হাভানার পাশে চীন, ট্রাম্পের ‘কিউবা ভেঙে পড়বে’ মন্তব্যের পর
- আপডেট সময় : ১১:৪৪:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 16
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে কিউবার বর্তমান সরকার অচিরেই ভেঙে পড়বে এবং দেশটিতে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প কিউবাকে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্র’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় ‘বিদেশি প্রতিপক্ষদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিউবার পাশে থাকার আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করেছে চীন। সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। চীন ও কিউবার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি জানান, কিউবার জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশটির নিজস্ব পরিস্থিতির উপযোগী উন্নয়নের পথ অনুসরণে বেইজিং সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ও মার্কিন চাপ
কিউবা বর্তমানে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ও খাদ্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং নিয়মিতভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থায়ন ব্যবস্থা, জ্বালানি আমদানি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কিউবার আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৬ শতাংশ এসেছিল ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে, তবে চলতি বছর এই সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এবং মেক্সিকোর ওপর মার্কিন চাপের মুখে কিউবার জ্বালানি নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জারি করা এক নির্বাহী আদেশে হাভানার নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য ‘অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ওই আদেশে কিউবা কর্তৃক রাশিয়া, চীন, ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে, কিউবায় গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা এই নীতি অনুসরণ করছে। অন্যদিকে, কিউবায় তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়ায় মেক্সিকোও সরবরাহ স্থগিত করেছে। কিউবার ভাষ্য, দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহে অন্য দেশগুলোকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নেয়া বিধিনিষেধ কার্যত একটি ‘জ্বালানি অবরোধ’।
হাভানার প্রতিক্রিয়া ও বেইজিংয়ের অবস্থান
কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের এই জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। হাভানার ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর ‘বহুমাত্রিক’ অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে এসব মার্কিন পদক্ষেপকে নৌ অবরোধের সমতুল্য এবং ‘যুদ্ধের কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিউবার জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীন বড় ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বেইজিং অর্থায়ন ও সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কিউবার দৈনিক গড় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে এলেও, প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২১ দশমিক ৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়াও চীন দেশটিকে জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রদান এবং কিউবার ঋণ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছে।
চীন কর্তৃক আলোচনার আহ্বান
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন এমন একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতা নিশ্চিত হবে। শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি কিউবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কিউবার ওপর থেকে সব ধরণের অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। ইরানসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও চীন সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বেইজিংয়ের এই অবস্থানের মাধ্যমে কিউবার প্রতি তাদের দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সমর্থনের প্রতিফলন ঘটেছে। এর মাধ্যমে চীন মূলত কিউবাকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে টিকে থাকতে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে। কিউবার বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে চীনের এই অবস্থান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিউবা ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের এই নতুন অধ্যায় মার্কিন চাপের মুখে হাভানার জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উভয় দেশই এখন তাদের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি মার্কিন একাধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরতে কাজ করছে। বেইজিং স্পষ্ট করেছে যে কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ তারা সমর্থন করে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ কম উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা এবং পুরোনো জ্বালানি অবকাঠামো।

























