ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদির জন্য বড় হুমকি যেভাবে হয়ে উঠল হুথি গোষ্ঠী

  • আপডেট সময় : ০২:০০:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • / 0
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী বর্তমানে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, ইরানের প্রভাব এবং আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংকটই এই উত্তেজনার মূল কারণ।

সম্প্রতি সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে তীব্র হামলার পর বেশ কয়েকটি শহরে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, তারা অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। এ সময় খামিস মুশাইতে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় এবং আবহা, তাইফ, নামাস ও জাজান শহরেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালুর প্রস্তুতির মাঝেই নতুন এই হামলার ঘটনা ঘটে। হুথিরা সরাসরি এই বিমানবন্দরকে তাদের পরবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। মূলত ইয়েমেনের ভেতরে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া এবং সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতাই হুথিদের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের অন্যতম কারণ। যদিও ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির ফলে দীর্ঘ সময় সীমান্ত সংঘাত অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যত বড় ধরনের সীমান্ত সংঘাত বন্ধ রেখেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করাই হুথিদের মূল লক্ষ্য। তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চায়। এর পাশাপাশি দেশটির ভবিষ্যৎ সরকারে প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা বন্দরগুলোর ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ রাজনৈতিক ছাড় আদায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এছাড়া লোহিত সাগরের কৌশলগত নৌপথ বাব আল-মান্দাবের সন্নিকটে নিজেদের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তারা আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে মরিয়া।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরান হুথিদের অস্ত্রপ্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে আসছে, যা তাদের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে হুথিরা কেবল ইরানের নির্দেশ পালনকারী একটি গোষ্ঠী নয়। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের স্বতন্ত্র ভিত্তি রয়েছে। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দখলের নিজস্ব এজেন্ডা তাদের রয়েছে।

সৌদির বিমানবন্দর, শোধনাগার, পাইপলাইন এবং জ্বালানি রপ্তানি টার্মিনালগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে হুথিরা রিয়াদের নিরাপত্তা ব্যয় বাড়িয়ে তোলা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করছে। প্রচলিত সৌদি সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া সম্ভব না হলেও, গেরিলা কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তারা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করা বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সব হামলা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রতিটি আক্রমণই বেসামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় আঘাত হানছে। এদিকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এই লোহিত সাগরের নৌপথও অস্থিরতার মুখে পড়ে, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় আকাশচুম্বী হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দরগুলোর বিধিনিষেধ নিয়ে একটি টেকসই সমঝোতা প্রয়োজন। তবে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদি হুথিদের এই হামলা অব্যাহত থাকে, তবে সৌদি আরব পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত একটি বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ছড়িয়ে পড়লে অন্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দিনশেষে এই সংঘাতের পরিণতি সামরিক জয় নাকি দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সমাধান হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর।

নিউজটি শেয়ার করুন

সৌদির জন্য বড় হুমকি যেভাবে হয়ে উঠল হুথি গোষ্ঠী

আপডেট সময় : ০২:০০:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী বর্তমানে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, ইরানের প্রভাব এবং আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংকটই এই উত্তেজনার মূল কারণ।

সম্প্রতি সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে তীব্র হামলার পর বেশ কয়েকটি শহরে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, তারা অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। এ সময় খামিস মুশাইতে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় এবং আবহা, তাইফ, নামাস ও জাজান শহরেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালুর প্রস্তুতির মাঝেই নতুন এই হামলার ঘটনা ঘটে। হুথিরা সরাসরি এই বিমানবন্দরকে তাদের পরবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। মূলত ইয়েমেনের ভেতরে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া এবং সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতাই হুথিদের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের অন্যতম কারণ। যদিও ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির ফলে দীর্ঘ সময় সীমান্ত সংঘাত অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যত বড় ধরনের সীমান্ত সংঘাত বন্ধ রেখেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করাই হুথিদের মূল লক্ষ্য। তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চায়। এর পাশাপাশি দেশটির ভবিষ্যৎ সরকারে প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা বন্দরগুলোর ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ রাজনৈতিক ছাড় আদায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এছাড়া লোহিত সাগরের কৌশলগত নৌপথ বাব আল-মান্দাবের সন্নিকটে নিজেদের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তারা আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে মরিয়া।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরান হুথিদের অস্ত্রপ্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে আসছে, যা তাদের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে হুথিরা কেবল ইরানের নির্দেশ পালনকারী একটি গোষ্ঠী নয়। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের স্বতন্ত্র ভিত্তি রয়েছে। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দখলের নিজস্ব এজেন্ডা তাদের রয়েছে।

সৌদির বিমানবন্দর, শোধনাগার, পাইপলাইন এবং জ্বালানি রপ্তানি টার্মিনালগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে হুথিরা রিয়াদের নিরাপত্তা ব্যয় বাড়িয়ে তোলা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করছে। প্রচলিত সৌদি সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া সম্ভব না হলেও, গেরিলা কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তারা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করা বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সব হামলা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রতিটি আক্রমণই বেসামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় আঘাত হানছে। এদিকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এই লোহিত সাগরের নৌপথও অস্থিরতার মুখে পড়ে, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় আকাশচুম্বী হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দরগুলোর বিধিনিষেধ নিয়ে একটি টেকসই সমঝোতা প্রয়োজন। তবে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদি হুথিদের এই হামলা অব্যাহত থাকে, তবে সৌদি আরব পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত একটি বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ছড়িয়ে পড়লে অন্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দিনশেষে এই সংঘাতের পরিণতি সামরিক জয় নাকি দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সমাধান হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর।