ঢাকা ০২:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছালো ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠালি: স্বাদে ও সংস্কৃতিতে অনন্য আমরা এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি: প্রধানমন্ত্রী মদিনা ফ্লাইটের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানি: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি হুথিদের মোকাবিলায় ইয়েমেনে চার কার্গো অস্ত্র পাঠালো পাকিস্তান বগুড়ার শেরপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এক তরুণ হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে সৌদি ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টায় ৪৭৪টি সামরিক অভিযান মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের ঘটনায় জামায়াত আমিরের প্রতিবাদ শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

আমরা এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি: প্রধানমন্ত্রী

  • আপডেট সময় : ০১:০৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 1
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে আমাদের অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শনিবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। আমরা চাই আমাদের তরুণেরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক।’। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব

এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এবারের আয়োজনে শতাধিক দেশের প্রায় ২শ’ বক্তা, ৩শ’-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক এই মহতী সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, অভিজ্ঞ কূটনীতিক, দূরদর্শী নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক রূপান্তর

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশকে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের আঞ্চলিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ সকল উৎপাদনশীল খাতে সরকার ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও চমৎকার নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা জোগাবে এবং প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করবে।

সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন

সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমন চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষ সবসময় অগ্রাধিকার পান। নতুন প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়ের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে, যা সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। এছাড়া ‘কৃষক কার্ড’ চালু করার মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা প্রদান, উন্নত কৃষিসেবা এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কর্মপরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সরকার এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে পুরোদমে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই দক্ষ নারী কর্মী হবেন। তাঁরা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং জটিল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা প্রদান করবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও আমাদের সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণ সমাজ

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিক সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন, ‘শিক্ষা শুধু মাত্র একটি আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জনের জন্য হওয়া উচিত নয়, শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করার কার্যকর মাধ্যম হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি অত্যন্ত আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করছি।’ শিশুদের মানসিক বিকাশ ও চরিত্র গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে আকর্ষণীয় ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, পুষ্টিকর মিড-ডে মিল ও প্রয়োজনীয় বৃত্তি দেওয়ার যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’ দেশের এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন

কৃষিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল মজবুত ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সেচ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের সরাসরি বাজারসংযোগ তৃণমূল পর্যায়ে আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের নানামুখী সরকারি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কেননা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী গ্রামীণ অর্থনীতিই আমাদের টেকসই জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।’

দেশের পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন খাল ও জলপথ খনন করার বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক পানি সংরক্ষণ ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই জনহিতকর উদ্যোগগুলো মূলত কৃষিখাতকে সরাসরি সহায়তা করার পাশাপাশি আমাদের জলবায়ু সহনশীলতা বহুগুণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক সমৃদ্ধির রূপরেখা

বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বরাবরই পারস্পরিক ফলপ্রসূ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে, কারণ শান্তি ও সম্প্রীতিই হলো যৌথ সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের মূল সূত্র। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি শান্তিময় এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানান, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের শীর্ষ ১শ’টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে রয়েছে।’। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আমরা এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট সময় : ০১:০৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে আমাদের অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শনিবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। আমরা চাই আমাদের তরুণেরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক।’। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব

এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এবারের আয়োজনে শতাধিক দেশের প্রায় ২শ’ বক্তা, ৩শ’-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক এই মহতী সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, অভিজ্ঞ কূটনীতিক, দূরদর্শী নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক রূপান্তর

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশকে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের আঞ্চলিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ সকল উৎপাদনশীল খাতে সরকার ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও চমৎকার নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা জোগাবে এবং প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করবে।

সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন

সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমন চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষ সবসময় অগ্রাধিকার পান। নতুন প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়ের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে, যা সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। এছাড়া ‘কৃষক কার্ড’ চালু করার মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা প্রদান, উন্নত কৃষিসেবা এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কর্মপরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সরকার এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে পুরোদমে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই দক্ষ নারী কর্মী হবেন। তাঁরা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং জটিল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা প্রদান করবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও আমাদের সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণ সমাজ

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিক সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন, ‘শিক্ষা শুধু মাত্র একটি আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জনের জন্য হওয়া উচিত নয়, শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করার কার্যকর মাধ্যম হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি অত্যন্ত আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করছি।’ শিশুদের মানসিক বিকাশ ও চরিত্র গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে আকর্ষণীয় ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, পুষ্টিকর মিড-ডে মিল ও প্রয়োজনীয় বৃত্তি দেওয়ার যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’ দেশের এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন

কৃষিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল মজবুত ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সেচ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের সরাসরি বাজারসংযোগ তৃণমূল পর্যায়ে আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের নানামুখী সরকারি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কেননা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী গ্রামীণ অর্থনীতিই আমাদের টেকসই জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।’

দেশের পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন খাল ও জলপথ খনন করার বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক পানি সংরক্ষণ ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই জনহিতকর উদ্যোগগুলো মূলত কৃষিখাতকে সরাসরি সহায়তা করার পাশাপাশি আমাদের জলবায়ু সহনশীলতা বহুগুণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক সমৃদ্ধির রূপরেখা

বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বরাবরই পারস্পরিক ফলপ্রসূ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে, কারণ শান্তি ও সম্প্রীতিই হলো যৌথ সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের মূল সূত্র। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি শান্তিময় এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানান, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের শীর্ষ ১শ’টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে রয়েছে।’। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।