ঢাকা ০৩:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দিল্লিতে মসজিদ উচ্ছেদ: বাস্তুচ্যুত ৭১৭ পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সীতাকুণ্ডে বাসের ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহত, সড়ক ও রেললাইন অবরোধ বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে অদম্য পথচলা জয়পুরহাটের বিউটির গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হবে শাহজালালে সোনা পাচারের সময় ৫ কোটির ডিম জব্দ নাবলুসে ইউসুফ (আ.)-এর মাজার ঘিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে তিন মাসে ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে আদায় ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, কেশমে তীব্র বিস্ফোরণ শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানের কঠিন শর্ত মানল বাংলাদেশ

দিল্লিতে মসজিদ উচ্ছেদ: বাস্তুচ্যুত ৭১৭ পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

  • আপডেট সময় : ০৩:০৫:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • / 0
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত রেসকোর্স এলাকায় একটি ঐতিহাসিক মসজিদকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বসতি উচ্ছেদ করেছে কর্তৃপক্ষ। গত ৭ অক্টোবর চালানো এই অভিযানে ৭১৭টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের অনেককেই রাজধানী থেকে ৩১ মাইল দূরে সাভদা ঘেভরা নামক আবাসন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। সরকারি জমিতে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে এই উচ্ছেদ পরিচালনা করা হলেও, বাসিন্দাদের অভিযোগ—তারা দীর্ঘদিনের সামাজিক ও কর্মপরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। মসজিদটির চারপাশে বসবাসকারী এসব মানুষের বাড়িঘর সম্প্রতি উচ্ছেদ করেছে কর্তৃপক্ষ। নয়াদিল্লির রেসকোর্স এলাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মসজিদটি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এই এলাকায় সামরিক স্থাপনা, বিলাসবহুল ক্লাব এবং বড় বড় বাংলোর মাঝখানে ছোট ছোট বাড়িতে বসবাস করতেন নিম্ন আয়ের কয়েক শ পরিবার। গত ৭ অক্টোবর ওই এলাকার তিনটি বসতিতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ।

উচ্ছেদ অভিযানে বসতবাড়িগুলো ভেঙে ফেলা হলেও এলাকাটির ঐতিহাসিক মসজিদ এবং একটি হিন্দু মন্দিরকে অক্ষত রাখা হয়েছে। দিল্লি প্রতিনিধি জোয়া মতিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঐতিহাসিক মসজিদ, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জীবনসংগ্রাম এবং নতুন আবাসনে তাদের নানা সংকটের চিত্র।

তবে ৭ অক্টোবর মসজিদ দুটির বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং প্রাঙ্গণে মুসল্লিদের প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। স্থাপনাটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকাতেও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মসজিদটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো, যদিও অন্য কিছু তথ্যানুযায়ী এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছর।

দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মতে, ১৯৭৭ সালে এটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল, কিন্তু সরকারি দাবি অনুযায়ী জমির মালিকানা রাষ্ট্রের অধীনে। ইসলামী আইন অনুযায়ী ধর্মীয় বা দাতব্য কাজে উৎসর্গ করা জমি বা স্থাপনাকে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি বলা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তার পায়ে ধাতব রড বসানো হয়েছে।

মসজিদটির ভবিষ্যৎ ও পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বর্তমানে দিল্লি হাইকোর্টে আইনি লড়াই চলছে। গত ২৯ অক্টোবর আদালতকে সরকার জানিয়েছে, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের আপত্তি পর্যালোচনা না করা পর্যন্ত আগামী চার সপ্তাহ মসজিদটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। পাশাপাশি বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানান্তরের অনুমতি দেন। পাশাপাশি নামাজ আদায়ে বাধা এবং মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে একজন মুসল্লিও হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তবে উচ্ছেদ ও নির্মাণকাজ চলার কারণে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সেখানে নামাজ আদায়ের জন্য প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের বিরোধিতা করে সরকার।

মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের এক গাড়িচালক জানান, তার পরিবারের কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি এই মসজিদকে ঘিরে। তার বাবা ও মেয়ের বিয়ে এই মসজিদেই হয়েছে। এখন এলাকা ছেড়ে নতুন গন্তব্যে গিয়েও তিনি মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য উন্মুখ থাকেন, কিন্তু প্রায়ই নিরাপত্তারক্ষীদের বাধার মুখে পড়েন। বিকেলের দিকে মসজিদের ভেতরে হাতেগোনা কয়েকজন মুসল্লি থাকলেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জেনারেটরের আওয়াজ ছাড়া সেখানে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। তাদের অনেকেই কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে ছিলেন। ৫০ বছর বয়সী গাড়িচালক মোহাম্মদ ওয়াসিমের পরিবারের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক কয়েক প্রজন্মের। এখন বাড়িঘর হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে নিজের পুরোনো জীবনের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন তিনি। বাইরে জেনারেটরের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রেখা নামের এক স্বামীহারা নারীও পুরোনো বসতির স্মৃতি ভুলতে পারছেন না।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য বেছে নেওয়া সাভদা ঘেভরা এলাকাটি ২০০৬ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে থাকা অনেক বাসিন্দাই এখন নিত্যদিনের জীবন সংগ্রামে পিষ্ট। বাবলু নামের এক ব্যক্তি জানান, আগে যে স্কুলে তার সন্তানরা পড়াশোনা করত, এখন সেখান থেকে তাদের নিয়মিত যাওয়া-আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্কুল ছুটির পর সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিকেল ৪টা বেজে যায়, যার ফলে তাকে কর্মস্থল ও সন্তানের শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নাঈম খান নামে ৬৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ জানান, নতুন এলাকায় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অভাব তার দুই শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী নাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। পরিবারের সদস্যরা জায়গার অভাবে আলাদাভাবে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেন, তাদের জীবন যেন অন্তত ২০ বছর পিছিয়ে গেছে। ওয়াসিম বলেন, তাদের হৃদয় ও পুরো জীবন এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯ বছর বয়সী ছেলেও নতুন এলাকায় কাজ খুঁজে পাচ্ছে না।

উচ্ছেদের পর নারীর কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রেখা নামের এক নারী জানান, আগে তিনি বাসাবাড়িতে কাজের পাশাপাশি মন্দিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু এলাকা পরিবর্তনের ফলে তার সেই পরিচিত কাজের ক্ষেত্র হারিয়ে গেছে। আখতারি নামে আরেক বয়স্ক নারী জানান, আগে মিনারেল ওয়াটারের খালি বোতল কুড়িয়ে এবং গবাদিপশুর খাবার বিক্রি করে তিনি দিনে প্রায় ১০০ রুপি আয় করতেন। কিন্তু নতুন পরিবেশে সেই সুযোগ নেই, বরং সবাই এখন অভাব ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। আশপাশের অভিজাত বাড়িগুলোতে গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বাগান পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করেই চলত তাদের সংসার।

নগর গবেষক মুক্তা নায়েক মনে করেন, বৈধ কাগজপত্রের অভাব দেখিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া কেবল আবাসনের সংকট তৈরি করে না, বরং তাদের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সামাজিক নেটওয়ার্ক ও জীবিকার উৎসকেও ধ্বংস করে দেয়। ফলে এই পরিবারগুলো নতুন এলাকায় মানিয়ে নিতে মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়।

দিল্লি সরকারের আবাসন সংস্থা, স্থানীয় পৌর কাউন্সিল এবং কেন্দ্রীয় ভূমি কার্যালয়ের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই সাড়া দেয়নি। মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা এবং বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ পুনর্বহালের দাবিতে মুসল্লিদের আইনি লড়াই এখনো চলমান। তবে গত আগস্টে আদালত সরকারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত যুক্তি গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত আদালত এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেননি এবং পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন ১৬ ডিসেম্বর।

নিউজটি শেয়ার করুন

দিল্লিতে মসজিদ উচ্ছেদ: বাস্তুচ্যুত ৭১৭ পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

আপডেট সময় : ০৩:০৫:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত রেসকোর্স এলাকায় একটি ঐতিহাসিক মসজিদকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বসতি উচ্ছেদ করেছে কর্তৃপক্ষ। গত ৭ অক্টোবর চালানো এই অভিযানে ৭১৭টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের অনেককেই রাজধানী থেকে ৩১ মাইল দূরে সাভদা ঘেভরা নামক আবাসন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। সরকারি জমিতে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে এই উচ্ছেদ পরিচালনা করা হলেও, বাসিন্দাদের অভিযোগ—তারা দীর্ঘদিনের সামাজিক ও কর্মপরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। মসজিদটির চারপাশে বসবাসকারী এসব মানুষের বাড়িঘর সম্প্রতি উচ্ছেদ করেছে কর্তৃপক্ষ। নয়াদিল্লির রেসকোর্স এলাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মসজিদটি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এই এলাকায় সামরিক স্থাপনা, বিলাসবহুল ক্লাব এবং বড় বড় বাংলোর মাঝখানে ছোট ছোট বাড়িতে বসবাস করতেন নিম্ন আয়ের কয়েক শ পরিবার। গত ৭ অক্টোবর ওই এলাকার তিনটি বসতিতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ।

উচ্ছেদ অভিযানে বসতবাড়িগুলো ভেঙে ফেলা হলেও এলাকাটির ঐতিহাসিক মসজিদ এবং একটি হিন্দু মন্দিরকে অক্ষত রাখা হয়েছে। দিল্লি প্রতিনিধি জোয়া মতিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঐতিহাসিক মসজিদ, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জীবনসংগ্রাম এবং নতুন আবাসনে তাদের নানা সংকটের চিত্র।

তবে ৭ অক্টোবর মসজিদ দুটির বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং প্রাঙ্গণে মুসল্লিদের প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। স্থাপনাটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকাতেও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মসজিদটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো, যদিও অন্য কিছু তথ্যানুযায়ী এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছর।

দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মতে, ১৯৭৭ সালে এটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল, কিন্তু সরকারি দাবি অনুযায়ী জমির মালিকানা রাষ্ট্রের অধীনে। ইসলামী আইন অনুযায়ী ধর্মীয় বা দাতব্য কাজে উৎসর্গ করা জমি বা স্থাপনাকে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি বলা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তার পায়ে ধাতব রড বসানো হয়েছে।

মসজিদটির ভবিষ্যৎ ও পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বর্তমানে দিল্লি হাইকোর্টে আইনি লড়াই চলছে। গত ২৯ অক্টোবর আদালতকে সরকার জানিয়েছে, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের আপত্তি পর্যালোচনা না করা পর্যন্ত আগামী চার সপ্তাহ মসজিদটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। পাশাপাশি বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানান্তরের অনুমতি দেন। পাশাপাশি নামাজ আদায়ে বাধা এবং মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে একজন মুসল্লিও হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তবে উচ্ছেদ ও নির্মাণকাজ চলার কারণে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সেখানে নামাজ আদায়ের জন্য প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের বিরোধিতা করে সরকার।

মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের এক গাড়িচালক জানান, তার পরিবারের কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি এই মসজিদকে ঘিরে। তার বাবা ও মেয়ের বিয়ে এই মসজিদেই হয়েছে। এখন এলাকা ছেড়ে নতুন গন্তব্যে গিয়েও তিনি মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য উন্মুখ থাকেন, কিন্তু প্রায়ই নিরাপত্তারক্ষীদের বাধার মুখে পড়েন। বিকেলের দিকে মসজিদের ভেতরে হাতেগোনা কয়েকজন মুসল্লি থাকলেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জেনারেটরের আওয়াজ ছাড়া সেখানে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। তাদের অনেকেই কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে ছিলেন। ৫০ বছর বয়সী গাড়িচালক মোহাম্মদ ওয়াসিমের পরিবারের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক কয়েক প্রজন্মের। এখন বাড়িঘর হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে নিজের পুরোনো জীবনের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন তিনি। বাইরে জেনারেটরের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রেখা নামের এক স্বামীহারা নারীও পুরোনো বসতির স্মৃতি ভুলতে পারছেন না।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য বেছে নেওয়া সাভদা ঘেভরা এলাকাটি ২০০৬ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে থাকা অনেক বাসিন্দাই এখন নিত্যদিনের জীবন সংগ্রামে পিষ্ট। বাবলু নামের এক ব্যক্তি জানান, আগে যে স্কুলে তার সন্তানরা পড়াশোনা করত, এখন সেখান থেকে তাদের নিয়মিত যাওয়া-আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্কুল ছুটির পর সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিকেল ৪টা বেজে যায়, যার ফলে তাকে কর্মস্থল ও সন্তানের শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নাঈম খান নামে ৬৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ জানান, নতুন এলাকায় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অভাব তার দুই শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী নাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। পরিবারের সদস্যরা জায়গার অভাবে আলাদাভাবে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেন, তাদের জীবন যেন অন্তত ২০ বছর পিছিয়ে গেছে। ওয়াসিম বলেন, তাদের হৃদয় ও পুরো জীবন এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯ বছর বয়সী ছেলেও নতুন এলাকায় কাজ খুঁজে পাচ্ছে না।

উচ্ছেদের পর নারীর কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রেখা নামের এক নারী জানান, আগে তিনি বাসাবাড়িতে কাজের পাশাপাশি মন্দিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু এলাকা পরিবর্তনের ফলে তার সেই পরিচিত কাজের ক্ষেত্র হারিয়ে গেছে। আখতারি নামে আরেক বয়স্ক নারী জানান, আগে মিনারেল ওয়াটারের খালি বোতল কুড়িয়ে এবং গবাদিপশুর খাবার বিক্রি করে তিনি দিনে প্রায় ১০০ রুপি আয় করতেন। কিন্তু নতুন পরিবেশে সেই সুযোগ নেই, বরং সবাই এখন অভাব ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। আশপাশের অভিজাত বাড়িগুলোতে গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বাগান পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করেই চলত তাদের সংসার।

নগর গবেষক মুক্তা নায়েক মনে করেন, বৈধ কাগজপত্রের অভাব দেখিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া কেবল আবাসনের সংকট তৈরি করে না, বরং তাদের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সামাজিক নেটওয়ার্ক ও জীবিকার উৎসকেও ধ্বংস করে দেয়। ফলে এই পরিবারগুলো নতুন এলাকায় মানিয়ে নিতে মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়।

দিল্লি সরকারের আবাসন সংস্থা, স্থানীয় পৌর কাউন্সিল এবং কেন্দ্রীয় ভূমি কার্যালয়ের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই সাড়া দেয়নি। মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা এবং বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ পুনর্বহালের দাবিতে মুসল্লিদের আইনি লড়াই এখনো চলমান। তবে গত আগস্টে আদালত সরকারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত যুক্তি গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত আদালত এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেননি এবং পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন ১৬ ডিসেম্বর।