ডিজেল সংকট: ইউরোপের মজুত ছাড়তে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ
- আপডেট সময় : ০৬:২১:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
বিশ্বব্যাপী ডিজেলের ক্রমবর্ধমান সংকট এবং এর উচ্চ মূল্যের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় বড় ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে দেশ থেকে ডিজেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ডিজেলের চড়া দামের কারণে যেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ট্রাম্প ইউরোপের দেশগুলোকে তাদের কৌশলগত ডিজেলের মজুত থেকে কিছু অংশ অবিলম্বে বাজারে ছাড়ার জন্য অনুরোধ জানানোর কথা বলেছেন। বিবিসি লিখেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে ডিজেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের হুমকি দিয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই ইস্যুতে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বেশ সোচ্চার। তিনি তার এক এক্স পোস্টে ইউরোপীয় অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাদের উচিত পূর্বের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং জ্বালানি সরবরাহের বর্তমান সংকট কাটাতে মজুত থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি বাজারে ছেড়ে দেওয়া। যদিও বছরের শুরুতে সমন্বিতভাবে কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাজারে ছাড়ার পরেও ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে এখনো কিছু মজুত অবশিষ্ট রয়েছে বলে জানা গেছে। আলোচনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই হবে বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেন, ডিজেল পরিস্থিতি নিয়ে “অনেক ফোন, অনেক বৈঠক” হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের এই চাপের নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলার সক্ষমতা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে থাকে। আরগাস মিডিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ করলে অন্য দেশগুলোতেও এ জ্বালানির দাম আরও চড়তে পারে।
জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের ওপর মারাত্মকভাবে পড়তে শুরু করেছে। ব্রিটিশ মোটরিং সংগঠন আরএসি-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ডিজেলের দাম এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় দাম ১৯৯ দশমিক ৭৯ পেনি, যা ২০০ পেনির খুব কাছাকাছি। এক বছর আগে এই একই জ্বালানির দাম ছিল প্রতি লিটারে মাত্র ১৪২ দশমিক ৩৮ পেনি, যা থেকে সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট হয়। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, তারা বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার ও স্থানীয় জ্বালানি শিল্পের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে।
জ্বালানি মূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি যুক্তরাজ্যের পরিবহন খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবহন বিভাগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস শেষে যুক্তরাজ্যের সড়কে ডিজেলচালিত যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ, যা আগের বছরে ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ডিজেলচালিত গাড়ির সংখ্যা বর্তমানে ৯৮ লাখ, যা এক বছর আগে ছিল ১ কোটি ৪ লাখ। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের ঘোষণা আসার পর থেকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এখন ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন চাপের মুখে তাদের কৌশলগত মজুত থেকে কতটা জ্বালানি বাজারে ছাড়ে এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে দামের ভারসাম্য কতটা ফিরে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।























