প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ: তালিকায় নাম না থাকায় বাদ আড়াই
- আপডেট সময় : ০৫:৪৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 14
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় সারা দেশে প্রার্থীরা তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই বা ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার পর নিয়োগের তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নাম বাদ পড়ায় এই জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মের দাবি অনুযায়ী, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তবে অন্যান্য সূত্রের তথ্যমতে, এই সংখ্যা দুই হাজার দুইশ জনেরও বেশি। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ২ হাজার ২০০-এর বেশি।
প্রাথমিক অনুসন্ধান ও প্রশাসনিক বিভিন্ন তথ্য বলছে, মূলত চারটি নির্দিষ্ট কারণে প্রার্থীদের নাম নিয়োগের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন, ডোপ টেস্টে অকৃতকার্য হওয়া, স্বাস্থ্য সনদ না থাকা এবং শিক্ষা সনদে গরমিল বা অসংগতি। বিশেষ করে যাচাই-বাছাইয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসা প্রার্থীর সংখ্যাই তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়োগপত্র সংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তি নিয়ে সতর্ক করেছে। মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ১ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে তাদের বিষয়গুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়া হবে।
নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ইতিমধ্যে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। তারা প্রতিটি বাদ পড়া প্রার্থীর নথি পুনরায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, কোনো প্রার্থীর তথ্যে ভুল বা ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ এবং প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা করার দাবি তুলেছেন তারা। প্রার্থীদের অভিযোগ, কোনো দপ্তর বা কর্মকর্তার গাফিলতি বা প্রশাসনিক ভুলে যদি কেউ বাদ পড়ে থাকেন, তবে সেই ভুলের দায়ভার যেন তাদের ওপর না পড়ে। তারা ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিষয়টি সুরাহা এবং পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। প্রার্থীরা বলছেন, তারা অনিয়মকারী বা অযোগ্য কাউকে নিয়োগের পক্ষে নন, তবে যাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত।
চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১টি জেলায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে, যেখানে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এর আগে, ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে এই জটিলতা সামনে আসে। বিশেষ করে চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, সাতক্ষীরা, ঝালকাঠি, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জে অনেকের নাম নিয়োগ তালিকায় পাওয়া যায়নি। এসব জেলায় অন্তত ৩৫১ জন প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি বলে জানা গেছে, যদিও এটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। এসব জেলার তথ্য যোগ করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫১। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়।
নিয়োগবঞ্চিতদের এই ক্ষোভ এখন রাজপথেও গড়িয়েছে। খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। খুলনায় সুপারিশপ্রাপ্ত ২৭৫ জনের মধ্যে ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দিলেও ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন, আর ৬৯ জনই বাদ পড়েছেন। একইভাবে সুনামগঞ্জে ১২০ জন, মৌলভীবাজারে ৬৭ জন এবং যশোরে ১০৬ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে খবর পাওয়া গেছে। নাটোরে প্রতিবন্ধী প্রার্থীসহ ৩৪ জনও এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, সাতক্ষীরায় ২, ঝালকাঠিতে ১২, লক্ষ্মীপুরে ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, পাবনায় ৩৫, রাজবাড়ীতে ১৫, ফরিদপুরে ১২, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০, কুষ্টিয়ায় ১৬ এবং মানিকগঞ্জে ২২ জন। সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারে ৩৪৭ সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে ৬৭ জন এবং যশোরে ২৯০ জনের মধ্যে ১০৬ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর নির্বাচিত শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের এবং ৪ অক্টোবর থেকে পদায়নের আদেশ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত যারা নিয়োগপত্র পাবেন না, তাদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে পুনরায় পরীক্ষা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পর ঠিক কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে এত বড় সংখ্যক প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হলো, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, যা প্রার্থীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের যোগদান ও পদায়নের জন্য ১ অক্টোবরকে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

























