সংকট উত্তরণে সামাজিকীকরণের দায়
- আপডেট সময় : ০৩:৫৮:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪
- / 785
মীর আহাম্মদ মীরু
ঋতু পরিবর্তনের বৈচিত্রকে মানুষ উপভোগ করতো। বিংশ শতকের নব্বই দশের শেষ দিকেও এমন চিত্র এখনও কারো কারো স্মৃতিকে নাড়া দেয়। মানুষ এই আনন্দগুলো উপভোগ করতো। তখন মানুষের অভিযোগ করতো কম উপভোগ করতো বেশি। অভিযোগও মানুষ উপভোগ করেছে একটা সময়। গ্রাম্য সালিশ থেকে আমরা উন্নত বিচারিক ব্যবস্থার জন্য আইনকে কতভাবে কার্যকর করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সভ্যতার মাপকাঠিকে নতুনভাবে প্রকাশ করতে চাচ্ছি।
কিন্তু সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ধারার বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তনের ফলে মানুষের খাদ্য ও ঋতু ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে অনেক। ধরুন আজ গরমের সময় যাচ্ছে। আপনার শীতের সবজি ফুলকপি খেতে মন চাইলো। আপনি কিন্তু ঘরে এসির তাপমাত্রা কমিয়ে শীতের আমেজে ফুলকপির তরকারি খেতে পারবেন।
আবার শীতের সময়ে গ্রীষ্মের ফল আম খেতে মন চাইলো। দেশে বাইরে থেকে আসা অথবা দেশের ভেতরে বারমাসি কাটিমন জাতের আম আপনি শীতের দিনেই ঘরে বসে খেতে পারছেন। উৎপাদনের প্রক্রিয়া ভিন্নতার কারণে সবকিছু হাতের মুঠোয় আনার পর আমরা তবে কী হারালাম?
এ প্রশ্নটি কেউ করতে পারছে না এই চিন্তাটি সবার প্রথমে হারিয়েছি। সবাই ভাবছে সব আছে কিন্তু কী কী যেন নাই! এই কী কী এর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে ব্যপারটি হারিয়েছি তা হল আমাদের মানবিক আচরণের উদারতা। তার প্রমাণ সমাজের সব জায়গায় পাবেন। শুধু গাজীপুরের শ্রীপুরের বৃহ¯পতিবারের তিনটি সংবাদ বিবেচনা করে দেখতে পারেন। ১. এনজিওর মাসিক কিস্তি দিতে না পারায় বসত ঘরে তালা ঝুলালো এনজিও কর্মীরা, ২. কিশোর গ্যাংয়ের ছুড়িকাঘাতে এসএসসি পরীক্ষার্থী আহত! এবং ৩. কলা খেতে একজন গৃহবধূর পোড়া লাশ পাওয়া যাওয়া!
প্রথম সংবাদের কথা বিবেচনা করুন। কিস্তি না দিতে পারায় পরিবারকে তার নিজের ঘরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ঘর তালা দিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। প্রতিষ্ঠান কখন জনসাধারণের অধিকারের উপরে উঠে যেতে পারে? আদৌ কি নাগরিকের চেয়েও বেশী শক্তিধর কোনো প্রতিষ্ঠান?
আম্বালা ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি দিতে না পারার কারণে যা হয়েছে তা একটি চোখের সামনে আসা চিত্র মাত্র। এর চেয়েও অনেক করুণ বিষয় ঘটেছে কিস্তির দায় মেটাতে।মানুষের অসহায়ত্ব আসতে পারে না। মানুষ কোনো কারণে এমন হতে পারে না যে সে কিস্তি দিতে অপারগ হয়ে গেছে? ব্যাংকিং নীতিমালা কীভাবে করলে জনবান্ধব হয় আচরণ তা নিয়ে আমরা না ভেবে কেন এমন করুণ দৃশ্যের স্বাক্ষী হই!
এই সংবাদটি কি রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইনগত কাঠামো পরিবর্তন করে দিতে পারবে? কেউ আম্বালা ফাউন্ডেশনের গঠনতন্ত্র দেখে প্রশ্ন তুলতে পারবে এমন করে যে গঠনতন্ত্রে ঋণদান কর্মসূচী উল্লেখ করা আছে কিনা? মানুষের অভাব বিশ্বব্যাপী বেড়েছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে টাকাকে সহজে প্রাপ্তির একটি প্রক্রিয়া বের করে ফেলতে। যে প্রক্রিয়ায় আবার বিনিময় প্রথার একটি সিস্টেম চালু হবে। তাহলে বোধ হয় সিন্ডিকেটও কমে যেতে পারে!
সামাজিকীকরণ সবসময় কিছু চেইন মেইনটেন করে। তার মধ্যে সবচেয়ে বিষয় হল অর্থের স্বাধীনতা প্রাপ্তি ও তার বিপরীতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে কমিয়ে ফেলা। বলুনতো কিশোর অপরাধ কেন বাড়ছে? অনেকগুলো কারণের মধ্যে দেখবেন অর্থের ছড়াছড়ি একটি বড় কারণ। দুদিন আগে খুব সামান্য কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ছুড়িকাঘাত করেছে তথাকথিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বলা হচ্ছে ছেলেটি ইভটিজিং-এর প্রতিবাদ করতে যেয়ে এমন হামলার শিকার হয়েছে। দেখুন কতটা রুঢ় চিন্তার মানসিকতা অর্জন করছে আমাদের এ প্রজন্মের শিশুরা। বিচার চাইতে গেলেও ভয়ে থাকতে হচ্ছে সাধারণে মানুষদের। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এদের দিলে যে সমাজ খারাপ হয় সে ব্যপারে স্বয়ং রাজনীতিকদেরও অনেক দ্বিধা আছে। তার কর্মী বলে সব ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা কিশোর গ্যাং বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কথা বোঝানোও কি খুব সহজ?
কিশোর গ্যাং বন্ধ করার ব্যপারে এখন আর পারিবারিক শিক্ষার বিষয়টিতে বাঁধা নেই। এর সাথে যুক্ত হতে হবে পুলিশিং ব্যবস্থাপনাকে। সাথে সাথে পারিবারিক কলহ এখন চিন্তার বড় বিষয়। অভাবের তাড়নার চেয়ে অভাব বোধটা মানুষের বেশী হচ্ছে ইদানিং। অন্যেরটা দেখে নিজেদের অপ্রাপ্তিগুলোকে চিন্তা করা! অভাবের বোধের ভ্যপ্তি বাড়ার ফলে পারিবারিক কলহ এখন প্রধান সমস্যা!
গাজীপুরের শ্রীপুরে কলার বাগানে একজন নারীর পোড়া লাশ পাওয়া যায়। হতভাগ্য নারীর বাবার বক্তব্য কোড করে সংবাদ মাধ্যমসূত্রের খবরে জানা যায় ওই নারীর স্বামী প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতো। তিনিই এই পুড়িয়ে মারার কাজটি করেছেন!
যাই হোক সবই সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেই যাচ্ছে। একটা স্তরে এমন ভেঙে যাওয়া মূল্যবোধের প্যারামিটার কি দিয়ে সারাবো আমরা?
ঋতুবৈচিত্রের এ দেশ কবে এমন অপরাধ বৈচিত্রের দেশে পরিণত হল এটা সত্যিই বড় প্রশ্ন। এখন খাবারের পর্যাপ্ততা বেড়েছে, অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে কিন্তু পরিতাপ হল অপরাধ বাড়ছে। কিছু একটা কাজ করতে হবে। মানুষের মনকে ভালো কথা পড়াতে হবে। জীবনকে টেনে ধরার শেখাতে হবে। বিদ্যালয়ের চারদেয়ালের ভেতরের শিক্ষার চেয়েও এখন সামাজিক শিক্ষক বেশি দরকার। সামাজিক শিক্ষক বেশি পেতে হলে সৎ মানুষ তৈরী করতে হবে। আদর্শ মানুষকে সামনে নিয়ে বলতে হবে সন্তানকে তুমি এই মানুষটির মতো হও।




















