সৌদিতে হুথিদের হামলা: সক্রিয় হবে কি পাকিস্তান-তুরস্কের সঙ্গে করা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি?
- আপডেট সময় : ০৮:৫৬:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 8
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মোখা বন্দর দখলের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালির প্রধান নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে চালানো এই হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৭০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কার্যকর করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে সচেষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় দায়িত্ব দেশগুলোর নিজেদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন সহায়তা সীমিত হওয়ার বাস্তবতায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে সৌদি আরব নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোর দিকে ঝুঁকেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের আগস্ট মাসে এই চুক্তিতে তুরস্ক যুক্ত হলে এর নামকরণ করা হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। রিয়াদে এই তিন দেশের জন্য একটি যৌথ সচিবালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে প্রাথমিক তিন বছরের জন্য সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে পাকিস্তান।
তবে চুক্তির সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও সামরিক সহায়তার পরিধি নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো ঠিক কোন পর্যায়ে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যাবে, তার কোনো পূর্বনির্ধারিত সীমা নেই। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অবশ্য চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা হলে অথবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে এই চুক্তি কার্যকর হবে।
খাজা আসিফের ভাষ্যমতে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। তবে চুক্তি সক্রিয় হলে পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত খোলাসা করেননি তিনি। অন্যদিকে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত মাসে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই চুক্তি ন্যাটোর আদলে কাজ করবে। অর্থাৎ আক্রান্ত দেশকে সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ধরনও নির্ধারণ করতে হবে।
ন্যাটোর চতুর্থ ও পঞ্চম অনুচ্ছেদের মতো এখানেও সদস্যদেশগুলোর পরামর্শ ও তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালে সিরিয়া কর্তৃক তুরস্কের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর আঙ্কারা ন্যাটোর সহায়তা চেয়েছিল, কিন্তু তারা সরাসরি যুদ্ধের বদলে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে নিয়েছিল। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও সৌদি আরব অনুরূপ পথ অবলম্বন করতে পারে, যেখানে রিয়াদই নির্ধারণ করবে তাদের গোয়েন্দা, অস্ত্র বা সামরিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে কি না।
বর্তমানে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি কার্যকরের কোনো আবেদন করেনি। এর পরিবর্তে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক চ্যানেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। পাকিস্তান প্রকাশ্যে ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
সামরিক দিক থেকে সৌদি আরবে আগে থেকেই পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে এবং সেখানে কয়েক হাজার পাকিস্তানি সেনা কর্মরত। তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আপাতত খুবই কম। সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে পাকিস্তান এমন কোনো বড় সংঘাতে জড়াতে সতর্ক রয়েছে, যা দেশটির নিজস্ব অর্থনীতি ও সাম্প্রদায়িক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, মক্কা চুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে ইরানকে কূটনৈতিক চাপে রাখা, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তায় বহুজাতিক নৌজোট গঠনের দিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। যতক্ষণ না যৌথ প্রতিক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ও নিয়ম তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কই সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সৌদি আরবের কয়েকটি শহরেও হামলা চালিয়েছে হুথিরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সৌদি আরবের জ্বালানি, বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার পাশাপাশি ইরান ও হুথিদের সামুদ্রিক অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অঞ্চলটির প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছুদিন ধরে বলে আসছে, নিজেদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের বড় দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোকেই নিতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সেই অবস্থানের বাস্তব প্রভাবও দেখা গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পঞ্চম অনুচ্ছেদে পারস্পরিক সহায়তার কথা বলা হলেও সহায়তার ধরন নির্ধারণের ক্ষমতা প্রত্যেক দেশের হাতে থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মক্কা চুক্তিতেও এমন পথই অনুসরণ করা হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় নিজেদের অঙ্গীকারের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।


























