মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার সেনা ও রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
- আপডেট সময় : ০৮:৫৫:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
ইরান যুদ্ধের অষ্টম মাসে পদার্পণের সাথে সাথে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক শক্তির পরিধি আরও বিস্তৃত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বর্তমানে ওই অঞ্চলে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সাথে নতুন করে আরও ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্যকে ওই এলাকায় মোতায়েন করা হচ্ছে। এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ফলে চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আরো ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্য ওই অঞ্চলে যাওয়ার পথে রয়েছেন।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রোববার সান দিয়েগো নৌঘাঁটি থেকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট রণতরি বহরটি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এর ঠিক পরের দিনই দুই হাজারেরও বেশি সদস্য নিয়ে যাত্রা করে মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ৯ থেকে ১০ হাজার সেনাসদস্য নভেম্বরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পৌঁছাবেন। তখন ওই অঞ্চলে মোট তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী সামরিক দল অবস্থান করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি বিকল্প হাতে রাখা। হোয়াইট হাউসের ভাষ্যমতে, কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি যাই হোক না কেন, সামরিক সক্ষমতা অটুট রাখাই তাদের মূল কৌশল। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রয়োজনে যেকোনো হামলার নির্দেশ বাস্তবায়নে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
নতুন এই মোতায়েনের মধ্যে সর্বাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য আগে থেকেই অবস্থান করছেন, যার সাথে যুক্ত হতে যাওয়া অতিরিক্ত বাহিনী এই শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। পেন্টাগন সূত্র জানিয়েছে, কোনো ধরনের সমঝোতা হলেও বর্তমানে মোতায়েন করা এই সামরিক সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। আল জাজিরার ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন মোতায়েনের মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। মোতায়েন করা বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াক্স), এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির অংশ হিসেবে বর্তমানে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটিসহ মোট ১৯টি স্থাপনা ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৫৮ সালের জুলাই মাসে লেবানন সংকটের সময় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েনের পর এবারই সবচেয়ে বড় পরিসরে সামরিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১২০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটির অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে ওয়াশিংটন। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বড় উদ্যোগ বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন। এসব বিমানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে কার্গো বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারও পাঠানো হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার টেক্সাসের ডেন্টনে এক অনুষ্ঠানে বর্তমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে তাদের কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইরানের সাথে কোনো চুক্তি হলে তারা তা আদৌ মেনে চলবে কি না, কারণ ইরানের চুক্তি মানার ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
কূটনৈতিক ফ্রন্টে, ইরান গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লেবানন ও ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়া বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ এসব বিষয় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সাথেও সম্পৃক্ত।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হলে তার দেশ সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। যদিও তিনি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেন যে, নিউইয়র্কে তারা যুদ্ধ নয়, বরং শান্তির বার্তা নিয়ে গিয়েছিল। এদিকে যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় ওয়াশিংটন ইরানের রেল ও গাড়ি শিল্পের মতো খাতের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যার লক্ষ্য তেহরানের রাজস্ব আয়ের উৎসগুলোকে আরও সংকুচিত করা।
টাইম ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমাবর্ষণের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। যদিও হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সামরিক শক্তির এই ব্যাপক প্রদর্শন আসলে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বাণিজ্যিক অবরোধের জটিল এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চললেও কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি এখনো অর্জিত হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ও রণতরির উপস্থিতি তাই সংঘাতের অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।






















