করা হয়। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ‘ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে’ চলাচল শুরু করে। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় নদীর তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

সর্বানন্দ সনোয়ালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলের জলপথ উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যার মধ্যে পান্ডু বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও জাহাজ মেরামতের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। সনোয়াল জোর দিয়ে বলেন, সড়কপথের পরিবর্তে জলপথ ব্যবহার করলে জ্বালানি সাশ্রয় হয় এবং মহাসড়কে ট্রাকের চাপ কমে। বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভারত কাজ করছে। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি।