হায়দরাবাদের নিজাম যেভাবে খুইয়েছিলেন ৪ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি
- আপডেট সময় : ০১:২২:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৩
- / 129
বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ
হায়দরাবাদের অষ্টম ও শেষ নিজাম মুকাররম জাহ সুইজারল্যান্ডে এক জ্যোতিষীর কাছে গিয়েছিলেন। সেটা আশির দশকের ঘটনা। সেই জ্যোতিষী ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, মুকাররম জাহ ৮৬ বছর বয়সের আগে মারা যাবেন না।
নিজাম তার জীবনীকার, খ্যাতনামা সাংবাদিক জন জুবরিস্কির সাথে কথা বলেছিলেন, ‘আমার দাদু মীর উসমান আলি খাঁ যদি চেন স্মোকার হওয়া সত্ত্বেও রোজ ১১ গ্রাম করে আফিম খেয়ে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেন, তাহলে আমি নিশ্চিতভাবেই তার থেকে বেশি দিন বাঁচব।’
মুকাররম জাহ ২০২৩ সালে যখন মারা যান, তার বয়স হয়েছিলেন ৮৯ বছর।
তুরস্কের আনাতোলিয়ায় একটা তিন কামরার ফ্ল্যাটে মৃত্যু হয় নিজামের। তার দেখা-শোনা করত এক নার্স, এক রাঁধুনি ও এক পরিচারক।
শেষ নিজামের নানা ছিলেন শেষ খলিফা
তার প্রতিবেশীরাও জানত না যে নিজাম মুকাররম জাহেরের নানা ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ ‘খলিফা’ দ্বিতীয় আব্দুল মজিদ।
খলিফাকে যখন ১৯২৪ সালে দেশ ছাড়তে হয়, তারপর তিনি সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নেন। তার একমাত্র মেয়ে দুরুশেভরের সাথে মুকাররম জাহের বাবা প্রিন্স আজমের বিবাহ হয়েছিল।
তবে তার পিতাকে নিজামের সিংহাসনে না বসিয়ে মীর উসমান আলি নাতি মুকাররম জাহকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।
মুকাররম জাহ যখন ১৯৬৭ সালে অষ্টম নিজাম হিসেবে সিংহাসনে আরোহন করেন, উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এক ডজনেরও বেশি প্রাসাদ, মোগল আমলের শিল্পকর্ম, কয়েক শ’ কেজি সোনা-রুপার গহনা, হিরাসহ আরো অজস্র ধনসম্পদ পেয়েছিলেন।
সেই সম্পত্তি থেকে চার হাজার কোটি টাকা তিনি উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
চার হাজার কোটি টাকা উড়িয়ে দেয়ার ইতিহাস
মুকাররম জাহের জীবনীকার জন জুবরিস্কি তার বই ‘দা লাস্ট নিজাম : রাইজ অ্যান্ড ফল অফ ইন্ডিয়াজ গ্রেটেস্ট প্রিন্সলি স্টেট’-এ লিখেছেন, ‘মুকাররম খুব গর্বের সাথে একটা কাহিনী বলতেন যে কিভাবে তার পূর্বপুরুষ, প্রথম নিজাম রাতের প্রহরীদের ঘুষ দিয়ে গোলকোন্ডা দুর্গ খুলিয়ে মোগলদের দাক্ষিণাত্য বিজয়ে সাহায্য করেছিলেন।
তারপরে উটের পিঠে চাপিয়ে সোনা-রূপা, হিরা জহরত আওরঙ্গজেবের দরবারে পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু মুকাররম জাহ যখন মারা যান, তার আগে থেকেই নিজামের সম্পত্তি নিয়ে ডজন খানেক উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আদালতে মামলা চলছিল। সেই সব মামলার শুনানি এখনো চলছে।
মুকাররম জাহের চার হাজার কোটি টাকা উড়িয়ে দেয়ার কাহিনী বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়।
সপ্তম নিজামের ছিল ২০০ স্ত্রী
তার দাদু মীর উসমান আলি নিজের ছেলে প্রিন্স আজমকে নিজাম না করে উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নাতি মুকাররমকে।
মীর উসমান আলির জীবনীকার ডি এফ ক্রাকা ‘ফেবুলাস মোগল’ বইতে লিখেছেন, ‘উসমান আলি খানের একটা প্রাসাদ ছিল কিং কোঠি নামে। ১৯২০ সালে ওই প্রাসাদে তার ২০০ জন স্ত্রী থাকতেন, আর ১৯৬৭ সালে তার মৃত্যুর সময়ে সংখ্যাটা কমতে কমতে ৪২ জনে এসে ঠেকেছিল।’
আবার জন জুবরিস্কিকে সাক্ষাতকার দেয়ার সময়ে মুকাররম জাহ জানিয়েছিলেন যে তার দাদু মীর উসমান আলি প্রতি সন্ধ্যায় ওই প্রাসাদের বাগানে পৌঁছতেন। তার আগেই সব স্ত্রীরা সেখানে হাজির হয়ে যেতেন। যার কাঁধে সপ্তম নিজাম সাদা রুমাল রাখতেন, ওই স্ত্রীই হতেন ওই রাতের শয্যাসঙ্গিনী। রাত ৯টায় মীর উসমান আলির শয়নকক্ষে পৌঁছে যেতেন ওই রাতের রাণী সাহেবা।
এর ফলে মীর উসমান আলির সন্তান আর নাতি-নাতনীর সংখ্যা তার মৃত্যুর সময়েই ছিল প্রায় ১০০। আর ২০০৫ সালে সেই সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে ৫০০ ছাড়িয়ে যায়।
তারা প্রায় সকলে শেষ নিজাম মুকাররম জাহের বিরুদ্ধে সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে মামলা করেছেন।
শেষ নিজামের প্রথম বিয়ে
১৯৫০ সালে মীর উসমান আলির সম্পত্তি ছিল ১৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৫ কোটি টাকা ছিল নগদ, হিরা জহরত ছিল পাঁচ কোটির আর প্রাসাদ ও অন্য সম্পত্তির পরিমাণও ছিল প্রায় একই।
নিজামের সম্পত্তি নিয়ে চলতে থাকা মামলার সময়ে ভারতীয় স্টেট ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে আদালতে যে হিসাব দিয়েছে, তাতে সর্বশেষ মূল্যায়ন করে দেখা গেছে এর পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।
এ বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মুকাররম জাহ লন্ডনের হ্যারো স্কুলে পড়তেন। তিনি তার এক বন্ধু রশিদ আলি খানকে বলেছিলেন, ‘আমি স্বাধীন মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। তাই আমার যত শখ আছে, সব পূরণ করতে চাই আমি।’
যুক্তরাজ্য আর ইউরোপে তিনি কখনো সেতু তৈরির প্রকৌশল শিখছেন, কখনো আবার ল্যান্ডমাইন বিছানো শিখছেন।
১৯৫৮ সালে ইস্তানবুলে ছুটি কাটানোর সময়ে মুকাররম জাহের সাধে পরিচয় হয় এসরা ভার্জিন নামে এক নারীর। তারা লন্ডনের কেনসিংটন কোর্টে সবার অজান্তে বিয়ে সেরে ফেলেছিলেন।
১৯৬৭ সালে যখন সপ্তম নিজাম মীর উসমান আলির মৃত্যু হয়, সেদিন থেকেই মুকাররম জাহের সব থেকে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিজাম শাহীর বিপুল খরচ।
১৪ হাজার কর্মচারী
এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দাদুর কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৭১৮। এছাড়াও তার ৪২ জন জীবিত স্ত্রী আর তাদের প্রায় ১০০ জন সন্তান, সবার খরচের দায়িত্ব এসে পড়ে আমার কাঁধে।’
তিনি বলেন, ‘হায়দরাবাদের চৌমহল্লা প্যালেস পরিসরে ছয় কর্মচারী নিযুক্ত ছিল আর সব মহল মিলিয়ে প্রহরীই ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। নিজামের পাকশালায় প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষের রান্না হতো। কিছু কর্মচারী সেই খাবার লুকিয়ে বাইরের হোটেল রেস্তরাঁয় বিক্রি করে দিত।’
নিজামের গ্যারেজে অনেকগুলো রোলস রয়েস গাড়ি ছিল। সব গাড়ির পেট্রলের বার্ষিক খরচই ছিল নব্বই হাজার ডলার।
সিংহাসনে আরোহণের পরের বছরই মুকাররম জাহ প্রথম ধাক্কা খেলেন, যখন অন্ধ্র প্রদেশ হাইকোর্ট রায় দিল যে সব সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে।
ওই মামলাটা দায়ের করেছিলেন মুকাররম জাহের বোন শাহজাদী পাশা। তিনি ছিলেন অবিবাহিত।
দু’বছরের মধ্যেই তার স্ত্রী এসরা ও তাদের সন্তানরা যুক্তরাজ্যে ফিরে যান।
বহু বছর পরে তার প্রথম স্ত্রী এসরা মুকাররম জাহের জীবনীকার জন জুবরিস্কিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘মুকাররমের ইচ্ছা ছিল হয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন অথবা মোটরমেকানিক হবেন। তার ধারণা ছিল বিষয় সম্পত্তির ব্যাপারগুলো ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের ওপরে ভরসা করে, তাদের পরামর্শ নিয়ে সামলে নেয়া যাবে। তিনি এসব কাজের জন্য উপযুক্ত নন বলেই মনে করতেন মুকাররম।’
অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিলেন নিজাম
হায়দরাবাদে নিজাম মুকাররম জাহের হঠাৎ মনে পড়ল হ্যারো আর কেমব্রিজে তার সহপাঠী-বন্ধু জর্জ হাবডের কথা। তিনি ওই সময়ে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতে ডাক্তারি করেন। তার সাথে দেখা করতে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিলেন নিজাম।
এখান থেকেই তার জীবন একটা নতুন মোড় নিল আর হায়দরাবাদে তার বিষয় সম্পত্তি দূরে চলে যেতে শুরু করল।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের আশপাশটা নিজামের খুব পছন্দ হয়ে গেল। সেখানে একটা ফার্ম হাউস কিনে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে মুকাররম জাহ বলেছিলেন, ‘মার্চিসান নদীর নীল পানি বয়ে যেত আমার ফার্মের মাঝ দিয়ে। আবার লাল স্যান্ডস্টোনের একটা টিলাও ছিল ফার্মের মধ্যেই। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ত, যখন দাদুর সাথে হায়দরাবাদের কাছেই পাহাড়-জঙ্গলে শিকারে যেতাম।’
ওই সময়েই মুকাররম হেলেন সিমেন্স নামে এক অস্ট্রেলীয় নারীকে বিয়ে করেন। তার এইডসে মৃত্যু হয়েছিল। ওই বিবাহে মুকাররমের দু’টি সন্তান হয়েছিল। মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন করার ছোট ছেলে প্রিন্স উমর জাহ মৃত্যু হয়েছিল।
মুকাররম জাহের মন প্রাণ জুড়ে তখন অস্ট্রেলিয়ার ওই ফার্ম হাউস। পাঁচ হাজার একর জমির ওপরে তৈরি ওই ফার্ম হাউসের নাম ছিল মার্চিসন হাউস স্টেশন। এর একদিকে পাহাড় আর গুহা, অন্যদিকে ভারত মহাসাগর।
তার ভারতের সম্পত্তি অন্যদের দখলে চলে যেতে শুরু করেছে। একদিকে সম্পত্তি ভাগাভাগি হচ্ছে আর মুকাররম জাহ অস্ট্রেলিয়াতে লাখ লাখ ডলারের সম্পত্তি কিনে চলছেন। তার মধ্যে ছিল একটা জাহাজ, বিশ্বের সব থেকে বড় বুলডোজার, ল্যান্ডমাইন খুঁজে বের করার যন্ত্র আর একটা সোনার খনি।
অস্ট্রেলিয়া থেকে পালিয়ে তুরস্কে
তার জীবনীকার জন জুবরিস্কির মতে, ‘ক্রমবর্ধমান খরচের পরিমাণ সামাল দেয়ার জন্য মুকাররম দামি হিরা জহরত নিয়ে সুইজারল্যান্ডে বিক্রি করছেন, যাতে তার কর্মচারীদের বেতন অথবা দামি হোটেলের খাবার খরচ উঠে আসে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় তার খরচ দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে চলেছে। কিছু মানুষ তার অর্থ তছরুপ করতেও শুরু করেছে।’
একদিকে পাওনাদারদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছেন নিজাম, অন্যদিকে ভারত সরকার নিজাম ট্রাস্টের দামি গহনা আর অন্য-সামগ্রী বিদেশে নিলামে চড়ানোর ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি, নিজাম ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ছিলেন।
১৯৯৬ সালে তাকে অস্ট্রেলিয়া আর ইউরোপের জমি-সম্পত্তি প্রথমে বন্ধক রাখতে হলো, আর তারপরে বিক্রি করে দিতে হলো। ওই অর্থ দিয়ে পাওনাদারদের বকেয়া মেটাতে হল। তার জাহাজটা বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল আর গাড়িগুলো আর সেই বৃহদাকার বুলডোজার নিলামে বিক্রি হয়ে গেল।
ওই বছরই এক শুক্রবার নিজাম মুকাররম শাহ তার সচিবকে বললেন যে তিনি নামাজ পড়তে যাচ্ছেন।
তারপর থেকে তাকে আর অস্ট্রেলিয়াতে দেখা যায়নি। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলা থেকে বাঁচতে তিনি তুরস্কে পালিয়ে যান। মৃত্যুার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি।
নিজামের আক্ষেপ
আরো দু’বার বিয়ে করেছিলেন শেষ নিজাম, যেগুলো খুব বেশি দিন টেকেনি।
ভারত সরকার ২০০২ সালে নিজাম ট্রাস্টের কাছ থেকে নেয়া গয়নার জন্য ২২ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা ছিল বাজারের মূল্যের চারভাগের একভাগেরও কম।
মৃত্যুর পরে মুকাররম জাহকে হায়দরাবাদে এনে রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে কবর দেয়া হয়। জীবিত অবস্থায় তিনি শেষবার হায়দরাবাদে এসেছিলেন ২০১২ সালে।
তার কিছু দিন পরে জীবনীকার জন জুবরিস্কি নিজামকে প্রশ্ন করেছিলেন, জীবনে কোনো আক্ষেপ রয়েছে কি না।
আনাতোলিয়ার এক ক্যাফেতে টার্কিশ চা পান করতে করতে নিজাম মুকাররম জাহ বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, একটা আক্ষেপ আছে। যুক্তরাজ্যে আমার এক বন্ধু সন্ধান দিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটা ভাঙ্গাচোরা ডুবোজাহাজের। সে জানতে চেয়েছিল যে আমার ওটা কেনার ইচ্ছা আছে কি না। আমি সম্মতি দেয়াতে কথাবার্তা কিছুটা এগিয়েছিল। কিন্তু কেনা আর হয়নি জাহাজটি।
সূত্র : বিবিসি
বিডিসংবাদ/এএইচএস
























