রেডিমিক্স ‘তুফান’ কিশোর গ্যাংকে উসকে দিচ্ছে!
- আপডেট সময় : ০৮:১১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ জুন ২০২৪
- / 229
আহমেদ তেপান্তর
সাড়ে চার দশক আগে বাণিজ্যিক সিনেমার খ্যাতিমান প্রযোজক ও পরিচালক অশোক ঘোষ নির্মাণ করেছিলেন ‘তুফান’। আহমেদ জামান চৌধুরীর চিত্রনাট্যে এ সিনেমায় শাবানা, ওয়াসিম, মাহমুদ কলি, সুচরিতার মতো শিল্পীরা অভিনয় করেছিলেন। ওই সিনেমায় বাণিজ্যিক মাসালার সঙ্গে স্বতন্ত্র একটি গল্প ছিল। সিনেমায় ‘ও দরিয়ার পানি, তোর মতলব জানি’ শিরোনামের গান আজও সমান শ্রোতাপ্রিয়। একই নামে ‘তুফান’ সিনেমাটি এবার নির্মাণ করলেন হালের জনপ্রিয় পরিচালক রায়হান রাফি। এতে সোহানুর রহমান সোহান, বদিউল আলম খোকন, এফআই মানিক, শাহীন সুমনের হাত ধরে ক্যারিয়ার গড়া রেডিমেইড শাকিব খানকে ভেঙে গড়ার মানসে দর্শকের কাছে হাজির করেছেন রাফি। এই ভাঙা গড়াটা শুরু হয়েছিল আবার ‘রাজনীতি’ সিনেমায় বুলবুল বিশ^াসের হাত ধরে। তবে সিনেমাটি মুক্তি বিলম্বিত হওয়ায় নবাব, শিকারি ততোদিনে দুই বাংলায় পরিবর্তনের ঝলকে দেখা দেন শাকিব খান। সে ধারাবাহিকতায় ‘তুফান’ সিনেমায় শাকিব হাজির হয়েছেন। তবে দায়হীন এক রোবটিক চরিত্রে। সিনেমাটি অনেক বিতর্ক চর্চিত হওয়ার পর একচ্ছত্রভাবে প্রেক্ষাগৃহে আধিপত্য বিস্তার করে এবং অস্বীকার করার উপায় নেই, মুক্তির শুরুতেই দর্শক লুফে নেয়। তবে অস্বাভাবিকভাবে পারিবারিক দর্শকের তুলনায় কম বয়সীদের পদচারণায় মুখরিত হয় প্রেক্ষাগৃহ। আশ্চর্যের বিষয় সিনেমাতে আঠারো বছরের কম বয়সীদের দেখা গেছে বেশ উৎসাহ নিয়ে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুরের অনেক মফস্বল হলে এই বয়সীদের ভিড় দেখা গেছে। এতে হয়তো প্রেক্ষাগৃহে ব্যবসা হয়েছে; কিন্তু গভীর নেতিবাচক বার্তাও ছড়িয়ে পড়েছে। এই বয়সী দর্শক সমাজের দুষ্টুখ্যাত কিশোর গ্যাং। যে শ্রেণির ব্যাপারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ^াসী। সারা দেশে অন্তত ২৩৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। দায়হীন অযৌক্তিক রোবটিক চরিত্রে শাকিব খানকে এসব কিশোর গ্যাংয়ের কাছে আরাধ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। আর বিনাকর্তনে ছাড়পত্র পাওয়া এ সিনেমাটির জন্য সেন্সর বোর্ডের একচোখা নীতি ইন্ডাস্ট্রির অপরাপরদের প্রতি বৈষম্যের প্রকাশ দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। দেখার অপেক্ষায়, ভবিষ্যতে সেন্সর বোর্ড অপরাপরদের জন্য কোনো নীতিতে চলে?
বাংলা সিনেমার যে মেলোডি নির্ভরতা সেটার ধারেকাছেও ছিল না ‘তুফান’। ডাবল মিনিংয়ের দুটি গান (লাগে উড়াধুরা, দুষ্টু কোকিল) বেশ ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু নির্মাতা হয়তো ভুলে গেছেন, সিনেমার গল্পের সঙ্গে মেলোডি গানও দরকার, যা দর্শকের কণ্ঠে আবেশ হয়ে ধরা দেবে বহুদিন। ভাইরাল গান কুরমুরে এর রেশ স্থায়ী হয় না। নির্মাতা হয়তো চশমার ফাঁক গলিয়ে বাংলা সিনেমাকে অনেক দূর নেবেন সে প্রত্যাশা করেননি; তার বদলে সময়ে উতরে যাওয়ার কৌশল নিয়েছেন। এ যাত্রায় এমনটা হলে তিনি অবশ্যই লেটার মার্ক পাবেন। তবে সারাদেশের প্রেক্ষাগৃহ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রিপিট দর্শক নেই বললেই চলে। এ দায় নির্মাতা খণ্ডন করতে পারেন ওয়ানটাইম দর্শকের জটলা দেখিয়ে। সিনেমা বেঁচে থাকে রিপিট দর্শকে- এ বিশ^াস দৃঢ় না হলে নির্মাতাও খই মুড়ির মতো উড়ে যাবেন। রিপিট দর্শক আর মেলোডিকে এড়িয়ে গত এক দশক ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেই উড়ে গেছেন। সে পথ মনে হচ্ছে রাফিও অনুসরণ করলেন। হয়তো তিনি এ সিনেমার গল্পটাকে পরাণ বা সুড়ঙ্গের আবহে দেখাতে চেয়েছিলেন। তবে নিজেকেই ভুলেছেন এই নির্মাতা। পরাণ-এ গল্প গাঁথুনির সঙ্গে চমৎকার মেলোডি সিনেমাটিকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেটা ‘তুফান’-এর বেলায় হয়নি। অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতে ভুগলে এমনটা হয়।
গল্পটাকে ভারতীয় কয়েকটি সিনেমার মেশালে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এমন চেষ্টা এই প্রথম তা নয়, অতীতে দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, দেওয়ান নজরুল, মালেক আফসারী এমন অনেকেই করেছেন। সে পথের নতুন অনুসারী হিসেবে এবার নাম লেখালেন ‘পরাণ’খ্যাত রায়হান রাফি। তবে এটা করতে গিয়ে তিনি সমসাময়িক ভারতীয় সিনেমাকেই বেছে নিয়েছেন। যে কারণে বলা যায়, এটি কয়েকটি সিনেমার ‘রেডিমিক্স’। তিনি কেবল শাকিব খানের মার্কেট ভেলুটাকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। করপোরেট ক্ষমতায় এ যাত্রায় সফল হলেও এর ভবিষ্যৎ সুখকর নয়। তারপরও দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, এটা দেখে রাফি-শাকিবের দর্শকের কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
‘তুফান’-এ শাকিব খানের অভিনয় পরীশালিত এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। তবে নিকট অতীতে ‘প্রিয়তমা’কে ছাপিয়ে যেতে পারেননি। এ না পারার কারণ গল্পে টোটালিজমের অভাব। রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কোনো ধরনের দায়হীন চরিত্রায়ন। সংলাপের দুর্বলতা গতানুগতিক। যে তর্জন গর্জন অস্ত্রে দেখেছে দর্শক, সংলাপে এসে সেটাই ভাটা পড়েছে। এ জায়গায় আরো চর্চার দরকার ছিল। বিশেষ করে কাউন্টার সংলাপ বিরক্তি জাগিয়েছে। বাজার বড় করতেই ভারতীয় অভিনেত্রী মিমকে নেওয়া। এ মার্কেটিংয়ে নির্মাতা সফল। তবে তার থেকে বেটার অভিনয় বের করতে পারেননি। নাবিলা ভালো করতে করতেও খেই হারিয়েছেন কোনো কোনো দৃশ্যে। তুফানরূপী শাকিব খানের দক্ষিণহস্ত গাজী রাকায়েতের হাতে ভারী অস্ত্র এমন দৃশ্যটি ভাড়ামোর মতো ঠেকেছে।
কয়েকটি সিনেমার গল্পের গাঁথুনিকে রাফি নিজস্ব আঙ্গিক দাঁড় করিয়ে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি গল্প ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর সম্পাদনার কাজটি দুরূহ হয় বৈকি! এ জায়গায় সম্পাদক মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আবহসঙ্গীত মৌলিকত্ব ছাড়াতে না পারলেও কর্কশ লাগেনি ফলে এনজয় করেছেন দর্শক।
‘তুফান’ বক্তব্যধর্মী সিনেমা নয়। এতে দৃশ্যগত প্রভাব বিস্তর। গাজী রাকায়েতের স্টোরি টেইলিংটা দুর্দান্ত ডেলিভারি ছিল। শক্তিমান খল অভিনেতা মিশা সওদাগর মাত্র তিনটি দৃশ্যে অভিনয় করেছেন। এতো অল্প দৃশ্যে গত বিশ বছরে কোনো সিনেমায় তাকে দেখা গেছে বলে মনে হয় না। তবে সিনেমায় নামের ভারিক্কি ছাড়া তার উপস্থিতি বাড়তি মাসালা যোগ করেনি। বরং তাকে আরো স্পেস দেওয়ার সুযোগ ছিল। ক্যামিও চরিত্রে শহুরে ডনরূপে সুমন আনোয়ারের উপস্থিতি দর্শকদের আনন্দ জোগালেও সংলাপ ডেলিভারিতে ম্রিয়মাণ মনে হয়েছে। যদিও অভিনয় দক্ষতায় সেসব ঢাকা পড়েছে।
ওদিকে সিনেমার অন্তঃপ্রাণ সহজ সরল যুবক শান্ত। অভিনয় তার ধ্যান-জ্ঞান। পর্দায় সামান্য উপস্থিতির জন্য প্রাণান্ত তার চেষ্টা। তার ধ্যান-জ্ঞান অভিনয় করা। প্রেক্ষাপট নব্বই দশকের। ইন্টারনেট মুক্ত সরল জীবনের উপস্থাপনায় অসাধরণ করেছেন শাকিব। এ জায়গাগুলোর ছোট ছোট দৃশ্যে গল্পের গাঁথুনি টোটাল গল্পের ভীতকে শক্ত করে তুলেছে। নানা চড়াই-উতাইয়ের পর এ জায়গা থেকেই গল্প মোড় নেয়। শুরু হয় শান্তর আরেক অধ্যায়। যে অধ্যায়ে তুফানকে দেখা যায় অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ছবিতে শান্ত এবং তুফানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাকিব খান। সিনেমার টুইস্টিংয়ের জায়গায় পর্দায় উপস্থিত হন শক্তিমান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। যদিও শেষদৃশ্যের টাইট ক্লোজআপ ছাড়া কোথাও শাকিবের সঙ্গে চঞ্চলকে একসঙ্গে না দেখানোর কৌশলটা রাফির চমৎকার উপায়ে শেষদৃশ্যে উত্তর দিয়েছেন। যে কারণে ‘তুফান-২’ নিয়ে সরব দর্শকমহল। এখানে চঞ্চল অভিনয় করেছেন এসি আকরামের চরিত্রে। শেষ দৃশ্যে একের পর এক ডাক্তার-নার্সদের মেরে ফেলেন পুলিশ অফিসার চঞ্চল চৌধুরী এবং বোঝা যায়, ‘তুফান’ মরেনি।
কস্টিউম ডিজাইনার চরিত্রে মাসুমা রহমান নাবিলা, ফাইট ডিরেক্টরের ভূমিকায় গাউসুল আলম শাওন আর তুফানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত। এছাড়া গ্রামের গডফাদার চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিম। প্রথম দৃশ্যে এলামেলো লাগলেও দ্বিতীয় দৃশ্যে অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন এই অভিনেতা। রাজনৈতিক নেতার চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু নিজের নামের প্রতি সুবিচার করেছেন বরাবরের মতোই। কুস্তি বশীরের চরিত্রে মিশা সওদাগর এবং সালাহউদ্দীন লাভলুসহ প্রমুখ অভিনয় করেছেন এই সিনেমায়।
‘তুফান’ ছবির আলোচিত গান ‘লাগে উড়াধুড়া’র কোরাস অংশ লিখেছেন রাসেল মাহমুদ ও শরীফ উদ্দীন। যার সুর রাজ্জাক দেওয়ানের ‘ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলরে মরার কোকিলে’ থেকে নেওয়া। সুর করেছেন প্রীতম হাসান এবং গেয়েছেন প্রীতম ও দেবশ্রী অন্তরা। তুফানের টাইটেল ট্র্যাক লিখেছেন তাহসিন শুভ এবং গেয়েছেন আরিফ ও জয়। ‘আসবে আমার দিন’ শিরোনামের গানটি লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন। গানের সংগীত পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন আরাফাত মহসীন, নাভেদ পারভেজ ও প্রীতম হাসান।
দুই ঘণ্টা ২৫ মিনিটের ‘তুফান’ সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন আলফা আইয়ের পক্ষে শাহরিয়ার শাকিল। এর গল্প লিখেছেন রায়হান রাফি ও আদনান আদিব খান। চিত্রনাট্য লিখেছেন আদনান আদিব খান। চিত্রগ্রহণে ছিলেন তাহসিন রহমান। বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্পাদনার পাশাপাশি ফটোগ্রাফি আর কালার কারেকশন বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে যাওয়ার আভাস দেয়। তেমনি তুফান-এর প্রথম খণ্ড কিশোর গ্যাংকে উসকে দিচ্ছে এ কথাও মাথায় রাখতে হবে।
টিম ‘তুফান’
তুফান: ৬/১০
মুক্তি: ১৭ জুন ২০২৪
প্রেক্ষাগৃহ: ১২৯ (প্রথম সপ্তাহ)
পরিচালক: রায়হান রাফী
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট
প্রযোজনা: আলফা আই
পরিবেশক: জাজ মাল্টিমিডিয়া
বিডিসংবাদ/আতে


























