“মে দিবসের পটভূমি ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা”
- আপডেট সময় : ০৭:০৪:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ মে ২০২৪
- / 325
লেখক হাসিনা মরিয়ম
পহেলা মে। এক ঐতিহাসিক দিনপঞ্জির গর্বিত সাক্ষী। মহান মে দিবসের পিছনে রয়েছে শ্রমিকশ্রেণির ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায় ও এর জন্য সংগ্রামে আত্মদানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, সারা বিশ্বের মেহনতি মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনন্য হয়ে আছে পহেলা মে। আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা বুকের রক্ত দিয়ে আদায় করেছিল সমানুপাতিক হারে কাজ ও বিশ্রামের অধিকার। মে দিবসের তাৎপর্য তাই বহুমাত্রিকতার অবয়বে অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে আজো।
বর্তমান বিশ্ব সভ্যতা শিল্প বিপ্লবের সোনালী ফসল। গত প্রায় একশ’ শতাব্দী যাবত এ সভ্যতার বিজয় কেতন উড়ছে। এ সভ্যতার যে প্রধান বৈশিষ্ট্য তা হলো উৎপাদনে শ্রমিকশ্রেণির অপরিহার্যতা। দুটি শ্রেণি এ শিল্প বিপ্লবের সাথে বিজড়িত।

মালিক ও শ্রমিক পক্ষ। তবে শিল্প বিপ্লবেরও আগে ছিল কৃষিভিত্তিক সভ্যতার একঘেয়েমি, যা চলছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত একঘেয়েমিভাবে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে মালিক-শ্রমিক উভয়ের স্বার্থ একই ছিল। মালিকগণ-নিজেরাই অনেক সময় শ্রম দিয়ে উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতো। তবে মধ্য ও প্রাচীন যুগে দাস প্রথার দরুন কৃষিতেও দাসদের ব্যবহার করা হতো। সে দাসগণই ছিল কৃষিভিত্তিক
অর্থনীতিতে শ্রমিক। সে শ্রমিকদের উপরও চলতো শোষণ ও শাসনের অক্টোপাস। তবে সত্য এই যে, মধ্যযুগে অন্তত দাসদের কৃষি অপেক্ষা নাগরিক কাজ কর্মেই বেশি নিয়োজিত হতো। যাক, মধ্যযুগের কৃষিভিত্তিক সভ্যতা দারুণভাবে অপ্রতিহত গতিতে চলার পর প্রথম ধাক্কা খায় ১৭৭০ থেকে ১৮৮০ সালে ইংল্যান্ডে সংঘটিত শিল্প বিপ্লবে। ঐ ধাক্কাতে অর্থনৈতিক জগতসহ মানুষের কৃষ্টি- সংস্কৃতি তথা রুচিবোধ, মন- মানসিকতা তথা মানবজগতে বিরাট প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। নতুন রুচি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা এমনভাবে বদলে গেল যে পুরাতন অর্থাৎ কৃষি সভ্যতায় অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে তা চেনাই শক্ত হয়ে পড়ে। সমাজ একান্তভাবে শিল্প ও ব্যবসাভিত্তিক হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু এ শিল্প বিপ্লবের যে প্রধান বৈশিষ্ট্য তা ছিল শ্রমিকশ্রেণির প্রধান্য। শ্রমিকশ্রেণি একমাত্র উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষ। যারা উদ্বৃত্ত শ্রম উৎপাদনে সক্ষম, শিল্প বিপ্লবের ধাক্কা ক্রমে ক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন জগতেও অনুভূত হয়। তবে তা ইংল্যান্ডের ঘটে যাওয়া শিল্প বিপ্লবের কিছু পরে। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের যে প্রধান নিয়ামক শ্রেণি শ্রমিক পক্ষ, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যাই থাকুক, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যুক্ত দাস শ্রেণি অপেক্ষা তাদের কাজের পরিবেশ তেমন উন্নত ছিল না। অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শেষ ভাগ পর্যন্ত শিল্পোৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিকদের দৈনিক বার ঘণ্টা, চৌদ্দ ঘণ্টা, এমনকি ষোল ঘণ্টাও কাজে নিয়োজিত রাখা হতো। উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিকশ্রেণি তখন বর্তমান সময়ের ন্যায় এতো সংগঠিত ছিল না। শ্রমিকদের এ শোষণ, জুলুম ও নিষ্পেষণের বিরুদ্ধেই আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার (AFL) ১৮৮৬ সালে পহেলা মে শিকাগো শহরে এক বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদের আয়োজন করে। লেক মিসিগান এভেনিউতে পহেলা মে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে এ প্রতিবাদ সভা আহ্বান করা হয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটা ছিল ফোর্ড রকফেলার প্রমুখ ইহুদী ধনকুবেরদের যুগ। শ্রমিকদের অমানবিকভাবে খাটিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য করা হতো। এসব ইহুদী ধনকুবেরদের কুক্ষিগত ছিল অর্থনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় মার্কিনপ্রশাসন, পুলিশ এমনকি সামরিকবাহিনীসহ পত্রপত্রিকা। উদারমানবতাবাদী-আব্রাহাম লিংকনের যুগ তখন শেষ। মার্কিন পুঁজিপতি শ্রেণি ১৮৮৬ সালের ১লা মে আহূত শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভার আয়োজন পণ্ড করতে উঠে পড়ে লাগে।
আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অবশ্য দু’বছর পূর্বেই অর্থাৎ ১৮৮৪ সালেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ ঘণ্টার পরিবর্তে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে লাগাতার ধর্মঘট পালিত হবে।
গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে সংগঠিত হতে থাকে। কিন্তু পুঁজিপতিগণও নিশ্চুপ ছিল না। তারা গোপনে ও প্রকাশ্যে এ প্রতিবাদ সভা পণ্ড ও ভন্ডুল করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। পুঁজিপতিদের পক্ষ থেকে “প্রতিবাদ” ও “প্রতিরোধের” তথাকথিত মোকাবিলার জন্য “পিংকার্টন এজেন্সী” নামক একটি দালাল সংগঠন বা ঠ্যাংগাড়েবাহিনী গঠন করা হয়। ১৮৮৬ সালের ১লা মে দিবসের নির্ঘণ্টটি যতই আসতে থাকে, ততই মারমুখো মরিয়া হয়ে উঠে মালিকপক্ষ। টেকসাস থেকে সেন্টলুন্ট রাজ্য বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পক্ষের সন্ত্রাস, ৭ এপ্রিল মিসিসিপি নদীর তীরে সাতজন শ্রমিককে গুম করে নিষ্ঠুরভাবে খুন করা হয় অত্যন্ত পরিকল্পিত ও ঠাণ্ডা মাথায়। তথাপি নিয়তির দুর্বার ও হত্যার মতো করাল, প্রতীক্ষিত দিনটি অর্থাৎ ১লা দিবসটি পায়ে পায়ে এগুতে থাকে। আট ঘণ্টা জুতো পায়ে, আট ঘণ্টা চুরুট মুখে শ্রমিকগণ এগিয়ে চলেছে শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি শিকাগো শহরের লেক মিসিগান এভেন্যুর পথে। লেক ফ্রন্টে আমেরিকার প্রায় সব শহর থেকেই শ্রমিকগণ জমায়েত হয়। শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত দুটি নাম আলবার্ট পারসন্স ও অগাস্ট স্পাইজ (এরা দু’জনই সাংবাদিক

ছিলেন) সে বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ সভাতে জ্বালাময়ী ভাষণ দান করলেন। সেদিন অর্থাৎ ১লা মে শান্তিপূর্ণভাবেই সে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সুশৃঙ্খল সে প্রতিবাদ সভাতে না শ্রমিক, না পুলিশ না ঠ্যাংগাড়েবাহিনী (মালিক পক্ষের ভাড়া করা এজেন্ট) কোন পক্ষ থেকেই পহেলা মে কোন প্রকার অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ড ঘটেনি। আসলে প্রতিবাদ দিবস অর্থাৎ ১২
ঘণ্টা, ১৪ ঘণ্টার পরিবর্তে আট ঘণ্টা কাজের জন্য দাবি দাওয়া সম্বলিত শ্রমিকশ্রেণি মিছিল, মিটিং ১ মে থেকে ৪ মে পর্যন্ত চলছিল। মে’র ৪ তারিখও যথারীতি মিটিং, মিছিল, ও সমাবেশ শেষে নেতৃবৃন্দের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শোনার পর আনন্দ মুখরিত শ্রমিকশ্রেণি সমাবেশ স্থান ত্যাগ করছিল। সময়টা ছিল সন্ধ্যা রাতের পরবর্তী ক্ষণ। কোথাও কোন গণ্ডগোল নেই। হঠাৎ পুলিশবাহিনী শ্রমিক সমাবেশে আগত শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে মুহূর্তের মধ্যে সভাস্থল ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।
শান্তিপূর্ণ সমাবেশ। যা কিনা সম্পূর্ণ তথা শান্তিপূর্ণভাবেই সমাপ্তির দিকে এগুচ্ছিল। তাতে হঠাৎ করে এ ধরনের পুলিশী আচরণে নেতৃবৃন্দ যারা তখন মঞ্চ ত্যাগে প্রস্তুত তারাও ক্ষুব্ধ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পুলিশী আচরণের বিরুদ্ধে তারাও রুখে দাঁড়ান। ইতিমধ্যে আবার মালিক পক্ষদেরই সম্পূর্ণ লেলিয়ে দেয়া পিংকার্টন এজেন্সীর মতো ঠ্যাংগাড়েবাহিনীর তরফ থেকেই সে বোধকরি একটি বোমা ছুঁড়ে মারা হয়। পুলিশ এতক্ষণে মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল। তারা বোমা ছুঁড়ে মারার অজুহাতে অপমৃয়মান শ্রমিকশ্রেণির উপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে দেয়। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত সমাবেশে গোলা গুলি চালানোর ফলে বেশকিছু নিরীহ শ্রমিক আহত ও নিহত হলেন। চারজন শ্রমিক নিহতের পাশাপাশি ৭ জন পুলিশও নিহত হয়েছিল। তাই গ্রেফতার করা হয়েছিল আটজন শ্রমিক নেতা , পরবর্তীতে যাদের বিচারের পর ফাঁসিতে লটকানো হয়েছিল।
এই প্রতিবাদী নেতারা হলেন, পারসন্স, স্পাইস, ফিলার, জর্জ এঞ্জেল, স্যামুয়েল ফিল্ডেন, মাইকেল সোয়াব এবং লুইসকিং। আরেকজনের নাম জানা যায়নি। বোমা নিক্ষেপের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। তবু তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হল। এই সাতজন নেতারই ফাঁসির আদেশ হয়। চার নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো, এরা হচ্ছেন, পারসন্স, স্পাইস, ফিলার এবং জর্জ এঞ্জেল। স্যামুয়েল ফিল্ডেন এবং মাইকেল সোয়াবের ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে ওদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। আরেক নেতা লুইসলিং জেলে আত্মহত্যা করেন। ১৮৯৩ সালে ইলিরনয়ে গভর্নর জন পি আলজেন্ড বেঁচে থাকা আসামীদের ক্ষমা প্রদর্শন করেন। তিনি মামলাটির বিচারের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিচারের পদ্ধতি এবং পরিস্থিতি ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু চারজন নেতা বহু আগেই ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে গেছেন। যে চারজন নেতার ফাঁসির কার্যকর করা হয়েছিল তাদের তিনজনই ছিলেন সাংবাদিক। এরা হলেন-এলবার্ড রিচার্ড পারসন্স, অগাস্ট স্পাইস এবং এডলফ ফিশার। পারসন্স ১৮৮৪ সালে “দি এলাম” নামীয় একটি সাপ্তাহিক সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে কাজে যোগদান করেন। পহেলা মে দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত এই। ১৮৮৬ সালে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় মার্কিন শ্রমিক প্রতিবাদ দিবসের অংশ হিসেবে ৪ মেতে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সমাবেশে পুলিশের গুলিতে যে চারজন নিরীহ শ্রমিক প্রাণ হারান তারা কিন্তু ৩ মে অনুষ্ঠিত শ্রমিক-ধর্মঘটের শিকার। আসলে আমেরিকান সর্বদলীয় শ্রমিক জোটের আহ্বানে শিকাগো নগরীতে অনুষ্ঠিত

লেক ফ্রন্টে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও দু’তিন দিন লাগাতার ধর্মঘট চলছিল। ৩ মে অর্থাৎ সোমবার ধর্মঘটের দিন পুলিশী গুলিবর্ষণে ছ’জন শ্রমিক বুকের রক্ত ঢেলে শ্রমিকদের অধিকার আদায় করেন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেই ৪ মে শিকাগো নগরীর হে মার্কেটে প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয়। এ প্রতিবাদ সভার আহ্বায়ক ও উদ্যোক্তা ছিলেন অগাস্ট স্পাইস, যিনি ৩ মে অনুষ্ঠিত পুলিশী হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী। পহেলা মে থেকে শুরু করে ৪মে পর্যন্ত পুলিশী হামলার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর চার শ্রমিক নেতাকে এক বছর যাবত ধরে বিচার নামক প্রহসনের মারফত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলান হয়েছিল। সে মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনার স্মরণেই ১৮৮৭ সাল থেকে প্রতিবছরই পহেলা মে দিবসটি গোটা বিশ্বে মেহনতি মানুষ “দাবি আদায় দিবস” রূপে পালন করে এসেছে। মহান মে দিবসের প্রতি বিশ্বের সকল দেশের শ্রমিক সমাজ শ্রদ্ধা, সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করেন।
১৮৮৬’র মে শিকাগোর শ্রমিক বিপ্লব আমাদের দৃষ্টিকে ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের প্রতি নিবন্ধ করে। ফ্রান্সের খেটে খাওয়া শ্রমিক- কৃষক সমাজের বিপ্লব উত্তরকালে ১৮৮৬-র ১লা মে শিকাগোর শ্রমিক সমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিল ন্যূনতম অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত সংগ্রামে। ফরাসি বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার লড়াই। শিকাগোর শ্রমিক বিপ্লব, দাসপ্রথা উচ্ছেদের ঘোষণা পাশাপাশি রাখলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৈপ্লবিক বিবর্তন ও অগ্রগতির রূপরেখার সুস্পষ্ট চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠে। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সচেতনতার পথ ধরে শিল্প বিপ্লব সংগঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে সোভিয়েট সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাফল্যের মুখ দেখেছিল। ফরাসি-বিপ্লব থেকে ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা গঠনের পর্যায়গুলো ও বিকাশমুখী ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে শ্রমিক সমাজই যুগে যুগে কাল থেকে কালান্তরে সকল স্তরের খেটে খাওয়া মানুষদের সংগঠিত করেছে। মে দিবসের স্লোগান তাই “দুনিয়ার মজদুর এক হও”।
শ্রমিকশ্রেণির শ্রম ও ঘাম ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উপাদান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। শ্রমিকদের শ্রমের হাত যুগে যুগে মানব সমাজকে নিঃশব্দে নব নব বিকাশের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সভ্যতার নীরব রূপকার ও সংগঠক শ্রমিকশ্রেণির, মালিক ও কায়েমী স্বার্থের কাছে পেয়েছে শোষণ নির্যাতন বঞ্চনা। দাসত্বের শৃঙ্খলে আরও থেকেছে খেটে খাওয়া মানুষেরা। হাজার হাজার বছর ধরে ১৪শ’ বছর আগে আরবে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) যে সমাজ বিপ্লব সৃষ্টি করেন, তাতে শ্রমিকশ্রেণির

মর্যাদা ও মানুষের মতো বেঁচে থাকার বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সর্বপ্রথম। ইসলামে শ্রমজীবী মানুষের একফোঁটা ঘামের মূল্যায়ন করা হয়েছে সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম প্রতিষ্ঠায় শহীদদের রক্তের সঙ্গে, মহানবীর এই শাশ্বত বাণীটিও এখানে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি মালিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “শ্রমিকের পায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার ন্যায্য পারিশ্রমিক মিটিয়ে দাও।” উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীতে শ্রমিক সমাজের অধিকার রয়েছে, ইসলামেই সর্বপ্রথম খেটে খাওয়া মানুষের মর্যাদার দ্ব্যর্থহীন স্বীকৃতি দিয়েছে। বস্তুত শ্রমিকের হাতই বিশ্ব সভ্যতার চালিকাশক্তি। শ্রমজীবী মানুষের অক্লান্ত শ্রমদানের প্রতি যথাযোগ্য স্বীকৃতিদানের লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইএলও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সুনিশ্চিত করার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে এই সংস্থা। সারাবিশ্বে শোষিত বঞ্চিত শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থের খবরদারি করে আইএলও। বিশ্বের সকল দেশের শ্রমিকদের জাতিসংঘ স্বীকৃত মানবাধিকারসমূহ অর্জনে আইএলও তার ভূমিকা রেখে চলেছে। শ্রমিকের হাতই দেশে দেশে জাতীয় অর্থনীতির বলিষ্ঠ ভিত্তি রচনা করে। প্রত্যেক উন্নত সমৃদ্ধ দেশ তাই শ্রমজীবী মানুষের সকল মানবিক অধিকার লাভের ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি রাখে।
শ্রমিকের দুটি হাত সভ্যতার চাকা সচল রাখে। আর তাই বিশ্বের সকল দেশ আজ আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার সনদ মেনে চলছে। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের বলিষ্ঠ অবদানে শিল্প ও কৃষি বিপ্লব সাধিত হয়। প্রত্যেক শিল্প শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমাদের শিল্পে নতুন প্রাণসঞ্চার করা সম্ভব। কৃষি শ্রমিক কারখানা শ্রমিক সরকারি-বেসরকারি নকল সংস্থার খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের মাধ্যমেই দেশের কৃষি
ও শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করা যায়। শ্রমিক কল্যাণে সরকার ও মালিকশ্রেণির বলিষ্ঠ ভূমিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত করতে পারে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া দারিদ্র্য দূর এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। জাতীয় অগ্রগতিকে সুনিশ্চিত করতে দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আজ নেতিবাচক ভূমিকা ত্যাগ করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। শিল্পের চাকা বেগবান করে উৎপাদন বৃদ্ধিতে শ্রমিক সমাজকে রাখতে হবে বলিষ্ঠ অবদান। শ্রমিকের তথা দরিদ্র বিপুলসংখ্যক জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ রচনায় সৃষ্টি করা সম্ভব। বলিষ্ঠ গঠনমুখী প্রেরণায় জাতীয় সমৃদ্ধির স্বার্থেই আমাদের রাজনীতির নেতিবাচক ভূমিকার অবসান তাই একান্ত প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক মে দিবস শুধু শ্রমিজীবী সমাজের সংগ্রাম এবং অধিকার আদায়ের সাফল্যেরই প্রতীক নয়, একদিক থেকে শ্রমিকদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎসও বটে। আমাদের মতো জনবল, অনুন্নত, দারিদ্র্যপীড়িত ও পশ্চাৎপদ দেশে শ্রমজীবী সমাজের কর্মশক্তি ও কর্মদক্ষতার সদ্ব্যবহার, কলে- কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়নতো দূরের কথা, শ্রমজীবী সমাজের ভাগ্যোন্নয়ন এবং কল্যাণ সাধনও কঠিন।
মহান মে দিবসে দেশের শ্রমজীবী সমাজকে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সম্পর্কে যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও সচেতন হয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে ঐক্যবদ্ধভাবে আত্মনিয়োগের শপথ গ্রহণ করতে হবে। মহান মে দিবস উদযাপন ও সর্বতোভাবে অর্থবহ হোক, আমরা এই স্মরণীয় দিনে বিশ্বের শ্রমজীবী সমাজ ও মেহনতি মানুষের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছি।
লেখক হাসিনা মরিয়ম (সহকারী সম্পাদক,বিডিসংবাদ)




















