ঢাকা ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জাপানে ভারী বৃষ্টিতে ৫ জনের মৃত্যু পরমাণু অস্ত্র ঠেকানো নয়, তেলের দাম কম রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য : জেডি ভ্যান্স ১০ কোটি ভিউ পার করলো ইমরান-পড়শীর ‘জনম জনম’ যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ার আগে নতুন প্রতিরোধ হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা সংস্থার গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ : চীন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নয়, যুদ্ধে তেলের দাম কমানোই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি তানজিদের বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী মুরাদনগরে দুই দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশ ও কসোভোর মধ্যে এফটিএ নিয়ে আলোচনা

মৃন্ময়ীর প্রশ্নপত্র

  • আপডেট সময় : ১০:০১:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫
  • / 1114
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঊষা উঠি উঠি করছে৷ সূর্যের সহস্র শিখা শ্যামল পৃথিবীতে আগুন ঢেলেছে। সকালের সেই ঝুরঝুরি রোদ এসে পড়েছে খোলা জানালার পাটাতনে।
পাখিরা তাদের কিচিরমিচির কলরবে নতুন এক প্রভাতকে বরণ করে নিচ্ছে। অভিজাত উপায়ে স্বাগত জানাচ্ছে গভীর রজনী পার করে আসা নব্য এক দিবসকে। চারপাশের এই প্রকৃতি জীবন্ত। সর্বত্র প্রাণ যেন তরঙ্গিত হয়ে উঠছে।

“সখী, ভাবনা কাহারে বলে?
সখী, যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বলো দিবস-রজনী
ভালোবাসা ভালোবাসা…”

কংক্রিটের শহর, পিচঢালা পথ। ইটপাথরের শহরে এক টুকরো প্রাচীনত্ব শুষে নিয়ে অলস দাঁড়িয়ে আছে মৃন্ময়ীর পান্থপথের ভাড়া বাড়িটি। ঘাস-গুল্মে ছাওয়া এই বাড়িতে সময়ে সময়ে ভেসে বেড়ায় মায়া মায়া সুবাস। গ্রীষ্মের তীব্র রোদও এখানে ছড়ায় আশ্চর্য কাব্যিক ঢঙে৷

পান্থপথের অতি পুরনো এই বাসভবনের চতুর্থ তলায় মৃদু রবে বেজে চলেছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চরণগুলি। যেন মৃদু রবে এই সঙ্গীত না বাজালে স্বয়ং রবীঠাকুর-ই নারাজ হয়ে যাবেন। তার মন ভাঙ্গানো হয়ে যাবে দায়। মৃন্ময়ীর প্রতিটি প্রভাতের সূচনা হয় এই হৃদয়দ্রাবক বাজনা দিয়েই। প্রতি প্রভাতেই এই পুরনো বাসভবনের চতুর্থ তলায় ছোটখাটো এক গ্রামাফোনে বেজে চলে রবীন্দ্রসঙ্গীত। গ্রামাফোনটি নিয়ে মৃন্ময়ীর আবেগের কোনো সীমা নেই। যেন এটা তার আত্নার-ই এক অংশ। গ্রামাফোন বেজে চলা মানে তার আত্না গুনগুনিয়ে ওঠা। বড়ই শখের তার এই গ্রামাফোনটি।

একটি মিষ্টি ঝিরঝিরে হাওয়ায় জানালার পর্দাটা ওড়াউড়ি করছে। ঘরের মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে গ্রীষ্মের রোদ। বেতের ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে পত্রিকায় মুখ গুঁজে বসে আছে মৃন্ময়ী। মাথায় তার টগবগ করছে সদ্য-পড়া বই, বুদ্ধদেব গুহের “বাবলি”।

বেদনা-মাধুর্যে গড়া তার শরীর। প্রতিমার মতো আঁকা ভুরু। শান্ত সৌম্য চেহারা। পড়নে তার রক্তপদ্ম রঙের শাড়ি। প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্য্য যেন পরিশ্রুত হয়ে তার নিভৃত নির্জন শরীরে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তাকে দেখাচ্ছে কাল্পনিক প্রেমিকার মতো স্নেহময়। নিউজপেপার পড়াটাকে অভিজাত এক শখ বলে বোধ করে মৃন্ময়ী। যে শখ, কালের বিবর্তনে মানব জীবন থেকে ফুরিয়ে গেছে। একইসাথে নিউজপেপার পড়াটা মৃন্ময়ীর কাছে নস্টালজিক এক ব্যাপারস্যাপার। ছেলেবেলায় সে তার বাবাকে খুব ভোরে উঠে প্রথমেই পত্রিকা ছড়িয়ে উবু হয়ে বসে থাকতে দেখেছে। বেশ গম্ভীর ও থমথমে মুখ নিয়ে পত্রিকা পাঠ করতেন তার বাবা। তার বাবার এই অভ্যাসকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরেছে মৃন্ময়ী। তবে পত্রিকা পাঠকালীন সময়ে তার মুখটাও তার বাবার মুখের মতো গম্ভীর ও থমথমে হয়ে যায় কিনা তা অবশ্যি ওর জানা নেই।

পাশেই বেতের ট্রেতে করে রাখা আছে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। দুধ চা। চা রাখা আছে টিয়ারঙা এক কাপে। টিয়ারঙা কাপটিতে সবুজ রঙের জংলি আঁকাবুকি থাকায় মনে হচ্ছে কাপটি যেন প্রকৃতি থেকেই উঠে আসা। চায়ের কাপ হাঁতড়ে শেষবারের মতো চুমুক দিলো মৃন্ময়ী। সেই হাতের ছন্দে যেন রচিত হলো মন্ত্র। এ যেন সবকিছুর এক আশ্চর্য মণিকাঞ্চন সংযোগ।

পত্রিকা পাঠ শেষে সে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো আটটা বেজে গেছে। রুম থেকে বেরোতেই এক ভদ্রলোকের মুখোমুখি হলো মৃন্ময়ী। ভদ্রলোক মেঘস্বরে বলে উঠলেন,

“আমাদের টাকা-পয়সা একটু কম আছে, কিন্তু আমাদের সুখের কি কোনো অভাব আছে?”

হাতে একটি বিছানা ঝাড়ু নিয়ে ভদ্রলোকটিকে ডাইনিং টেবিলের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে। সম্পর্কে তিনি মৃন্ময়ীর বাবা হন। তার এরূপ পদচারণের উদ্দেশ্য হচ্ছে- মাছি মারা। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। যে কাজটিকে অচিরেই পৃথিবীর দুঃসাধ্য কাজগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় বলে মৃন্ময়ী মনে করে। ওর এখনো মনে আছে, মেট্রিক পরীক্ষায় জেনারেল ম্যাথ পরীক্ষার আগের রাতে সে সবমিলিয়ে মোট ছ’টা মশা মারতে সক্ষম হয়েছিল। সংখ্যার দিক থেকে যা ছিল তার জীবনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মশা মারা। সে মাঝেমধ্যেই মশা মারতে পারে, কিন্তু মাছি মারার কাজটা তার ধাতে নেই। মৃন্ময়ী মনে করে, মাছি মারার জন্য মানুষের ফোকাস করতে পারার ক্ষমতা হতে হয় প্রখর। যে ক্ষমতা মৃন্ময়ীর নেই। মৃন্ময়ী কোনোকিছুতেই ফোকাস করতে পারে না। এইসব জটিল বিষয়ে সে নিতান্তই অভাজন। তবে মাঝেমধ্যে
ফোকাস না করার কাজটা সে করে ইচ্ছাকৃতভাবেই। যেমন- চোখে দেখবেনা জেনেও চশমাটা খুলে সে রাস্তায় হাঁটা-চলাফেরা করে। এতে সে সামনের সবকিছুই দেখে অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতা যে কতখানি মজার তা সে শুভ্রের কাছ থেকে জেনেছে। ডাক্তার বলেছেন শুভ্র খুব শীঘ্রই অন্ধ হয়ে যাবে। শুভ্রের অন্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করছে মৃন্ময়ী৷ চলার পথে যেন তখন শুদ্ধতম এই পুরুষের মৃন্ময়ীকে প্রয়োজন হয়। মৃন্ময়ীকে ছুঁয়ে হাঁটার প্রয়োজন হয়।

যা হোক।

প্রথম প্রথম তার বাবাকে এভাবে ঝাড়ু হাতে রুমে-রুমে অভিযান চালাতে দেখে বাসার সবাই-ই বেশ সন্দেহাতীত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন তারা বিষয়টিতে অনেকটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। এবং মৃন্ময়ীর মনে হয়, মাছি মারার কাজটা ওর বাবা বেশ আগ্রহ সহকারেই করে।

বাবার দিকে তাকিয়ে আকর্ণ হাসলো মৃন্ময়ী। ত্রিকালদর্শী বিচারকের মতো উত্তর দিলো,

“না বাবা। আমাদের মতো সুখী কেউ নেই।”

এবং মাঝেমধ্যেই ডাইনিং টেবিলের চারপাশের মেঝেতে সেই মাছিগুলোর মৃতদেহও দেখতে পাওয়া যায়।

মৃন্ময়ীর দেখা এই পৃথিবীতে সবথেকে চমৎকার মানুষটি হচ্ছে তার বাবা। এতো উদাসীন, এতো আলাভোলা, এতো অগোছালো, এতো মায়ামায়া চেহারা মৃন্ময়ী ইহজীবনে কোথাও কখনো দেখেনি। যার
মনে কোনো সন্তাপ নেই, কোন দুশ্চিন্তা নেই। কেবলমাত্র এই মানুষটিকে দেখলেই বিনা কারনেই করুণায়, স্নেহে, আদরে অন্তরের গহনতল পর্যন্ত আলোড়িত হয় মৃন্ময়ীর। পুরো পৃথিবীতে কেবলমাত্র এই মানুষটিকেই তার বারবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করেছে। কিন্তু আদতে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মৃন্ময়ীর আবেগের বহিঃপ্রকাশ সর্বদা মৌন। খুব প্রয়োজন ব্যাতিরেকে সে তার আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না।

মৃন্ময়ীর মা ইতিমধ্যেই চুলায় রান্না বসিয়েছেন। রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। সমস্ত মমতা ঢেলে তিনি রান্না করছেন। মৃন্ময়ী তার মা’কে একবার জিজ্ঞেস করেছিল,

“মা সবার জীবনেই তো একটা স্বপ্ন থাকে। তোমার জীবনের স্বপ্ন কি ছিল?”

মৃন্ময়ীর মা সেদিন টলটলে চোখে একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,

“ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল আমি বড় হয়ে সংসার করব। আমার খুব শখ ছিল আমার একটা সোনার সংসার হবে।”

মায়ের এই শখ শুনে মৃন্ময়ী সেদিন বেশ হকচকিয়ে গেছিল। একটা মানুষের স্বপ্ন এতো সাধারণ অথচ চমৎকার হতে পারে নাকি? কি আশ্চর্য! সেই যুগে অথবা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন কোনো নারীকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে, যে এরূপ শখ হৃদয়ের গহীনে লালন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে? মৃন্ময়ীর জানা নেই।

মৃন্ময়ী তার মায়ের সেই টলটলে চোখের চাহনি আজও ভুলে যেতে অপারগ। ওর বরাবরই মনে হয়ে এসেছে, তার মায়ের চোখদুটোতে কাব্য আছে। কবিরা এমন চোখ নিয়েই যুগ যুগ ধরে কবিতা লিখে এসেছেন।

সেদিন মায়ের বলা কথাগুলোর ভাবার্থ ধরতে ব্যর্থ হলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে মৃন্ময়ী এখন বুঝতে পারে, কতটা আবেগ মিশিয়ে, কতটা যত্ন, কতটা আদর, কতটা ভালোবাসা নিয়ে মা তাদের সবার জন্য রাঁধেন। যেন তার মায়ের অন্তরটা ভালোবাসার একটা ঝরণা। সেই রান্না খেয়ে মৃন্ময়ী কখনো বলতে পারেনি, “মা লবণ কম হয়েছে। মা ভাতটা সিদ্ধ হয়নি। মাংসটা আরেকটু কসানোর দরকার ছিল মা।”

নাস্তা শেষ করে নিজ কক্ষে ফিরে এলো মৃন্ময়ী৷ সরাসরি বারান্দায় পদার্পন করলো সে। বারান্দায় কতক গাছ আছে ওর- সাদা বাগানবিলাস, রঙ্গন, ভৃঙ্গরাজ, পাতাবাহার, গন্ধরাজ, কাঁটামুকুট, নয়নতারা, গাঁদা। মৃন্ময়ীর প্রবল বিশ্বাস গাছগুলো তাকে শুনতে পায়। গাছগুলো যেমন তার আনন্দে দুলে ওঠে, তেমনি তার দুঃখে দুঃখিত হয়। গাছগুলোর সঙ্গে তার এক অদ্ভুত হৃদ্যতা জমে গেছে। এই গাছে আছে প্রাণশক্তি। আশ্চর্য সেই প্রাণশক্তি। এ বিশ্বাস তার এসেছে ছফাসাহেবের (আহমদ ছফা) থেকে। তিনি ‘বৃক্ষ’ বিষয়ক অদ্ভুত সব কথাবার্তা লিখে গেছেন। তিনি লিখেছিলেন,

“একজন পুরুষ একজন নারীর সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক নির্মাণ করে, সেভাবে একজন মানুষ একটি বৃক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কোন মানুষ? যিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে পারেন, বৃক্ষেরও একটি জীবন্ত সত্তা রয়েছে, অন্য যে-কোন প্রাণীর মতো।”

বৃক্ষবিষয়ক তার লেখা উপন্যাসটি পড়ে মৃন্ময়ীর সেবার বেগুনচাষ করার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে বেগুনচাষ করার ইচ্ছাটা পাগলামির পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার। বেগুনচাষকে কেউ যে এভাবে আকর্ষনীয় করে ফেলতে পারবে তা সে কস্মিনকালেও ভাবেনি! ছফাসাহেবের লেখা পড়ে মনে হয়েছিল যেন বেগুনচাষের চেয়ে মধুর কোনো কাজ এই বিশ্বব্রাহ্মান্ডে আর কিছু নেই।

এক আঁজলা জল তুলে গাছগুলোতে খুব যত্ন নিয়ে ঢেলে দিতে থাকলো মৃন্ময়ী। আনন্দের অঙ্কুর তার স্নায়ুকেন্দ্রে৷ আজ তার বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি। অনার্স দ্বিতীয়বর্ষে ইংরেজি বিভাগে পড়াশুনা করছে মৃন্ময়ী। এবার সে বাইশের চৌকঠ পেরোবে।

বাংলা সাহিত্যের প্রতি প্রবল টান থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ায় মাঝেমধ্যেই তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সেবার মৃন্ময়ীর বন্ধু অয়ন যশোর থেকে ওদের সব বন্ধুবান্ধবদের জন্য দু’কেজি মিষ্টি নিয়ে এসেছিল। অতি সুস্বাদু সেই মিষ্টি। একথা মৃন্ময়ীব অয়নকে জানাতেই পাশ থেকে ওর আরেক বন্ধু রুদ্র বলে উঠলো,

“তোর দ্বিতীয় প্রেমিকের দেশের বাড়ির মিষ্টি। ভালো তো হবেই।”

হকচকিয়ে গেলো মৃন্ময়ী। জিজ্ঞেস করলো,

“আমার দ্বিতীয় প্রেমিক আবার কে?”

“কে আবার? মধুসূদন!”

আশ্চর্য হয়ে গেলো মৃন্ময়ী। এরা মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ওর দ্বিতীয় প্রেমিক বানিয়ে দিয়েছে! কি সর্বনাশ!

একটু থেমে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো মৃন্ময়ী,

“আর প্রথম প্রেমিকটা কে?”

“রবীন্দ্রনাথ…”

কথা বলার খেই হারিয়ে ফেলেছিলো সেদিন মৃন্ময়ী।

তাছাড়া আরও কিছু গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। যেমন- তার ছোটবেলার খুব ভালো বান্ধবী চিত্রার বাবা তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। চিত্রাদের বাসায় গেলেই আংকেলের বিমর্ষ মুখ দেখতে পায় মৃন্ময়ী। যেন ইংরেজিতে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব অপদার্থের মতো একটা কাজ করে ফেলেছে সে।

রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর। আকাশে চনচনে রোদ উঠছে।ভ্যাপসা গরমে টিকে থাকা ভার। রোদের তাপে প্রকৃতি ঝলসে যাচ্ছে। দুটো কাক অলস বসে আছে বৈদ্যুতিক তারে। ঝিম ধরে বসে দেখছে ব্যস্ত শহর। থেকে থেকে কর্কশ কন্ঠে ডেকে সচকিত করে তুলছে চারপাশ।

একটা আরামদায়ক আলস্য ঘরের ভেতর, বইয়ের তাকে। টেবিলের কাছের জানালাটা খুলে এক মনে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙ্গুল চালিয়ে যাচ্ছে মৃন্ময়ী। আজকের দিনে প্রথমবারের মতো ইলেক্ট্রিক ডিভাইস হাতে নিয়েছে সে। উদ্দেশ্য- একটা এসাইনমেন্ট লিখে শেষ করা। এসাইনমেন্টটা কি নিয়ে লিখবে তা অবশ্যি সে জানেনা। অথচ সে লিখছে। কেননা জমা দেওয়ার তারিখ ঘনিয়ে আসছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একের পর এক অক্ষরমালা।

লিখতে লিখতে হঠাৎ থেমে যায় মৃন্ময়ী। কর্মচঞ্চল মস্তিষ্কে পলক ফেলার ব্যবধানে টের পায় একটি পরিবর্তন, “কেন?”

মৃন্ময়ী মূর্তির মতো স্থির হয়ে যায় নিমেষে। তার প্রাণশক্তি থিতিয়ে আসছে। ওই রোগটা আবার ফিরে আসছে। টের পায় মৃন্ময়ী। সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

ক্রমশ এক কুহেলিকার মধ্যে নিক্ষেপ হচ্ছে সে। সেখানে কেবল প্রশ্ন আর প্রশ্ন। কেন এই অমূলক কাজ করা? কিসের লোভে এতো পরিশ্রম?

জীবনে অর্থ, সম্মান, প্রেম সবকিছু পেলেও তা কী অর্থপূর্ণ? এসব কিছু পাওয়ার পরও কী মন আবার নতুন কিছু পাওয়ার জন্য তৎপর হয় না? এ রকম অতি অপরিহার্য কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েই গৌতম বুদ্ধ ঘর ছেড়েছিলেন এক অলঙ্ঘনীয় সত্যের আশায়।

নিহিলিজম রোগে আক্রান্ত মৃন্ময়ী।

নিহিলিজম হলো এমন এক দর্শন, যেখানে মনে করা হয় এই জীবনের কোন অর্থ নেই। সিসিফাসের পাহাড়ে পাথর তোলার মতো অর্থহীন জীবনে আমরা দায়িত্বের অদৃশ্য পাথর বয়ে বেড়াচ্ছি। নিহিলিজমের দ্বিতীয় কথা হলো জীবন দুঃখময়, অহেতুক, অমূলক। প্রতিদিনের একই কাজ; সম্মান অর্জনের সংগ্রাম, অর্থপ্রাপ্তি, পারিবারিক কলহ, মানসিক যন্ত্রণা, খাওয়া-দাওয়া, যৌনতা, এসবে আমাদের প্রাণ ক্লান্ত হয়ে যায়। মনের মৃত্যু ঘটে। কবির ভাষায় –

“শরীর রয়েছে তবু মরে গেছে আমাদের মন
হেমন্ত আসেনি মাঠে হলুদ পাতায় ভরে হৃদয়ের বন।”

মৃন্ময়ীর মুখে দুটো মুক্তাবিন্দুসম ঘাম। চোখে অসহায় আর্তনাদ। পায়ের আঙ্গুলে মৃদু লাল আভা। সে বিরবির করে বলে উঠলো,

“এই দ্যাখো খুলে ফেলেছি সব মোহ। এই দ্যাখো বিদায় দিয়েছি সব বাসনা।”

নির্জনতার ভেতর দিয়ে শরশর শব্দ আসে। হাওয়ার মতো শনশন আওয়াজ তোলে বহু। অজস্র প্রশ্ন একসঙ্গে ধেঁয়ে আসে মৃন্ময়ীর কাছে। সেই প্রশ্নের তোপে এলোমেলো হয়ে যায় মৃন্ময়ী। হারিয়ে ফেলে সে নিজেকে।

জীবনানন্দ দাশ এখন কবিতা লিখছেন,

“ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে শুয়ে থাকব-ধীরে- পউষের রাতে-
কোনদিন জাগব না জেনে-
কোনদিন জাগব না আমি- কোনদিন আর।”

সমাপ্ত…….

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মৃন্ময়ীর প্রশ্নপত্র

আপডেট সময় : ১০:০১:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫

ঊষা উঠি উঠি করছে৷ সূর্যের সহস্র শিখা শ্যামল পৃথিবীতে আগুন ঢেলেছে। সকালের সেই ঝুরঝুরি রোদ এসে পড়েছে খোলা জানালার পাটাতনে।
পাখিরা তাদের কিচিরমিচির কলরবে নতুন এক প্রভাতকে বরণ করে নিচ্ছে। অভিজাত উপায়ে স্বাগত জানাচ্ছে গভীর রজনী পার করে আসা নব্য এক দিবসকে। চারপাশের এই প্রকৃতি জীবন্ত। সর্বত্র প্রাণ যেন তরঙ্গিত হয়ে উঠছে।

“সখী, ভাবনা কাহারে বলে?
সখী, যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বলো দিবস-রজনী
ভালোবাসা ভালোবাসা…”

কংক্রিটের শহর, পিচঢালা পথ। ইটপাথরের শহরে এক টুকরো প্রাচীনত্ব শুষে নিয়ে অলস দাঁড়িয়ে আছে মৃন্ময়ীর পান্থপথের ভাড়া বাড়িটি। ঘাস-গুল্মে ছাওয়া এই বাড়িতে সময়ে সময়ে ভেসে বেড়ায় মায়া মায়া সুবাস। গ্রীষ্মের তীব্র রোদও এখানে ছড়ায় আশ্চর্য কাব্যিক ঢঙে৷

পান্থপথের অতি পুরনো এই বাসভবনের চতুর্থ তলায় মৃদু রবে বেজে চলেছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চরণগুলি। যেন মৃদু রবে এই সঙ্গীত না বাজালে স্বয়ং রবীঠাকুর-ই নারাজ হয়ে যাবেন। তার মন ভাঙ্গানো হয়ে যাবে দায়। মৃন্ময়ীর প্রতিটি প্রভাতের সূচনা হয় এই হৃদয়দ্রাবক বাজনা দিয়েই। প্রতি প্রভাতেই এই পুরনো বাসভবনের চতুর্থ তলায় ছোটখাটো এক গ্রামাফোনে বেজে চলে রবীন্দ্রসঙ্গীত। গ্রামাফোনটি নিয়ে মৃন্ময়ীর আবেগের কোনো সীমা নেই। যেন এটা তার আত্নার-ই এক অংশ। গ্রামাফোন বেজে চলা মানে তার আত্না গুনগুনিয়ে ওঠা। বড়ই শখের তার এই গ্রামাফোনটি।

একটি মিষ্টি ঝিরঝিরে হাওয়ায় জানালার পর্দাটা ওড়াউড়ি করছে। ঘরের মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে গ্রীষ্মের রোদ। বেতের ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে পত্রিকায় মুখ গুঁজে বসে আছে মৃন্ময়ী। মাথায় তার টগবগ করছে সদ্য-পড়া বই, বুদ্ধদেব গুহের “বাবলি”।

বেদনা-মাধুর্যে গড়া তার শরীর। প্রতিমার মতো আঁকা ভুরু। শান্ত সৌম্য চেহারা। পড়নে তার রক্তপদ্ম রঙের শাড়ি। প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্য্য যেন পরিশ্রুত হয়ে তার নিভৃত নির্জন শরীরে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তাকে দেখাচ্ছে কাল্পনিক প্রেমিকার মতো স্নেহময়। নিউজপেপার পড়াটাকে অভিজাত এক শখ বলে বোধ করে মৃন্ময়ী। যে শখ, কালের বিবর্তনে মানব জীবন থেকে ফুরিয়ে গেছে। একইসাথে নিউজপেপার পড়াটা মৃন্ময়ীর কাছে নস্টালজিক এক ব্যাপারস্যাপার। ছেলেবেলায় সে তার বাবাকে খুব ভোরে উঠে প্রথমেই পত্রিকা ছড়িয়ে উবু হয়ে বসে থাকতে দেখেছে। বেশ গম্ভীর ও থমথমে মুখ নিয়ে পত্রিকা পাঠ করতেন তার বাবা। তার বাবার এই অভ্যাসকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরেছে মৃন্ময়ী। তবে পত্রিকা পাঠকালীন সময়ে তার মুখটাও তার বাবার মুখের মতো গম্ভীর ও থমথমে হয়ে যায় কিনা তা অবশ্যি ওর জানা নেই।

পাশেই বেতের ট্রেতে করে রাখা আছে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। দুধ চা। চা রাখা আছে টিয়ারঙা এক কাপে। টিয়ারঙা কাপটিতে সবুজ রঙের জংলি আঁকাবুকি থাকায় মনে হচ্ছে কাপটি যেন প্রকৃতি থেকেই উঠে আসা। চায়ের কাপ হাঁতড়ে শেষবারের মতো চুমুক দিলো মৃন্ময়ী। সেই হাতের ছন্দে যেন রচিত হলো মন্ত্র। এ যেন সবকিছুর এক আশ্চর্য মণিকাঞ্চন সংযোগ।

পত্রিকা পাঠ শেষে সে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো আটটা বেজে গেছে। রুম থেকে বেরোতেই এক ভদ্রলোকের মুখোমুখি হলো মৃন্ময়ী। ভদ্রলোক মেঘস্বরে বলে উঠলেন,

“আমাদের টাকা-পয়সা একটু কম আছে, কিন্তু আমাদের সুখের কি কোনো অভাব আছে?”

হাতে একটি বিছানা ঝাড়ু নিয়ে ভদ্রলোকটিকে ডাইনিং টেবিলের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে। সম্পর্কে তিনি মৃন্ময়ীর বাবা হন। তার এরূপ পদচারণের উদ্দেশ্য হচ্ছে- মাছি মারা। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। যে কাজটিকে অচিরেই পৃথিবীর দুঃসাধ্য কাজগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় বলে মৃন্ময়ী মনে করে। ওর এখনো মনে আছে, মেট্রিক পরীক্ষায় জেনারেল ম্যাথ পরীক্ষার আগের রাতে সে সবমিলিয়ে মোট ছ’টা মশা মারতে সক্ষম হয়েছিল। সংখ্যার দিক থেকে যা ছিল তার জীবনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মশা মারা। সে মাঝেমধ্যেই মশা মারতে পারে, কিন্তু মাছি মারার কাজটা তার ধাতে নেই। মৃন্ময়ী মনে করে, মাছি মারার জন্য মানুষের ফোকাস করতে পারার ক্ষমতা হতে হয় প্রখর। যে ক্ষমতা মৃন্ময়ীর নেই। মৃন্ময়ী কোনোকিছুতেই ফোকাস করতে পারে না। এইসব জটিল বিষয়ে সে নিতান্তই অভাজন। তবে মাঝেমধ্যে
ফোকাস না করার কাজটা সে করে ইচ্ছাকৃতভাবেই। যেমন- চোখে দেখবেনা জেনেও চশমাটা খুলে সে রাস্তায় হাঁটা-চলাফেরা করে। এতে সে সামনের সবকিছুই দেখে অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতা যে কতখানি মজার তা সে শুভ্রের কাছ থেকে জেনেছে। ডাক্তার বলেছেন শুভ্র খুব শীঘ্রই অন্ধ হয়ে যাবে। শুভ্রের অন্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করছে মৃন্ময়ী৷ চলার পথে যেন তখন শুদ্ধতম এই পুরুষের মৃন্ময়ীকে প্রয়োজন হয়। মৃন্ময়ীকে ছুঁয়ে হাঁটার প্রয়োজন হয়।

যা হোক।

প্রথম প্রথম তার বাবাকে এভাবে ঝাড়ু হাতে রুমে-রুমে অভিযান চালাতে দেখে বাসার সবাই-ই বেশ সন্দেহাতীত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন তারা বিষয়টিতে অনেকটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। এবং মৃন্ময়ীর মনে হয়, মাছি মারার কাজটা ওর বাবা বেশ আগ্রহ সহকারেই করে।

বাবার দিকে তাকিয়ে আকর্ণ হাসলো মৃন্ময়ী। ত্রিকালদর্শী বিচারকের মতো উত্তর দিলো,

“না বাবা। আমাদের মতো সুখী কেউ নেই।”

এবং মাঝেমধ্যেই ডাইনিং টেবিলের চারপাশের মেঝেতে সেই মাছিগুলোর মৃতদেহও দেখতে পাওয়া যায়।

মৃন্ময়ীর দেখা এই পৃথিবীতে সবথেকে চমৎকার মানুষটি হচ্ছে তার বাবা। এতো উদাসীন, এতো আলাভোলা, এতো অগোছালো, এতো মায়ামায়া চেহারা মৃন্ময়ী ইহজীবনে কোথাও কখনো দেখেনি। যার
মনে কোনো সন্তাপ নেই, কোন দুশ্চিন্তা নেই। কেবলমাত্র এই মানুষটিকে দেখলেই বিনা কারনেই করুণায়, স্নেহে, আদরে অন্তরের গহনতল পর্যন্ত আলোড়িত হয় মৃন্ময়ীর। পুরো পৃথিবীতে কেবলমাত্র এই মানুষটিকেই তার বারবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করেছে। কিন্তু আদতে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মৃন্ময়ীর আবেগের বহিঃপ্রকাশ সর্বদা মৌন। খুব প্রয়োজন ব্যাতিরেকে সে তার আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না।

মৃন্ময়ীর মা ইতিমধ্যেই চুলায় রান্না বসিয়েছেন। রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। সমস্ত মমতা ঢেলে তিনি রান্না করছেন। মৃন্ময়ী তার মা’কে একবার জিজ্ঞেস করেছিল,

“মা সবার জীবনেই তো একটা স্বপ্ন থাকে। তোমার জীবনের স্বপ্ন কি ছিল?”

মৃন্ময়ীর মা সেদিন টলটলে চোখে একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,

“ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল আমি বড় হয়ে সংসার করব। আমার খুব শখ ছিল আমার একটা সোনার সংসার হবে।”

মায়ের এই শখ শুনে মৃন্ময়ী সেদিন বেশ হকচকিয়ে গেছিল। একটা মানুষের স্বপ্ন এতো সাধারণ অথচ চমৎকার হতে পারে নাকি? কি আশ্চর্য! সেই যুগে অথবা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন কোনো নারীকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে, যে এরূপ শখ হৃদয়ের গহীনে লালন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে? মৃন্ময়ীর জানা নেই।

মৃন্ময়ী তার মায়ের সেই টলটলে চোখের চাহনি আজও ভুলে যেতে অপারগ। ওর বরাবরই মনে হয়ে এসেছে, তার মায়ের চোখদুটোতে কাব্য আছে। কবিরা এমন চোখ নিয়েই যুগ যুগ ধরে কবিতা লিখে এসেছেন।

সেদিন মায়ের বলা কথাগুলোর ভাবার্থ ধরতে ব্যর্থ হলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে মৃন্ময়ী এখন বুঝতে পারে, কতটা আবেগ মিশিয়ে, কতটা যত্ন, কতটা আদর, কতটা ভালোবাসা নিয়ে মা তাদের সবার জন্য রাঁধেন। যেন তার মায়ের অন্তরটা ভালোবাসার একটা ঝরণা। সেই রান্না খেয়ে মৃন্ময়ী কখনো বলতে পারেনি, “মা লবণ কম হয়েছে। মা ভাতটা সিদ্ধ হয়নি। মাংসটা আরেকটু কসানোর দরকার ছিল মা।”

নাস্তা শেষ করে নিজ কক্ষে ফিরে এলো মৃন্ময়ী৷ সরাসরি বারান্দায় পদার্পন করলো সে। বারান্দায় কতক গাছ আছে ওর- সাদা বাগানবিলাস, রঙ্গন, ভৃঙ্গরাজ, পাতাবাহার, গন্ধরাজ, কাঁটামুকুট, নয়নতারা, গাঁদা। মৃন্ময়ীর প্রবল বিশ্বাস গাছগুলো তাকে শুনতে পায়। গাছগুলো যেমন তার আনন্দে দুলে ওঠে, তেমনি তার দুঃখে দুঃখিত হয়। গাছগুলোর সঙ্গে তার এক অদ্ভুত হৃদ্যতা জমে গেছে। এই গাছে আছে প্রাণশক্তি। আশ্চর্য সেই প্রাণশক্তি। এ বিশ্বাস তার এসেছে ছফাসাহেবের (আহমদ ছফা) থেকে। তিনি ‘বৃক্ষ’ বিষয়ক অদ্ভুত সব কথাবার্তা লিখে গেছেন। তিনি লিখেছিলেন,

“একজন পুরুষ একজন নারীর সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক নির্মাণ করে, সেভাবে একজন মানুষ একটি বৃক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কোন মানুষ? যিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে পারেন, বৃক্ষেরও একটি জীবন্ত সত্তা রয়েছে, অন্য যে-কোন প্রাণীর মতো।”

বৃক্ষবিষয়ক তার লেখা উপন্যাসটি পড়ে মৃন্ময়ীর সেবার বেগুনচাষ করার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে বেগুনচাষ করার ইচ্ছাটা পাগলামির পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার। বেগুনচাষকে কেউ যে এভাবে আকর্ষনীয় করে ফেলতে পারবে তা সে কস্মিনকালেও ভাবেনি! ছফাসাহেবের লেখা পড়ে মনে হয়েছিল যেন বেগুনচাষের চেয়ে মধুর কোনো কাজ এই বিশ্বব্রাহ্মান্ডে আর কিছু নেই।

এক আঁজলা জল তুলে গাছগুলোতে খুব যত্ন নিয়ে ঢেলে দিতে থাকলো মৃন্ময়ী। আনন্দের অঙ্কুর তার স্নায়ুকেন্দ্রে৷ আজ তার বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি। অনার্স দ্বিতীয়বর্ষে ইংরেজি বিভাগে পড়াশুনা করছে মৃন্ময়ী। এবার সে বাইশের চৌকঠ পেরোবে।

বাংলা সাহিত্যের প্রতি প্রবল টান থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ায় মাঝেমধ্যেই তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সেবার মৃন্ময়ীর বন্ধু অয়ন যশোর থেকে ওদের সব বন্ধুবান্ধবদের জন্য দু’কেজি মিষ্টি নিয়ে এসেছিল। অতি সুস্বাদু সেই মিষ্টি। একথা মৃন্ময়ীব অয়নকে জানাতেই পাশ থেকে ওর আরেক বন্ধু রুদ্র বলে উঠলো,

“তোর দ্বিতীয় প্রেমিকের দেশের বাড়ির মিষ্টি। ভালো তো হবেই।”

হকচকিয়ে গেলো মৃন্ময়ী। জিজ্ঞেস করলো,

“আমার দ্বিতীয় প্রেমিক আবার কে?”

“কে আবার? মধুসূদন!”

আশ্চর্য হয়ে গেলো মৃন্ময়ী। এরা মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ওর দ্বিতীয় প্রেমিক বানিয়ে দিয়েছে! কি সর্বনাশ!

একটু থেমে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো মৃন্ময়ী,

“আর প্রথম প্রেমিকটা কে?”

“রবীন্দ্রনাথ…”

কথা বলার খেই হারিয়ে ফেলেছিলো সেদিন মৃন্ময়ী।

তাছাড়া আরও কিছু গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। যেমন- তার ছোটবেলার খুব ভালো বান্ধবী চিত্রার বাবা তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। চিত্রাদের বাসায় গেলেই আংকেলের বিমর্ষ মুখ দেখতে পায় মৃন্ময়ী। যেন ইংরেজিতে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব অপদার্থের মতো একটা কাজ করে ফেলেছে সে।

রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর। আকাশে চনচনে রোদ উঠছে।ভ্যাপসা গরমে টিকে থাকা ভার। রোদের তাপে প্রকৃতি ঝলসে যাচ্ছে। দুটো কাক অলস বসে আছে বৈদ্যুতিক তারে। ঝিম ধরে বসে দেখছে ব্যস্ত শহর। থেকে থেকে কর্কশ কন্ঠে ডেকে সচকিত করে তুলছে চারপাশ।

একটা আরামদায়ক আলস্য ঘরের ভেতর, বইয়ের তাকে। টেবিলের কাছের জানালাটা খুলে এক মনে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙ্গুল চালিয়ে যাচ্ছে মৃন্ময়ী। আজকের দিনে প্রথমবারের মতো ইলেক্ট্রিক ডিভাইস হাতে নিয়েছে সে। উদ্দেশ্য- একটা এসাইনমেন্ট লিখে শেষ করা। এসাইনমেন্টটা কি নিয়ে লিখবে তা অবশ্যি সে জানেনা। অথচ সে লিখছে। কেননা জমা দেওয়ার তারিখ ঘনিয়ে আসছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একের পর এক অক্ষরমালা।

লিখতে লিখতে হঠাৎ থেমে যায় মৃন্ময়ী। কর্মচঞ্চল মস্তিষ্কে পলক ফেলার ব্যবধানে টের পায় একটি পরিবর্তন, “কেন?”

মৃন্ময়ী মূর্তির মতো স্থির হয়ে যায় নিমেষে। তার প্রাণশক্তি থিতিয়ে আসছে। ওই রোগটা আবার ফিরে আসছে। টের পায় মৃন্ময়ী। সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

ক্রমশ এক কুহেলিকার মধ্যে নিক্ষেপ হচ্ছে সে। সেখানে কেবল প্রশ্ন আর প্রশ্ন। কেন এই অমূলক কাজ করা? কিসের লোভে এতো পরিশ্রম?

জীবনে অর্থ, সম্মান, প্রেম সবকিছু পেলেও তা কী অর্থপূর্ণ? এসব কিছু পাওয়ার পরও কী মন আবার নতুন কিছু পাওয়ার জন্য তৎপর হয় না? এ রকম অতি অপরিহার্য কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েই গৌতম বুদ্ধ ঘর ছেড়েছিলেন এক অলঙ্ঘনীয় সত্যের আশায়।

নিহিলিজম রোগে আক্রান্ত মৃন্ময়ী।

নিহিলিজম হলো এমন এক দর্শন, যেখানে মনে করা হয় এই জীবনের কোন অর্থ নেই। সিসিফাসের পাহাড়ে পাথর তোলার মতো অর্থহীন জীবনে আমরা দায়িত্বের অদৃশ্য পাথর বয়ে বেড়াচ্ছি। নিহিলিজমের দ্বিতীয় কথা হলো জীবন দুঃখময়, অহেতুক, অমূলক। প্রতিদিনের একই কাজ; সম্মান অর্জনের সংগ্রাম, অর্থপ্রাপ্তি, পারিবারিক কলহ, মানসিক যন্ত্রণা, খাওয়া-দাওয়া, যৌনতা, এসবে আমাদের প্রাণ ক্লান্ত হয়ে যায়। মনের মৃত্যু ঘটে। কবির ভাষায় –

“শরীর রয়েছে তবু মরে গেছে আমাদের মন
হেমন্ত আসেনি মাঠে হলুদ পাতায় ভরে হৃদয়ের বন।”

মৃন্ময়ীর মুখে দুটো মুক্তাবিন্দুসম ঘাম। চোখে অসহায় আর্তনাদ। পায়ের আঙ্গুলে মৃদু লাল আভা। সে বিরবির করে বলে উঠলো,

“এই দ্যাখো খুলে ফেলেছি সব মোহ। এই দ্যাখো বিদায় দিয়েছি সব বাসনা।”

নির্জনতার ভেতর দিয়ে শরশর শব্দ আসে। হাওয়ার মতো শনশন আওয়াজ তোলে বহু। অজস্র প্রশ্ন একসঙ্গে ধেঁয়ে আসে মৃন্ময়ীর কাছে। সেই প্রশ্নের তোপে এলোমেলো হয়ে যায় মৃন্ময়ী। হারিয়ে ফেলে সে নিজেকে।

জীবনানন্দ দাশ এখন কবিতা লিখছেন,

“ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে শুয়ে থাকব-ধীরে- পউষের রাতে-
কোনদিন জাগব না জেনে-
কোনদিন জাগব না আমি- কোনদিন আর।”

সমাপ্ত…….