পিএসজিকে হতবাক করে কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনা

চ্যাম্পিয়নস লীগের ইতিহাসে রেকর্ড গড়েই শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলো বার্সেলোনা। শেষ ১৬’র লড়াইয়ে প্রথম লেগের ম্যাচে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হবার পরে কোয়ার্টারের পথে যেতে হলে অলৌকিক কিছু করে দেখাতে হতো কাতালানদের। আর সেই অলৌকিক জয়েই শেষ পর্যন্ত ৬-১ গোলে পিএসজিকে ক্যাম্প ন্যুতে পরাজিত করে শেষ আট নিশ্চিত করেছে বার্সা। ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ হিসেবে কালকের ম্যাচটিকে তকমা দিতে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার যেখানে একটুও দ্বিধা করেননি।
এই ব্রাজিলিয়ান ৮৮ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে অসাধারণ একটি গোল করেছেন। এরপর পেনাল্টি থেকে ৯১ মিনিটে গোল করে দুই লেগ মিলিয়ে সমতা এনেছেন। ইনজুরি টাইমের পাঁচ মিনিটে সার্জি রবার্তো জয়সূচক গোলটি করলে দুই লেগ মিলিয়ে বার্সেলোনা ৬-৫ ব্যবধানে এগিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। এই ফলাফলে ন্যু ক্যাম্পে ৯৯ হাজার দর্শকের উচ্ছাস যেন ছিল বাঁধভাঙ্গা। অন্যদিকে ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়নরা ছিল হতবাক।
ম্যাচ শেষে স্থানীয় টেলিভিশনে নেইমার বলেছেন, ‘এটা আমার ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ, এ ধরনের ম্যাচ আমি আগে কখনই খেলিনি। যে অভিজ্ঞতা আজ আমার হলো তাতে একটি কথাই বলতে চাই আমি দারুন ফর্মে আছি। আমি জানি আমরা ইতিহাস রচনা করেছি। আমাদের মত দল যেকোন কিছুই করতে পারে।’
এই স্টেডিয়ামেই ১৯৯৯ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ইনুজরি টাইমে দুটি গোল করে বায়ার্ন মিউনিখকে পরাজিত করে শিরোপা জিতেছিল। গতকালকের ম্যাচটি যেন ছিল তারই প্রতিফলন। এছাড়া ২০০৫ সালে লিভারপুলও ফাইনালে এসি মিলানের কাছে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ জয় করেছিল। উচ্ছসিত বার্সা কোচ লুইস এনরিকে বলেছেন, ‘এটা এমন একটি রাত যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমার কাছে এটা নাটক নয়, ভয়ের সিনেমার মতই। এই ধরনের ম্যাচ একজন খেলোয়াড় বা কোচ হিসেবে ন্যু ক্যাম্পে আমি খুব কমই দেখেছি। এই ম্যাচটি খেলোয়াড় ও সমর্থকদের আস্থার বিষয়টিই প্রমাণ করেছে।’
কিন্তু এই পরাজয়ে প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই’র কোচ উনাই এমেরির ভবিষ্যতকে শঙ্কায় ফেলেছে। ক্লাব সভাপতি নাসির আল-খিলাফি বলেছেন, এ ধরনের পরাজয় মেনে নেয়া যায়না। এটা আমাদের সকলের জন্য দুঃস্বপ্ন। এমেরি কি এখনো ক্লাবে থাকার যোগ্যতা রাখে। এসব বিষয়ে কথা বলার সময় এটা নয়। ম্যাচের পরে আমরা সবাই হতাশ।
লুইস সুয়ারেজের ম্যাচের শুরুতেই গোল, এরপর লেভিন কুরজাওয়ার আত্মঘাতি গোলের পরে মেসির পেনাল্টি -এসব কিছুই বার্সেলোনাকে ম্যাচে এগিয়ে রাখলেও যথেষ্ট ছিল না। তার উপর এডিনসন কাভানির দুর্দান্ত ভলিতে পিএসজি এ্যাওয়ে গোল পাওয়ায় স্বাগতিক শিবির আবারো হতাশা ডুবে। কিন্তু ম্যাচ শেষের দুই মিনিট আগে নেইমারের ফ্রি-কিক ও তিন মিনিট পরেই পেনাল্টির গোলে বার্সেলোনা আবারো স্বপ্ন দেখা শুরু করে। ইনজুরি টাইমের পাঁচ মিনিটে নেইমারের চিপ থেকে বদলী মিডফিল্ডার রবার্তোর গোলে বার্সেলোনা যখন এগিয়ে যায় তখন স্বাগতিক দর্শকদের উচ্ছাস আর ধরে রাখা যায়নি।
মিডফিল্ডার ইভান রাকিটিচ বলেছেন, তিন সপ্তাহ আগে প্যারিসে বার্সেলোনার বড় পরাজয়ের পরে এই ম্যাচের ফল সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। অনেকেই ধরে নিয়েছিল আমরা আর সামনে যেতে পারবো না। কিন্তু আজকের রাতটা বিশেষ কিছু, আমরা ইতিহাস রচনা করেছি। আমরা জানি আমরাই বিশ্বের সেরা দল।
১৯৯২, ২০০৬, ২০০৯, ২০১১ ও ২০১৫ সালের পরে ষষ্ঠ শিরোপা দিকে এগিয়ে যাওয়া কাতালানরা এখন রেকর্ড টানা ১০ম বারের মত ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলো।
পিএসজি কোচ এমেরি স্বীকার করেছেন ফাইনাল মিনিটে তার দল পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে জার্মান রেফারী ডেনিজ আয়টেকিনের দুটি পেনাল্টির সিদ্ধান্তে তার দল দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
চ্যাম্পিয়নস লীগের ইতিহাসে কোন দলই প্রথম লেগে ৪-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ফিরতি লেগে ফিরে এসে নিজেদের প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু ঐতিহাসিক জয়ের পরে বার্সেলোনা স্বীকার করেছে সুয়ারেজের তিন মিনিটের গোলেই তারা বিশ্বাস করা শুরু করেছিল আজ সবই সম্ভব। রাফিনহার হাই ক্রস থেকে মারকুইনহোসের হেডে পিএসজি রক্ষণভাগ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে সুয়ারেজ পিএসজি গোলরক্ষক কেভিন ট্র্রাপকে বোকা বানিয়ে বার্সেলোনাকে এগিয়ে দেন। ৪০ মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার থ্রু বল থেকে সুয়ারেজের ব্যাকহিল কুরজাওয়ার পায়ে লেগে জালে জড়ালে আত্মঘাতি গোলের লজ্জায় পড়ে পিএসজি।
বিরতির পাঁচ মিনিটের মধ্যে নেইমারের আদায় করা পেনাল্টি থেকে মেসি স্বাগতিকদের গোলের ব্যবধান বাড়াতে একটুও ভুল করেননি। চ্যাম্পিয়নস লীগের মৌসুমে এটি ছিল মেসির ১১তম গোল। ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকে পিএসজি যখন গুরুত্বপূর্ণ এ্যাওয়ে গোলের সন্ধানে ছিল তখনই ৬২ মিনিটে কুরজাওয়ার ফ্রি-কিক থেকে কাভানির ভলি পিএসজিকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে কাভানিও ছিলেন দারুন আত্মবিশ্বাসী। এরপর অবশ্য কাভানি ও এ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার ভুলে পিএসজি দারুন কিছু সুযোগ নষ্ট করেছে। উল্টো ৮৮ মিনিটে নেইমার কার্লিং এক ফ্রি-কিক দিয়ে ন্যু ক্যাম্পকে আবারো জাগিয়ে তুলে। ম্যাচটি যখন ইনজুরি টাইমে চলছিল তখনই মারকুইনহোসের বিপরীতে সুয়ারেজের আদায় করা পেনাল্টি থেকে নেইমার গোল করে বার্সেলোনাকে সমতায় ফেরান। যদিও এই পেনাল্টি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ম্যাচের শেষ মিনিটে এই ব্রাজিলিয়ানের চিপ করা বল থেকে রবার্তো বার্সেলোনাকে জয় উপহার দেন।