ঢাকা ০৫:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সৌদি রুটে ফ্লাইট বাতিলের সময় বাড়াল ইতিহাদ ও ফ্লাইদুবাই সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দর না হওয়ায় বড় কৌশলগত সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ অর্থমন্ত্রী -: বিগত সরকারের আমলে জিডিপি’র হিসাবে গরমিল পাওয়া গেছে ইসরাইলি নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে লিকুদ পার্টি প্রকৃত সফলতার পথে মুমিনের জীবনযাপনের ৮টি মৌলিক গুণ নাশকতা ও আতঙ্ক ছড়াতে বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণ: ডিএমপি ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলায় ৩৩ জনের প্রাণহানি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠিত শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া চলছে: আইনমন্ত্রী আর্থিকের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিতে বিচার বিভাগের বেশি ক্ষতি: আইনমন্ত্রী

বাংলাদেশের নারীদের বাণিজ্যিক তৎপরতা চোখে দেখার মতোঃ ড. আতিউর রহমান

  • আপডেট সময় : ১১:১৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৮
  • / 1271
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ড. আতিউর রহমানঃ

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অন্যতম একটি দেশ। গেল বছর এপ্রিল-মে মাসে হাওর এলাকাসহ দেশের বিরাট এলাকা বন্যা কবলিত হওয়ায় চালের দাম বেড়ে গেছে। পেঁয়াজ ও সবজির দামও বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর খাদ্য মূল্যস্ফীতির বড় প্রভাব পড়েছে। এর ওপর আবার এ বছর শীতের প্রকোপও বেশ প্রবল। গরিব মানুষের পক্ষে এই শীতে কাজকর্ম করে বেঁচে থাকাই দায়। এসবই যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটছে তা আর ব্যাখ্যা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নদী পারের মানুষগুলোর কষ্ট আরও বেশি। হঠাৎ নদী ভাঙ্গনের শিকার মানুষগুলো জলবায়ু উদ্বাস্তু বনে যান। বস্তিতে মানবেতর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন।অনেকেই নদী বক্ষে জেগে ওঠা চরে নড়বড়ে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এদের জীবন সংগ্রাম আসলেই কষ্টকর।

বিশেষ করে, চরের নারীদের দুরবস্থা আরও তীব্র। তাই তাদের জন্যে কিছু করাটা টেকসই উন্নয়নের ধারণার সাথে খুবই সংগতিপূর্ণ।

তাদের আয় রোজগারের ব্যবস্থা করা, তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করা এবং বাজার ব্যবস্থার সাথে তাদের যুক্ত করা এসবই টেকসই উন্নয়নের জন্যে খুবই অপরিহার্য। কাউকে পেছনে ফেলে আমাদের পক্ষে এগোনো যে সম্ভব নয় চরের মানুষের দিকে না তাকালে এ কথাটির মর্ম বোঝা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে আমরা যদি নদীনালার সংস্কার করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন হয় এমন ধারার উন্নয়ন সীমিত করে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথ বেঁছে না নিতে পারি তাহলে আমাদের চলমান উন্নয়ন কৌশলটিকে টেকসই করা বেশ মুশকিলই হবে।

এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে এ দেশের সাধারণ মানুষ। কৃষকদের বাড়তি ফসল উৎপাদন, তাদের নারী সন্তানদের বিরাট অংশের রপ্তানি শিল্পে নিয়োজন এবং ছেলেদের বিদেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠানোর ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের হালের অগ্রযাত্রা। বিশেষ করে, রপ্তানি শিল্পে যে বিপুল কর্মসংস্থান হচ্ছে তার ইতিবাচক প্রভাব আমাদের দারিদ্র্য নিরসনের প্রক্রিয়ার ওপর পড়ছে। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে আমাদের রপ্তানি পন্যের গ্রাহকরা বিদেশি। তারা এখন প্রশ্ন তুলছেন কি পরিবেশে এসব পন্য উৎপাদিত হয়।বিশেষ করে, রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার পর যে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল সে কারণে সারা বিশ্বেই আমাদের মতো দেশের রপ্তানি পন্য কোন্ পরিবেশে উৎপাদিত হচ্ছে সে প্রশ্ন সচেতন ভোক্তা ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জোরালোভাবেই তুলছে। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ দ্রুততার সাথেই এই উদ্বেগের মোকাবেলা করেছে। ভোক্তাদের স্বার্থ দেখে এমন সংস্থাগুলোর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশ তার রপ্তানি শিল্পকে পরিবেশসম্মত করার রূপান্তরে বিরাট অবদান রেখে চলেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানিশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারাও তাদের

কারখানাগুলোকে পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে অধিকতর পরিবেশসম্মত করার নানামুখি উদ্যোগ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই খাতের সবুজায়নের জন্যে কম দামে সবুজ ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে কয়েকটি বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এমন কি বিদেশি মুদ্রায় সস্তায় ঋণ দেবার লক্ষ্যে ‘সবুজ রূপান্তর তহবিল’ নামের দু’শো মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ কর্মসূচীও গ্রহণ করেছে। এই তহবিল দিয়ে যদি দু’শোটি কারখানাকেও সবুজায়নের রূপান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায় তাহলে সারা বিশ্বেই বাংলাদেশের গার্মেন্টস পন্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। সবুজ বাণিজ্যে অবদান রাখতে উৎসাহী একটি দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। তাই যত দ্রুত এই তহবিলের অর্থ খরচ করে কারখানাগুলো সবুজ করা যায় ততই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ধারা ত্বরান্বিত হবে।
শুধু বড় বড় কারখানা কেন, ছোট ও মাঝারি কারাখানাও বাংলাদেশ ব্যংাকের সবুজায়ন কর্মসূচির সুফল নিতে পারে।

জাপানের জাইকার আর্থিক সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের খারখানাগুলোকে শ্রমিকদের জন্যে নিরাপদ করার জন্য পূণ:অর্থায়নের একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এখন দেখার বিষয় কতোটা নিষ্ঠার সাথে এসব সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচি বাস্তবে রূপায়ন হচ্ছে। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংক নয়া ধাঁচের এই অর্থায়নের ধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না।

এসবের পাশাপাশি আমাদের অনেকগুলো সামাজিক সংগঠনও সবুজ ও ন্যায্য বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত। প্রাকৃতিক কাঁচামাল ব্যবহার করে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের এবং নিজেদের সবুজ ও মানবিক পরিচিতি তুলে ধরতে তারা আন্তরিকভাবে প্রয়াস চালাচ্ছে।

পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে, সমাজের ভেতরে বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি না করে, প্রাকৃতিক সম্পদকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রুস্ত না করে তারা পরিবেশসম্মত  উপায়ে রপ্তানি পন্য উৎপাদন করছে এবং বিদেশের নামি নামি দোকানে পাঠাচ্ছে। নিজেদের ঘরে বসেই গ্রামীণ নারীদের মানবিকতার কোমল স্পর্শে এসব ‘সবুজ পন্য’ তৈরি হচ্ছে। এসব সংস্থার সহযোগিতায় নানা ধরনের সবুজ বস্ত্র ও কারু পন্য বিদেশের ঐতিহ্যবাহী আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে। এরা যেন সবুজ ও মানবিক বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাই এসব আউটলেটে উড়িয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের সৃজনশীল সংগঠনগুলোকে যদি উপযুক্ত সরকারি প্রণোদনা ও সহযোগিতা দেয়া যায় তাহলে ধীরে ধীরে বিদেশ বাণিজ্যের পরিসরেও সবুজ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। সবুজ অর্থনীতির দেশ হিসেবে নতুন প্রজন্মের বিশ্বভোক্তারা দু’পয়সা বেশি দামেই বাংলাদেশের পরিবেশ সম্মত রপ্তানি পন্য কিনতে উৎসাহী হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ সামাজিক যোগাযোগের কল্যাণে বিশ্ব যে আজ দারুনভাবে সংযুক্ত। আমাদের গ্রাম-বাংলার মানুষের যে কোনো শুভ কর্মও নিমিষে বিশ্ব পরিসরে পরিচিত হয়ে ওঠে। এমনি একটি আশা জাগানিয়া সামাজিক সংগঠনের সবুজ কর্মকান্ড দেখতে ক’দিন আগে তাদের সদর দপ্তরে গিয়েছিলাম। বন্ধু এমদাদুল হকের কল্যাণে এ সংস্থার কর্মকা- না দেখলে বুঝতে পারতাম না যে বাংলাদেশের সাধারণ নারীও কতোটা উদ্ভাবনশীল ও নিবেদিত প্রাণ। তারাও বিশ্ব বাণিজ্যে সবুজ রপ্তানির এক সম্ভাবনাময় ধারার প্রচলন ঘটিয়ে বাংলাদেশর সুনাম কুড়িয়ে আনছে।

মিরপুর মাজারের কাছেই ‘তরঙ্গ’ নামের এই অ-সরকারি প্রতিষ্ঠানটি মূলত অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ করে। গৃহস্থালি পর্যায়ে সহিংসতার শিকার নিম্নআয়ের অনেক নারীর জন্য তারা শহরে ও গ্রামে কাজ করে। ‘তরঙ্গ’ এরই মধ্যে সুবিধে বঞ্চিত নারীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রদান করে বিশ্ববাণিজ্যের সাপ্লাই চেইনে নিজেকে যুক্ত করে নিতে সক্ষম হয়েছে। নিজেদের সমাজে নিজেদের বাড়িতে বসেই এই নারীরা কাজ করেন। সমাজ থেকে তুলে এনে শহরাঞ্চলে ছিন্নমূল শ্রমিক হিসেবে স্থানান্তর না করে একেকজন নারীকে স্ব-উদ্যোক্তা হিসেবে নিজ পরিবেশেই গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ‘তরঙ্গ’।

ইতোমধ্যে আঠেরো হাজারেরও বেশি নারী এমন পরিবেশ সম্মত কাজে যুক্ত হয়েছেন। তাদের স্বামী বা পুরুষ আত্মীয় স্বজনও তাদের কাজের বিরোধিতা না করে বরং সহযোগিতা করছেন। অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে পুরুষ সদস্যদের এমন মনের বদল ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ন্যায্য বাণিজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে ‘তরঙ্গ’ সারা বিশ্বের বড় বড় আউটলেটে তাদের পরিবেশ সম্মত উপায়ে তৈরি পন্য বিক্রি করছে। প্রত্যেক নারী যে পরিমাণ বেতন বা পণ্যের মূল্য পান তার ৬ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড হিসেবে তাদের হিসেবে যুক্ত হয়। তরঙ্গ তাতে আরও ৬ শতাংশ যোগ করে। পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ। হিসেব নিকেশ ডিজিটাল। কোথাও অস্বচ্ছতা নেই। রপ্তানী পন্যের ক্রেতারাও এ তথ্যটি জানেন। পাশাপাশি সমবায় পদ্ধতিতে তারা সঞ্চয় করছেন। নিজেদের পুঁজি গড়ে তুলছেন। এই মেয়েরা তরঙ্গের কাছ থেকে ব্যবসায় পরিকল্পনা বিষয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পান। কোন পন্য উৎপাদন কিভাবে করতে হবে তাও শিখে নেন তরঙ্গের কর্মীদের কাছ থেকে। কচুরি পানা ও পাটের মতো প্রাকৃতিক পন্যের আঁশ থেকে সূতো, বাঁশ বা গাছের গুড়ো থেকে অংশ বিশেষ থেকে কারু পন্য, হর্তিকি বা নীল গাছের পাতা থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরি করে আকর্ষণীয় ব্যাগ বা অন্যান্য কারু পন্য তৈরি করে তারা ঢাকায় পাঠান। ঢাকায় ‘তরঙ্গের’ সদর দপ্তরের আশে পাশে কারখানায় এসব পন্যের মান যাচাই করা হয়। কোনো ত্রুটি থাকলে তা সারানোর ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকাতে অনেক অসহায় নারীকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। সারা দেশে সাত/আটটি কেন্দ্রেও অনুরূপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কর্মরত মেয়েদের বাচ্চাদের জন্যে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ছাড়াও তাদের তৈরি পন্যের নয়া বাজার সন্ধানেও তরঙ্গ কাজ করছে।

‘প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন’ ও অগ্রিম তহবিলের ব্যবস্থা করে এসব নারী উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করছে ‘তরঙ্গ’। বাণিজ্যের সুত্র ধরে অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে এক সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের তৈরি পন্য এখন লন্ডনের হ্যারডস, ভিকটোরিয়া মিউজিয়াম, বডি এন্ড শপে বিক্রি হচ্ছে। সারা বিশ্বেই তাদের দাপট। পরিবেশ সচেতন বিদেশি ক্রেতারা বেশি দামেই তরঙ্গের সবুজ পন্য কিনতে আগ্রহী। বিদেশে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মেলাতেও এসব পন্য প্রদর্শিত এবং বিক্রি হচ্ছে।এসব জায়গায় শুধু আমাদের দেশের পন্যই বিক্রি হচ্ছে না। একটুকরো বাংলাদেশও প্রদর্শিত হচ্ছে। আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নন্দিত হস্তশিল্পের প্রদশর্নীও ঘটছে। আর বলা হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের এক অসাধারণ  গল্প।

বর্তমানে বছরে প্রায় আট কোটি টাকার মতো রপ্তানি করছে তরঙ্গ। যদিও অংকের বিচারে এটা খুব বড় নয়, তবে সৃজনশীলতা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিচারে এই অভিনব উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। এমন শত শত ‘তরঙ্গ’ হয়তো দেশের আনাচে কানাচে তরঙ্গায়িত করে চলেছে গ্রাম-বাংলাকে। সবার খবর আমরা রাখি না। সবগুলো তরঙ্গকে প্রয়োজনীয় নীতি সহযোগিতা দিয়ে একযোগে মেলাতে পারলে সবুজ বাংলাদেশের এক বিরাট ঢেউ নিশ্চয় তোলা যাবে বিশ্ব বাণিজ্য পরিসরে। এ ক্ষেত্রে ন্যায্য বানিজ্যের সংগঠনগুলো কাজ করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোও তার সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে এজন্যে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে নানামুখী প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে। আমি জানি ইথিওপিয়ার ক্ষুদে ও মাঝারি এমন অনেক নারী উদ্যোক্তা ফরাসী ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশীয় ধনী নারীদের চামড়ার ব্যাগ, জুতো ও তৈরি পোষাক সরবরাহ করেন। উঁচু দামের এসব পন্য প্রাকৃতিক কাঁচামালের সাহায্যে প্রধানত: হাতে তৈরি হয় বলে ‘বুটিক রপ্তানি’ পন্য হিসেবে খুবই কদর পায়। আমাদেরও ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যাক্তাদের এমন পন্য তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে। আমরা সাধারণত: বড় বড় রপ্তানিকারকদের (প্রধানত গার্মেন্টস রপ্তানিকারদের) বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে ইডিএফসহ নানা প্রণোদনা দিয়ে থাকি। এসব প্রণোদনা ক্ষুদে উদ্যোক্তাদেরও দিলে রপ্তানি আয়ে ব্যাপক উন্নতি হবে। বর্তমানে দশ লাখ ডলারের নীচে রপ্তানি করে প্রায় চার হাজার রপ্তানিকারক। সবাই কিন্তু ইডিএফ বা সবুজ অর্থায়ন সুবিধে পান না। এদের যদি উপযুক্ত বাজার সংযুক্তি, ইডিএফ ধরনের সস্তা ঋণ ও নগদ প্রনোদনা দিতে পারি তাহলে রপ্তানি আয়ই শুধু বাড়বে তাই নয় দারিদ্র্য বিমোচনও ত্বরান্বিত হবে। আর তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া যদি সবুজ করা যায় তাহলে তারা আমাদের টেকসই উন্নয়নে বড় অবদান রাখবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তাদের বাণিজ্যিক তৎপরতা তখন আরও সমাদৃত হবে।

সম্প্রতি আর্জেন্টিনায় বাণিজ্য সহায়তায় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার উদ্যোগে নয়া চুক্তি হয়েছে। এর পূর্ণ সুযোগ নিতে চাইলে ‘তরঙ্গে’র মতো ছোটখাটো সামাজিক ও ব্যাক্তি উদ্যোগকে নীতি ও আর্থিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

‘ইনোভেশন’ তথা ‘উদ্ভাবনী ও উন্নয়ন’ (আর এন্ড ডি) খাতে মনোযোগ দিয়ে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের জন্যে বিশেষ ‘সিএসআর’ বা সহায়ক তহবিল গঠন করে একটু সমর্থন দিলেই তারা এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। যেমন তরঙ্গের প্রধান নির্বাহী কোহিনুর আমাকে বলছিলেন যে তিনি যদি কিছু সহায়ক তহবিল পেতেন তাহলে চরের মেয়েদের জন্যে পাট থেকে সূতো তৈরির কারখানা স্থাপন করতেন। সোলার প্যানেল সমৃদ্ধ এই কারখানার মাধ্যমে শত শত নারীর বঞ্চনা তিনি ঘোচাতে পারতেন। একই সঙ্গে সবুজ বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটতো।পাটের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হতো।

নিশ্চয় এরকম আরো হাজারো উদ্যোক্তা রয়েছেন আমাদের সমাজে। তাদের দিকে একটু হাত বাড়িয়ে দিলেই তারাও ২০২১ সালের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জাতীয় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারতেন। সবচেয়ে বড় কথা তারা আমাদের রপ্তানি খাতকে সবুজ বাণিজ্যের পরিসরে যুক্ত করতে পারতেন। ইপিবি, বাণিজ্য মন্ত্রণায়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থমন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে একযোগে কাজ করে সম্ভাবনাময় এসব পরিবেশসম্মত রপ্তানিকারকদের পথ চলাকে আরও সহজতর করবে সেই আশাই করছি। আর তা করা গেলে তারাই আগামীর বাংলাদেশের বড় চালক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে সক্ষম হবেন।

বিডিসংবাদ/এএইচএস

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

বাংলাদেশের নারীদের বাণিজ্যিক তৎপরতা চোখে দেখার মতোঃ ড. আতিউর রহমান

আপডেট সময় : ১১:১৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৮

ড. আতিউর রহমানঃ

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অন্যতম একটি দেশ। গেল বছর এপ্রিল-মে মাসে হাওর এলাকাসহ দেশের বিরাট এলাকা বন্যা কবলিত হওয়ায় চালের দাম বেড়ে গেছে। পেঁয়াজ ও সবজির দামও বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর খাদ্য মূল্যস্ফীতির বড় প্রভাব পড়েছে। এর ওপর আবার এ বছর শীতের প্রকোপও বেশ প্রবল। গরিব মানুষের পক্ষে এই শীতে কাজকর্ম করে বেঁচে থাকাই দায়। এসবই যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটছে তা আর ব্যাখ্যা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নদী পারের মানুষগুলোর কষ্ট আরও বেশি। হঠাৎ নদী ভাঙ্গনের শিকার মানুষগুলো জলবায়ু উদ্বাস্তু বনে যান। বস্তিতে মানবেতর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন।অনেকেই নদী বক্ষে জেগে ওঠা চরে নড়বড়ে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এদের জীবন সংগ্রাম আসলেই কষ্টকর।

বিশেষ করে, চরের নারীদের দুরবস্থা আরও তীব্র। তাই তাদের জন্যে কিছু করাটা টেকসই উন্নয়নের ধারণার সাথে খুবই সংগতিপূর্ণ।

তাদের আয় রোজগারের ব্যবস্থা করা, তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করা এবং বাজার ব্যবস্থার সাথে তাদের যুক্ত করা এসবই টেকসই উন্নয়নের জন্যে খুবই অপরিহার্য। কাউকে পেছনে ফেলে আমাদের পক্ষে এগোনো যে সম্ভব নয় চরের মানুষের দিকে না তাকালে এ কথাটির মর্ম বোঝা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে আমরা যদি নদীনালার সংস্কার করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন হয় এমন ধারার উন্নয়ন সীমিত করে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথ বেঁছে না নিতে পারি তাহলে আমাদের চলমান উন্নয়ন কৌশলটিকে টেকসই করা বেশ মুশকিলই হবে।

এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে এ দেশের সাধারণ মানুষ। কৃষকদের বাড়তি ফসল উৎপাদন, তাদের নারী সন্তানদের বিরাট অংশের রপ্তানি শিল্পে নিয়োজন এবং ছেলেদের বিদেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠানোর ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের হালের অগ্রযাত্রা। বিশেষ করে, রপ্তানি শিল্পে যে বিপুল কর্মসংস্থান হচ্ছে তার ইতিবাচক প্রভাব আমাদের দারিদ্র্য নিরসনের প্রক্রিয়ার ওপর পড়ছে। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে আমাদের রপ্তানি পন্যের গ্রাহকরা বিদেশি। তারা এখন প্রশ্ন তুলছেন কি পরিবেশে এসব পন্য উৎপাদিত হয়।বিশেষ করে, রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার পর যে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল সে কারণে সারা বিশ্বেই আমাদের মতো দেশের রপ্তানি পন্য কোন্ পরিবেশে উৎপাদিত হচ্ছে সে প্রশ্ন সচেতন ভোক্তা ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জোরালোভাবেই তুলছে। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ দ্রুততার সাথেই এই উদ্বেগের মোকাবেলা করেছে। ভোক্তাদের স্বার্থ দেখে এমন সংস্থাগুলোর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশ তার রপ্তানি শিল্পকে পরিবেশসম্মত করার রূপান্তরে বিরাট অবদান রেখে চলেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানিশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারাও তাদের

কারখানাগুলোকে পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে অধিকতর পরিবেশসম্মত করার নানামুখি উদ্যোগ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই খাতের সবুজায়নের জন্যে কম দামে সবুজ ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে কয়েকটি বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এমন কি বিদেশি মুদ্রায় সস্তায় ঋণ দেবার লক্ষ্যে ‘সবুজ রূপান্তর তহবিল’ নামের দু’শো মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ কর্মসূচীও গ্রহণ করেছে। এই তহবিল দিয়ে যদি দু’শোটি কারখানাকেও সবুজায়নের রূপান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায় তাহলে সারা বিশ্বেই বাংলাদেশের গার্মেন্টস পন্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। সবুজ বাণিজ্যে অবদান রাখতে উৎসাহী একটি দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। তাই যত দ্রুত এই তহবিলের অর্থ খরচ করে কারখানাগুলো সবুজ করা যায় ততই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ধারা ত্বরান্বিত হবে।
শুধু বড় বড় কারখানা কেন, ছোট ও মাঝারি কারাখানাও বাংলাদেশ ব্যংাকের সবুজায়ন কর্মসূচির সুফল নিতে পারে।

জাপানের জাইকার আর্থিক সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের খারখানাগুলোকে শ্রমিকদের জন্যে নিরাপদ করার জন্য পূণ:অর্থায়নের একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এখন দেখার বিষয় কতোটা নিষ্ঠার সাথে এসব সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচি বাস্তবে রূপায়ন হচ্ছে। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংক নয়া ধাঁচের এই অর্থায়নের ধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না।

এসবের পাশাপাশি আমাদের অনেকগুলো সামাজিক সংগঠনও সবুজ ও ন্যায্য বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত। প্রাকৃতিক কাঁচামাল ব্যবহার করে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের এবং নিজেদের সবুজ ও মানবিক পরিচিতি তুলে ধরতে তারা আন্তরিকভাবে প্রয়াস চালাচ্ছে।

পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে, সমাজের ভেতরে বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি না করে, প্রাকৃতিক সম্পদকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রুস্ত না করে তারা পরিবেশসম্মত  উপায়ে রপ্তানি পন্য উৎপাদন করছে এবং বিদেশের নামি নামি দোকানে পাঠাচ্ছে। নিজেদের ঘরে বসেই গ্রামীণ নারীদের মানবিকতার কোমল স্পর্শে এসব ‘সবুজ পন্য’ তৈরি হচ্ছে। এসব সংস্থার সহযোগিতায় নানা ধরনের সবুজ বস্ত্র ও কারু পন্য বিদেশের ঐতিহ্যবাহী আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে। এরা যেন সবুজ ও মানবিক বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাই এসব আউটলেটে উড়িয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের সৃজনশীল সংগঠনগুলোকে যদি উপযুক্ত সরকারি প্রণোদনা ও সহযোগিতা দেয়া যায় তাহলে ধীরে ধীরে বিদেশ বাণিজ্যের পরিসরেও সবুজ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। সবুজ অর্থনীতির দেশ হিসেবে নতুন প্রজন্মের বিশ্বভোক্তারা দু’পয়সা বেশি দামেই বাংলাদেশের পরিবেশ সম্মত রপ্তানি পন্য কিনতে উৎসাহী হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ সামাজিক যোগাযোগের কল্যাণে বিশ্ব যে আজ দারুনভাবে সংযুক্ত। আমাদের গ্রাম-বাংলার মানুষের যে কোনো শুভ কর্মও নিমিষে বিশ্ব পরিসরে পরিচিত হয়ে ওঠে। এমনি একটি আশা জাগানিয়া সামাজিক সংগঠনের সবুজ কর্মকান্ড দেখতে ক’দিন আগে তাদের সদর দপ্তরে গিয়েছিলাম। বন্ধু এমদাদুল হকের কল্যাণে এ সংস্থার কর্মকা- না দেখলে বুঝতে পারতাম না যে বাংলাদেশের সাধারণ নারীও কতোটা উদ্ভাবনশীল ও নিবেদিত প্রাণ। তারাও বিশ্ব বাণিজ্যে সবুজ রপ্তানির এক সম্ভাবনাময় ধারার প্রচলন ঘটিয়ে বাংলাদেশর সুনাম কুড়িয়ে আনছে।

মিরপুর মাজারের কাছেই ‘তরঙ্গ’ নামের এই অ-সরকারি প্রতিষ্ঠানটি মূলত অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ করে। গৃহস্থালি পর্যায়ে সহিংসতার শিকার নিম্নআয়ের অনেক নারীর জন্য তারা শহরে ও গ্রামে কাজ করে। ‘তরঙ্গ’ এরই মধ্যে সুবিধে বঞ্চিত নারীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রদান করে বিশ্ববাণিজ্যের সাপ্লাই চেইনে নিজেকে যুক্ত করে নিতে সক্ষম হয়েছে। নিজেদের সমাজে নিজেদের বাড়িতে বসেই এই নারীরা কাজ করেন। সমাজ থেকে তুলে এনে শহরাঞ্চলে ছিন্নমূল শ্রমিক হিসেবে স্থানান্তর না করে একেকজন নারীকে স্ব-উদ্যোক্তা হিসেবে নিজ পরিবেশেই গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ‘তরঙ্গ’।

ইতোমধ্যে আঠেরো হাজারেরও বেশি নারী এমন পরিবেশ সম্মত কাজে যুক্ত হয়েছেন। তাদের স্বামী বা পুরুষ আত্মীয় স্বজনও তাদের কাজের বিরোধিতা না করে বরং সহযোগিতা করছেন। অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে পুরুষ সদস্যদের এমন মনের বদল ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ন্যায্য বাণিজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে ‘তরঙ্গ’ সারা বিশ্বের বড় বড় আউটলেটে তাদের পরিবেশ সম্মত উপায়ে তৈরি পন্য বিক্রি করছে। প্রত্যেক নারী যে পরিমাণ বেতন বা পণ্যের মূল্য পান তার ৬ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড হিসেবে তাদের হিসেবে যুক্ত হয়। তরঙ্গ তাতে আরও ৬ শতাংশ যোগ করে। পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ। হিসেব নিকেশ ডিজিটাল। কোথাও অস্বচ্ছতা নেই। রপ্তানী পন্যের ক্রেতারাও এ তথ্যটি জানেন। পাশাপাশি সমবায় পদ্ধতিতে তারা সঞ্চয় করছেন। নিজেদের পুঁজি গড়ে তুলছেন। এই মেয়েরা তরঙ্গের কাছ থেকে ব্যবসায় পরিকল্পনা বিষয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পান। কোন পন্য উৎপাদন কিভাবে করতে হবে তাও শিখে নেন তরঙ্গের কর্মীদের কাছ থেকে। কচুরি পানা ও পাটের মতো প্রাকৃতিক পন্যের আঁশ থেকে সূতো, বাঁশ বা গাছের গুড়ো থেকে অংশ বিশেষ থেকে কারু পন্য, হর্তিকি বা নীল গাছের পাতা থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরি করে আকর্ষণীয় ব্যাগ বা অন্যান্য কারু পন্য তৈরি করে তারা ঢাকায় পাঠান। ঢাকায় ‘তরঙ্গের’ সদর দপ্তরের আশে পাশে কারখানায় এসব পন্যের মান যাচাই করা হয়। কোনো ত্রুটি থাকলে তা সারানোর ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকাতে অনেক অসহায় নারীকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। সারা দেশে সাত/আটটি কেন্দ্রেও অনুরূপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কর্মরত মেয়েদের বাচ্চাদের জন্যে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ছাড়াও তাদের তৈরি পন্যের নয়া বাজার সন্ধানেও তরঙ্গ কাজ করছে।

‘প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন’ ও অগ্রিম তহবিলের ব্যবস্থা করে এসব নারী উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করছে ‘তরঙ্গ’। বাণিজ্যের সুত্র ধরে অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে এক সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের তৈরি পন্য এখন লন্ডনের হ্যারডস, ভিকটোরিয়া মিউজিয়াম, বডি এন্ড শপে বিক্রি হচ্ছে। সারা বিশ্বেই তাদের দাপট। পরিবেশ সচেতন বিদেশি ক্রেতারা বেশি দামেই তরঙ্গের সবুজ পন্য কিনতে আগ্রহী। বিদেশে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মেলাতেও এসব পন্য প্রদর্শিত এবং বিক্রি হচ্ছে।এসব জায়গায় শুধু আমাদের দেশের পন্যই বিক্রি হচ্ছে না। একটুকরো বাংলাদেশও প্রদর্শিত হচ্ছে। আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নন্দিত হস্তশিল্পের প্রদশর্নীও ঘটছে। আর বলা হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের এক অসাধারণ  গল্প।

বর্তমানে বছরে প্রায় আট কোটি টাকার মতো রপ্তানি করছে তরঙ্গ। যদিও অংকের বিচারে এটা খুব বড় নয়, তবে সৃজনশীলতা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিচারে এই অভিনব উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। এমন শত শত ‘তরঙ্গ’ হয়তো দেশের আনাচে কানাচে তরঙ্গায়িত করে চলেছে গ্রাম-বাংলাকে। সবার খবর আমরা রাখি না। সবগুলো তরঙ্গকে প্রয়োজনীয় নীতি সহযোগিতা দিয়ে একযোগে মেলাতে পারলে সবুজ বাংলাদেশের এক বিরাট ঢেউ নিশ্চয় তোলা যাবে বিশ্ব বাণিজ্য পরিসরে। এ ক্ষেত্রে ন্যায্য বানিজ্যের সংগঠনগুলো কাজ করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোও তার সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে এজন্যে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে নানামুখী প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে। আমি জানি ইথিওপিয়ার ক্ষুদে ও মাঝারি এমন অনেক নারী উদ্যোক্তা ফরাসী ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশীয় ধনী নারীদের চামড়ার ব্যাগ, জুতো ও তৈরি পোষাক সরবরাহ করেন। উঁচু দামের এসব পন্য প্রাকৃতিক কাঁচামালের সাহায্যে প্রধানত: হাতে তৈরি হয় বলে ‘বুটিক রপ্তানি’ পন্য হিসেবে খুবই কদর পায়। আমাদেরও ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যাক্তাদের এমন পন্য তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে। আমরা সাধারণত: বড় বড় রপ্তানিকারকদের (প্রধানত গার্মেন্টস রপ্তানিকারদের) বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে ইডিএফসহ নানা প্রণোদনা দিয়ে থাকি। এসব প্রণোদনা ক্ষুদে উদ্যোক্তাদেরও দিলে রপ্তানি আয়ে ব্যাপক উন্নতি হবে। বর্তমানে দশ লাখ ডলারের নীচে রপ্তানি করে প্রায় চার হাজার রপ্তানিকারক। সবাই কিন্তু ইডিএফ বা সবুজ অর্থায়ন সুবিধে পান না। এদের যদি উপযুক্ত বাজার সংযুক্তি, ইডিএফ ধরনের সস্তা ঋণ ও নগদ প্রনোদনা দিতে পারি তাহলে রপ্তানি আয়ই শুধু বাড়বে তাই নয় দারিদ্র্য বিমোচনও ত্বরান্বিত হবে। আর তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া যদি সবুজ করা যায় তাহলে তারা আমাদের টেকসই উন্নয়নে বড় অবদান রাখবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তাদের বাণিজ্যিক তৎপরতা তখন আরও সমাদৃত হবে।

সম্প্রতি আর্জেন্টিনায় বাণিজ্য সহায়তায় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার উদ্যোগে নয়া চুক্তি হয়েছে। এর পূর্ণ সুযোগ নিতে চাইলে ‘তরঙ্গে’র মতো ছোটখাটো সামাজিক ও ব্যাক্তি উদ্যোগকে নীতি ও আর্থিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

‘ইনোভেশন’ তথা ‘উদ্ভাবনী ও উন্নয়ন’ (আর এন্ড ডি) খাতে মনোযোগ দিয়ে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের জন্যে বিশেষ ‘সিএসআর’ বা সহায়ক তহবিল গঠন করে একটু সমর্থন দিলেই তারা এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। যেমন তরঙ্গের প্রধান নির্বাহী কোহিনুর আমাকে বলছিলেন যে তিনি যদি কিছু সহায়ক তহবিল পেতেন তাহলে চরের মেয়েদের জন্যে পাট থেকে সূতো তৈরির কারখানা স্থাপন করতেন। সোলার প্যানেল সমৃদ্ধ এই কারখানার মাধ্যমে শত শত নারীর বঞ্চনা তিনি ঘোচাতে পারতেন। একই সঙ্গে সবুজ বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটতো।পাটের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হতো।

নিশ্চয় এরকম আরো হাজারো উদ্যোক্তা রয়েছেন আমাদের সমাজে। তাদের দিকে একটু হাত বাড়িয়ে দিলেই তারাও ২০২১ সালের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জাতীয় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারতেন। সবচেয়ে বড় কথা তারা আমাদের রপ্তানি খাতকে সবুজ বাণিজ্যের পরিসরে যুক্ত করতে পারতেন। ইপিবি, বাণিজ্য মন্ত্রণায়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থমন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে একযোগে কাজ করে সম্ভাবনাময় এসব পরিবেশসম্মত রপ্তানিকারকদের পথ চলাকে আরও সহজতর করবে সেই আশাই করছি। আর তা করা গেলে তারাই আগামীর বাংলাদেশের বড় চালক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে সক্ষম হবেন।

বিডিসংবাদ/এএইচএস