হৃদরোগে অর্ধেক মৃত্যুর জন্যই দায়ী উচ্চ রক্তচাপ
আজ বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস
- আপডেট সময় : ০৬:৪৮:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
- / 87
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা:
বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ৫২ শতাংশের জন্যই দায়ী উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছেন, যার অর্ধেকের বেশির কারণ ছিল এই উচ্চ রক্তচাপ। বর্তমানে দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ নীরব এই ঘাতক ব্যাধিতে ভুগছেন।
এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজ রবিবার (১৭ মে) বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি: নীরব ঘাতককে জয় করি’। ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লীগের সদস্য হিসেবে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের হাইপারটেনশন কমিটি ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর ১৭ মে দিবসটি পালন করে আসছে।
‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮’-এর তথ্যমতে, দেশে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার প্রায় ৪০ শতাংশ, যা ২০১১ সালে ছিল মাত্র ২৬ শতাংশ। বর্তমানে পুরুষের মধ্যে এই হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে এবং নারীর ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নারী এবং ৬৭ শতাংশ পুরুষ জানেনই না যে তারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় বর্তমানে এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ।
উচ্চ রক্তচাপ এখন আর কেবল বয়স্কদের রোগ নয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, বর্তমানে প্রতি পাঁচজনে একজন তরুণ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। তিনি বলেন, “চিপস, আচার, বার্গার, পিৎজা, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি-লবণযুক্ত খাবার তরুণদের রক্তচাপ বাড়াচ্ছে। কিশোর-তরুণদের মধ্যে ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার প্রবণতা কমছে।” এছাড়া ধূমপান, মাদক, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করাও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, “খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে পরিবর্তন এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষার মাধ্যমেই তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই নীরব ঘাতকের প্রকোপ কমানো সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে এই রোগে আক্রান্ত হন। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক), হৃদরোগ, কিডনি বিকল এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তচাপ ১২০/৮০ মি.মি. পারদচাপ ধরা হয়। ভিন্ন দুটি দিনে এটি ১৪০/৯০ বা তার বেশি হলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয় (ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে ১৩০/৮০ এর বেশি হলেই তা উচ্চ রক্তচাপ)।
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশ ঘটে থাকে, যার মধ্যে ৩৪ শতাংশই হৃদরোগের কারণে। দেশে আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের অভাবে এদের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে হিসাবের বাইরে। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ থেকে বাঁচতে নিয়মিত ব্যায়াম, চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার পরিহার এবং জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই ওষুধের মাত্রা কমানো বা বন্ধ করা যাবে না।





















