‘ওই গ্রুপে ছিলাম ভাবতে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়’
- আপডেট সময় : ০৭:১৭:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
- / 134
আনন্দমেলা প্রতিবেদক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেমে গেলেও তার রেশ যেন এখনও রয়েই গেছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একরে পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আসছে। যা দেখে শিউরে উঠছেন সাধারণ মানুষ। আন্দোলনে তারকাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শিক্ষার্থীদের পক্ষে। আবার কেউ বা ছিলেন বিপক্ষে।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সমর্থিত শোবিজ তারকাদের ‘আলো আসবেই’ গ্রুপের স্ক্রিনশট ফাঁসে উত্তাল নেটদুনিয়া। ওই গ্রুপের আন্দোলনকালীন সময়ে তাদের মধ্যে নানান বিষয় নিয়ে কথোপকথন চলতো তাদের মধ্যে।
সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ফেরদৌস আহমেদ, রিয়াজ থেকে শুরু করে শামীমা তুষ্টি, জ্যোতিকা জ্যোতি, রোকেয়া প্রাচী, সোহানা সাবা (অনেক সহকর্মীকে তাদের সঙ্গে যোগ না দিলে ভবিষ্যতে দেখে নেবার হুমকি দাতা), উর্মিলা কর, মিলন ভট্ট, তানভীন সুইটি, সোহানা সাবা, সুবর্ণা মুস্তফা, বদরুল আনাম সৌদ, অরুণা বিশ্বাস, শাহনূর, এস এ হক অলীক, অভিনেতা সাজু খাদেম, শহীদ আলমগীর, নূনা আফরোজ, সাংবাদিক লিমন আহমেদসহ আরও অনেকে। তাদেরই একজন ‘ভালোবাসবো বাসবো রে বন্ধু’-খ্যাত গীতিকবি জুয়েল মাহমুদ।
স্ক্রিনশট ফাঁসের পর থেকেই ওই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করার চেষ্টা করছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন এই গীতিকবি।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথাপকথনে জুয়েল মাহমুদ জানিয়েছেন- আমি তখন কাজী নজরুল ইসলামের বায়োপিক সিরিজ নির্মাণ বিষয়ক গবেষণা এবং এর চিত্রনাট্য নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় পার করছি। ২৯ জুন ২০২৪ রাতে এস এ হক অলীকের সাথে একটা কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রের কাজ নিয়ে কথা বলার এক পর্যায় জানতে পারলাম কাল (৩০ জুন ২০২৪) বিটিভির সামনে সকল শিল্পী এবং কলাকুশলিরা ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এবং জ্বালাও পোড়াও এর বিরুদ্ধে সবাই দাঁড়াবে। বিটিভিতে আমার একটা কাজও ছিল, সেদিন যেতেই যখন হবে তখন অলীককে বললাম আমি আসবো। বেলা একটার সময় আমি ঢুকলাম, অভিনয় শিল্পী সহ অনেক কলাকুশলি উপস্থিত, সবাই নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করছিল তখন। আমিও দাঁড়ালাম। নিরবতা শেষে যখন একজন একজন করে নিহতদের স্মরণে এবং দেশের অস্থিরতা নিয়ে কথা বলছিল সেই ফাঁকে আমি আমার একান্ত কাজটুকু সেরে কিছু সময়ের জন্য আবার এসে দাঁড়ালাম। এর কিছুক্ষণ পর আমি বাসায় চলে আসি। রাতে যখন আমি লিখছিলাম তখন আমার মোবাইলে মেসেজ আসতে থাকে, আমি দেখি ‘আলো আসবেই’ নামে একটি গ্রুপ। সেখানে দেখলাম কিছু কলিগ এবং পরিচিত অনেকেই। আর পোস্ট দেখি পরের দিন বিএফডিসিতে সবাই দাঁড়াবে সেখানে উপস্থিত থাকার অনুরোধ। আমি পরের দিন শাহবাগ গেলাম সকালে তারপর সেখান থেকে এফডিসিতে গিয়ে দেখি আয়োজন শেষ হয়ে গেছে। এরমধ্যে চারিদিকের মৃত্যুর সংবাদ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাওয়া শুরু করলো। আমি ফিরে এলাম নিকেতনের অফিসে। বাসা থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো আমি যেন আর বের না হই। অগত্যা ঘরে বসেই আমি কাজের ফাঁকে পোষ্টগুলো দেখি এবং মাঝে মধ্যে গ্রুপে উপস্থিত মতে দু একটা কথার পীঠে কথা লিখি। পরের দিন আমার বাসার বাইরেই প্রচন্ড গন্ডগোল তাই বের হলাম না। কার্ফিউ চলছে। বেশ গোলাগুলি। বাইরের অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে উঠছি, ফেইসবুক একটা মগজের ময়দান মনে হলো। প্রপাগান্ডা ছাড়ানোর কথাসহ বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম লেখা দেখে কানেক্ট করতে পারছি না কি সত্য আর কি মিথ্যা। খুব খারাপ লাগছিল চারিদিকের প্রাণ হারানোর ঘটনা জেনে আর শুনে। এদিকে রামপুরায় বেশ গোলাগুলি চলছিল। এত ভায়োলেন্স আর নেয়া যাচ্ছিল না। অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। তখন আমি নিজেকে নিয়ে একটি কবিতা লিখলাম আমার ফেইসবুক পেইজে।
জুয়েল মাহমুদ আরো বলেন, নিজের সাথে নিজের এমন প্রশ্নের দোলাচলে আন্দোলন দেখে দেখে আরো দুদিন চলে গেল জীবন থেকে। ঘরে বাচ্চারা প্রজন্মের শ্লোগানে নিজেদের সামিল করে নিলো। ওরা চেয়েছিলো আমিও যোগ দিবো কিন্তু এরমধ্যে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়লাম। শরীর আর মন কঠিন দোলাচালে। আন্দোলন এক দফায় পরিণত হলো। আর টিভির একটি সংবাদ দেখে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ি, মনে প্রশ্ন জাগলো, দেশ এতটা অস্থির হয়ে উঠেছে? এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিলাম আর থাকবো না ‘আলো আসবেই’ গ্রুপে থাকবো না। গ্রুপ থেকে লিভ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন আমার সন্তানরা বিজয়ের খবর জানালো আমাকে। আমি শুধু আমার সন্তানের দিকে তাঁকিয়ে রইলাম আর অনুভব করলাম, ওরাও চাপা কষ্টে এ কদিন কাটিয়েছে নতুন সুর্যের অপেক্ষায়। ওদের আনন্দ দেখে অনুভব করলাম এভাবেই আলো আসে।
সম্প্রতি আলো আসবেইকান্ডে রিয়াজ, অরুণা বিশ^াস, এস এ হক অলীক, উর্মিলা কর, সোহানা সাবা, রিয়াজ, রোকেয়া প্রাচীর মতো অভিনয় শিল্পীদের আক্রমনাত্মক কথপকথন প্রকাশ্যে আসলে জুয়ের মাহমুদ এর তীব্র নিন্দা জানান। বলেন, ওই সময় গ্রুপে কে কি লিখেছে এসব ফলো করার মতো অবস্থায় ছিলাম না, যে কারণে তাদের কথাগুলো পড়তে পারি নি। তবে এখন যখন প্রকাশ্যে আসছে তখন লজ্জিত হয়েছি। লজ্জিত কারণ এমন গ্রুপে আমি ছিলাম। এমন উষ্কানীমূলক কথার নিন্দা জানাই। সেই সাথে এই ছাত্র-জনতা হতাহতের ঘটনায় পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ জড়িতদের বিচারও দাবি করছি।
বিডিসংবাদ/আতে


























