ভুলেছি মাস্টার মাইন্ড চিত্রসম্পাদক মল্লিককে!

শক্তিমান অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ বলেন, ‘আমাদের সময় সবচেয়ে ভালো ছবির সবচেয়ে সৃজনশীল নিষ্ঠাবান চিত্র সম্পাদক হলেন মল্লিক ভাই। তিনি যে অনুযোগ করেছেন তার অধিকার আছে বলেই সেটা করেছেন। রাষ্ট্রের উচিৎ এ ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া।’

আহমেদ তেপান্তর: গত ১৬ ডিসেম্বর আচমকাই তার মোহাম্মদপুরের বাসায় গিয়ে হানা দিতেই আতিকুর রহমান মুল্লিককে পাওয়া গেল। আজকের এই দিনে বাসায় থাকবেন ভাবিনি। প্রতিউত্তরে মল্লিক বললেন, কেন ভেবেছিলে রাষ্ট্রীয় দাওয়াতে বাইরে আছি? আমি বললাম ‘সেটাই স্বাভাবিক নয় কি? দীর্ঘশ্বাস টেনে বললেন, এসো ঘরে এসো। দেখো দীর্ঘদিন হয় রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো আমাকে ডাকে না। বিষয়গুলো সচেতনভাবে ‘উপেক্ষা’ কি না আমি জানি না তবে আমি ‘অপেক্ষা’ করি না। মানিয়ে নিয়েছি। আমিতো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম ১৫ ডিসেম্বর রমাদি (রমলা সাহা) ফোন করে আজকের (১৬ ডিসেম্বর) কথা জানালো। তখন মনে পড়েছিলো ‘হ্যাঁ আমিতো দু’দুবার জাতীয় পদক পেয়েছি কই আমাকেতো ডাকার প্রয়োজন মনে করেনি।’ এভাবেই ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অনুযোগ করছিলেন বাংলাদেশের ক্ল্যাসিক ছবির ‘মাস্টার মাইন্ড’ চিত্র সম্পাদক আতিকুর রহমান মল্লিক।

পরিচালক আজিজুর রহমান। ছবি: আমিনুল ইসলাম।

এ ব্যাপারে কথা হয় বিখ্যাত পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘আতিকুর রহমান মল্লিক বাংলাদেশের ক্লাসিক্যাল যে ছবিগুলো হয়েছে তা অনেকটাই ওর হাত ধরে পূর্ণতা পেয়েছে বলবো। যেমন এদেশের ক্ল্যাসাক্যিাল ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তক বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের চিত্র সম্পাদক মল্লিক। ও ব্যাপারগুলো বেশ বুঝতো। তাই এমন গুণীলোক যখন অনুযোগ করে সেটা তখন ধর্তব্যে নিতেই হয়।’

‘এখন রাষ্ট্রীয় কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে যাদের দেখি তাদের যোগ্যতা কতটুকু আয়োজকরা কি তা জানেন না? ক’টা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত পান অথচ নাটক-মঞ্চকর্মীদের ছড়াছড়ি দেখলে মনে হয় আমরা কিছুই দিতে পারিনি, যোগ করেন এই পরিচালক।

অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ। ছবি: সংগ্রহ।

শক্তিমান অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ বলেন, ‘আমাদের সময় সবচেয়ে ভালো ছবির সবচেয়ে সৃজনশীল নিষ্ঠাবান চিত্র সম্পাদক হলেন মল্লিক ভাই। তিনি যে অনুযোগ করেছেন তার অধিকার আছে বলেই সেটা করেছেন। রাষ্ট্রের উচিৎ এ ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া।’

এদিকে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, ‘তার মতো গুণীর মেধাকে কাজে লাগানো উচিৎ।’

চিত্র সম্পাদক আতিকুর রহমান মল্লিকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন আহমেদ তেপান্তর। ছবি: আসিফ আলম বাবু।

এফডিসি, বারী স্টুডিও ব্যস্ততা হ্রাস অন্যদিকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করে সেলুলডের আবেদন ফিকে হয়ে আসায় যেন মল্লিকও ফিকে হয়ে আসেন। তবে এই বাস্তবতাকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। তিনি বলেন, ‘পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে হয়। আর এগুলো টেকনোলজিক্যাল ব্যাপার আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে, না নিলেই পিছিয়ে পড়বো। তবে কথা হলো টেকনোলজিতো আর আমাকে সৃজনশীলতা শেখাবে না। ওটা পরিশালীত মননের ব্যাপার।’

তিনি বলেন, ‘আমি সম্ভবত খুবই ভাগ্যবান যে দেশের সেরা সব পরিচালকদের মাস্টারপিস ছবিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সত্যিকথা বলতে কি তাদের অনেকেই চোখবুঁজে আস্থা রাখতো। পড়াশোনার ঝোঁকটাও এর একটা কারণ।’ ক্লাসিক লেখাগুলো খুব পড়তাম। দেশীয় কী বিদেশি বিশাল সংগ্রহ ছিলো। এক সময় প্রচুর গল্প লিখতাম সেগুলো চিত্রালীতে ছাপাও হয়েছে। তাই সহজে কেউ আন্ডারস্টিমেট করতো না।’

কিভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন এমন প্রশ্নের জবাবে রহমান মল্লিক বলেন, ‘পারিবারিকভাবেই আমরা চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। যেমন বড় ভাই ফাহিমউদ্দিন পাকিস্তান টেলিভিশনের প্রথম সম্পাদক ছিলেন। এরপর ইস্টার্ন থিয়েটার (পরবর্তীতে বারী স্টুডিও) এর প্রতিষ্ঠাতা মালিক মাজিদ বড় ভাই। বারী সাহেব আমার ভগ্নিপতি এভাবেই জড়িয়ে গেলাম। সে কারণে পড়ালেখাটা আর হয়ে উঠেনি। তবে কি কারণে জানি না পাড়াতো বোন মাফু আপা সেই ছোট বেলাতেই আমার মধ্যে নাকি বিখ্যাত কিছু হবার লক্ষণ দেখেছিলেন। এরপর যখন মনস্থির করলাম সম্পাদনা বিভাবে কাজ করবো তখন বড় ভাই মালিক মাজিদের ‘why you come here’ কথাটি আমাকে তাঁতিয়ে দিয়েছিল।’

মোহাম্মদপুরের বাসায় স্ব-পরিবারে আতিকুর রহমান মল্লিক। ছবি: আসিফ আলম বাবু।

চিত্র সম্পাদক আলম কোরায়েশী, বড় ভাই ফাহিমউদ্দিন এরশাদের কাছ থেকে আমি দীক্ষা লাভ করি সত্য কর্মক্ষেত্রে নিজস্বতা তৈরিতে শ্রদ্ধেয় বশির হোসেনের কাছে সবিশেষ ঋণী। তিনি আমাকে ‘গোল্ডেন হ্যান্ড’ বলতেন।

প্রচারবিমুখ আতিকুর রহমান মল্লিক- সেয়ানা, মেঘের অনেক রং, মনিহার, মাটির মানুষ, আশা, এতিম, রাজা সাহেব (যুগ্ম চিত্রনাট্যকারও), পুরস্কার, রূপালি সৈকত, নয়নের আলো, রাজলক্ষী শ্রীকান্ত, নরম গরম, আগুণের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, মেঘের পর মেঘ, দেবদাস, শাস্তি, সুভা প্রভৃতি ছাড়াও ঋত্মিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এবং ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রে বশির আহমেদ অসুস্থাবস্থায় তিনি কাজ করেছেন। পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র, বাচসাস এবং প্রযোজক সমিতির পুরস্কার।

ময়মনসিংহ শহরে জন্ম নেয়া মল্লিক ব্যক্তিগত জীবনে ‍দুই ছেলের জনক। স্ত্রী শামীম আরা বেগম ডলি সাবেক রেডিও শিল্পী। বর্তমানে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ এন্ড কোং লি: নামের বৃহৎ একটি কম্পানিতে পদস্থ কর্মকতা হিসেবে চাকরিরত।