ঢাকা ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: চার শতাধিক স্কুল বন্ধ, ধরপাকড় অব্যাহত

  • আপডেট সময় : ০৮:২৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 0
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও পরিবেশ পরিবর্তনের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের জেরে ফ্রান্সের ৩ হাজার ৭০০টি হাইস্কুলের মধ্যে ৪০০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সোমবার সকালে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ক্লাসের অতিরিক্ত সময়সূচি, দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং অসহনীয় তাপমাত্রা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই আন্দোলন। ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপশহর ক্রাতেই-এর একটি হাইস্কুল থেকে শিক্ষকদের দাবির সমর্থনে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, যা এখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ফ্রান্সের ৩ হাজার ৭০০টি হাইস্কুল বা ‘লিসে’র মধ্যে সোমবার সকালে ৪০০টিরও বেশি স্কুল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’ কর্তৃপক্ষ রোববার পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়স। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেনে-তে ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী মন্তেনিয়া লিসের বাইরে জড়ো হয়, যাদের একজনের হাতে থাকা প্লেকার্ডে লেখা ছিল ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’। মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে এই কিশোর বা তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি বড় আকার ধারণ করলো।

বিক্ষোভের তীব্রতা বজায় থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে নানা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর তথ্যমতে, আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২৪টি স্কুল ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। দাঙ্গা পুলিশের কঠোর অবস্থানের মুখে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। লিলে শহরে মাস্ক পরিহিত আন্দোলনকারীরা বাস স্টপ ভাঙচুর ও ডাস্টবিনে আগুন দিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। প্যারিসের গুস্তাভ আইফেল হাইস্কুলের বাইরেও পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়, যেখানে পুলিশের দিকে আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এ পর্যন্ত ৫ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী। পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ ওঠায় অন্তত তিনটি ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার একদিকে আলোচনার পথ খুঁজছে, অন্যদিকে আন্দোলনকে ‘উগ্র-বামপন্থি কর্মীদের কব্জা’ বলে অভিহিত করছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লোকোর্নু শিক্ষক নিয়োগ ও শূন্য পদ পূরণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আগামী মঙ্গলবার স্কুল সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য আঞ্চলিক প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পাশাপাশি, শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি একটি বিতর্কিত বিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, পড়াশোনার সময় স্কুল ভাঙচুরের মতো ঘটনায় জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্কদের অভিভাবকদের পারিবারিক ভাতা ও আবাসন সুবিধা থেকে ক্ষতিপূরণ কাটা হতে পারে। সরকারি মুখপাত্র মড ব্রেজোঁ সি-নিউজকে বলেন, সন্তানের কর্মকাণ্ডের দায়ভার অভিভাবকদের নেওয়া উচিত।

তবে সরকারের এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করছেন শ্রমিক নেতারা। সিজিটি লেবার ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে একে ‘সস্তা জনপ্রিয়তা’ অর্জনকারী ঘোষণা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এটি সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছে, তারা পর্যাপ্ত শিক্ষক ও মানসম্মত ক্লাসরুম চায়। এমন পরিস্থিতিতে, আগামীকাল বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতির মধ্যে ৫ অক্টোবর (সোমবার) বিভিন্ন স্কুলের সামনে উত্তেজনা থাকলেও কিছু শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বর্দোতে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেও অনেকে ক্লাসে যোগ দেয়, যদিও সেখানে বিক্ষোভ পুরোপুরি থেমে যায়নি। সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ ফ্রান্সের শিক্ষা খাতের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামীকাল বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রেক্ষাপটকে ঘিরে ৫ অক্টোবর (সোমবার) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গেটের বাইরে আন্দোলন চললেও কিছু শিক্ষার্থী স্কুলে প্রবেশ করে। এর ফলে দেশজুড়ে শত শত স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এই আন্দোলনটিকে ঘিরে দেশটির চরম ডানপন্থিরা ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। এ সময় সেখানে যাতায়াতকারী গাড়িগুলো হর্ন বাজিয়ে তাদের সমর্থন জানায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: চার শতাধিক স্কুল বন্ধ, ধরপাকড় অব্যাহত

আপডেট সময় : ০৮:২৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও পরিবেশ পরিবর্তনের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের জেরে ফ্রান্সের ৩ হাজার ৭০০টি হাইস্কুলের মধ্যে ৪০০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সোমবার সকালে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ক্লাসের অতিরিক্ত সময়সূচি, দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং অসহনীয় তাপমাত্রা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই আন্দোলন। ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপশহর ক্রাতেই-এর একটি হাইস্কুল থেকে শিক্ষকদের দাবির সমর্থনে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, যা এখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ফ্রান্সের ৩ হাজার ৭০০টি হাইস্কুল বা ‘লিসে’র মধ্যে সোমবার সকালে ৪০০টিরও বেশি স্কুল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’ কর্তৃপক্ষ রোববার পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়স। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেনে-তে ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী মন্তেনিয়া লিসের বাইরে জড়ো হয়, যাদের একজনের হাতে থাকা প্লেকার্ডে লেখা ছিল ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’। মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে এই কিশোর বা তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি বড় আকার ধারণ করলো।

বিক্ষোভের তীব্রতা বজায় থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে নানা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর তথ্যমতে, আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২৪টি স্কুল ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। দাঙ্গা পুলিশের কঠোর অবস্থানের মুখে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। লিলে শহরে মাস্ক পরিহিত আন্দোলনকারীরা বাস স্টপ ভাঙচুর ও ডাস্টবিনে আগুন দিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। প্যারিসের গুস্তাভ আইফেল হাইস্কুলের বাইরেও পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়, যেখানে পুলিশের দিকে আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এ পর্যন্ত ৫ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী। পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ ওঠায় অন্তত তিনটি ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার একদিকে আলোচনার পথ খুঁজছে, অন্যদিকে আন্দোলনকে ‘উগ্র-বামপন্থি কর্মীদের কব্জা’ বলে অভিহিত করছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লোকোর্নু শিক্ষক নিয়োগ ও শূন্য পদ পূরণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আগামী মঙ্গলবার স্কুল সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য আঞ্চলিক প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পাশাপাশি, শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি একটি বিতর্কিত বিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, পড়াশোনার সময় স্কুল ভাঙচুরের মতো ঘটনায় জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্কদের অভিভাবকদের পারিবারিক ভাতা ও আবাসন সুবিধা থেকে ক্ষতিপূরণ কাটা হতে পারে। সরকারি মুখপাত্র মড ব্রেজোঁ সি-নিউজকে বলেন, সন্তানের কর্মকাণ্ডের দায়ভার অভিভাবকদের নেওয়া উচিত।

তবে সরকারের এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করছেন শ্রমিক নেতারা। সিজিটি লেবার ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে একে ‘সস্তা জনপ্রিয়তা’ অর্জনকারী ঘোষণা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এটি সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছে, তারা পর্যাপ্ত শিক্ষক ও মানসম্মত ক্লাসরুম চায়। এমন পরিস্থিতিতে, আগামীকাল বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতির মধ্যে ৫ অক্টোবর (সোমবার) বিভিন্ন স্কুলের সামনে উত্তেজনা থাকলেও কিছু শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বর্দোতে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেও অনেকে ক্লাসে যোগ দেয়, যদিও সেখানে বিক্ষোভ পুরোপুরি থেমে যায়নি। সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ ফ্রান্সের শিক্ষা খাতের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামীকাল বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রেক্ষাপটকে ঘিরে ৫ অক্টোবর (সোমবার) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গেটের বাইরে আন্দোলন চললেও কিছু শিক্ষার্থী স্কুলে প্রবেশ করে। এর ফলে দেশজুড়ে শত শত স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এই আন্দোলনটিকে ঘিরে দেশটির চরম ডানপন্থিরা ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। এ সময় সেখানে যাতায়াতকারী গাড়িগুলো হর্ন বাজিয়ে তাদের সমর্থন জানায়।