ক্রোয়েশিয়াকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো এক মহানায়ক
- আপডেট সময় : ১০:৫০:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২২
- / 143
বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ
স্বাধীন দেশ হিসেবে ১৯৯২ সালে ফিফার সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েই বাজিমাত করে ক্রোয়েটরা। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা, তবে তৃতীয় হয়েই সেবার সন্তুষ্ট থাকতে হয় ক্রোয়েটদের। সেই রূপকথার পর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়া খেলেছিল আরো ৩টি বিশ্বকাপ। তবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি হয়নি কোনোবারই।
অবশ্য, তা না হওয়াতে কেউ অবাক হয়নি। এতো ছোট জনসংখ্যার দেশ, তারকা ফুটবলার বের হওয়ার পাইপলাইনও ওতোটা মসৃণ নয়। বিশ্বমঞ্চে তাদের নিয়ে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশাটাও ওতোটা উঁচু ছিল না। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি নিকট ভবিষ্যতে কেউ দেখবে না। কিন্তু…
কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপে এসে তাদের ভুল প্রমাণ করলো টিম ক্রোয়েশিয়া। আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড, সবাইকে হারিয়ে উঠে গেলো বিশ্বকাপ ফাইনালে, রাকিটিচ-পেরিসিচরা ছাড়িয়ে গেলো সুকার-কোভাচদের ১৯৯৮ বিশ্বকাপের রূপকথাকেও। ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্নের বিশ্বকাপ যাত্রার হৃদয়বিদারক সমাপ্তি ঘটলেও সেই ক্রোয়েশিয়া হৃদয় জয় করে নিয়েছিলো পুরো বিশ্বের।
২০১৮ বিশ্বকাপের রূপকথার পরও ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েটদের সমীহ করেছিলেন বা ফেভারিট মেনেছিলেন, এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কমই। ২০১৮ বিশ্বকাপের রাকিটিচ, মানজুকিচ অবসরে, পেরিসিচ, ব্রজোভিচদেরও বয়স হয়েছে। হয়তো সবাই ভেবেছিল, ক্রোয়েশিয়ার ফেয়ারিটেইল রান দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েক বিশ্বকাপ। কিন্তু আবারো সবাইকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ক্রোয়েটরা।
ক্রোয়েশিয়ার গত বিশ্বকাপের সাফল্য আর এই বিশ্বকাপের সাফল্য, উভয় ক্ষেত্রেই একটি নাম আসবে, লুকা মদ্রিচ। নিয়মিত ফুটবল ফ্যানদের কাছে লুকা মদ্রিচ অপরিচিত নাম নন, যারা ফুটবলটা শুধু বিশ্বকাপের সময়ে দেখেন তারাও ২০১৮ বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার হিসেবে তার নাম নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন।
জাতীয় দলের হয়ে মদ্রিচের যাত্রা শুরু ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে। ২০০৬ বিশ্বকাপের লুকার ফুটবল ক্যারিয়ার সবেমাত্র শুরু হয়েছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপের লুকা মদ্রিচ রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউসিএল জেতা, বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা মদ্রিচ হলেও সেই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার যাত্রাকে বেশি দূর নিতে পারেননি।
তবে অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলেন ২০১৮ বিশ্বকাপে। মদ্রিচ ততদিনে জীবন্ত কিংবদন্তি, তার কিংবদন্তি হওয়ার ছাপ রাখলেন বিশ্বকাপ মঞ্চেও। কিন্তু ২ গোল, ১ এসিস্ট দেখে ভ্রু কোঁচকাতেই পারেন। তবে পরিসংখ্যান তার অবদান বলার জন্য হয়তো যথেষ্ট নয়। প্রতিটি ম্যাচে মদ্রিচ ছিলেন মিডফিল্ডে ডিফেন্স আর এট্যাকের প্রধান যোগসূত্র। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মধ্যমাঠের কেন্দ্র হয়ে ম্যানেজারের কাজ সহজ করে দিয়েছিলেন।
গোল এসিস্টের পরিসংখ্যানে ম্যানজুকিচ, পেরিসিচরা এগিয়ে থাকলেও সব মিলিয়ে অবদানের দিক দিয়ে মদ্রিচ তাদের থেকে সামান্য এগিয়ে ছিলেন। সেই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সেরা ফুটবলার তো ছিলেনই, বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার গোল্ডেন বলও উঠে ক্রোয়েশিয়ান এলএম টেন এর হাতে।
গত বিশ্বকাপে যেখানে শেষ করেছিলেন, যেনো সেখান থেকেই এই বিশ্বকাপে শুরু করেছেন ৩৭ বছরের মদ্রিচ। গত বিশ্বকাপে যেখানে ডোমিনিক ভিদা, ইভান রাকিতিচ ছিলেন, তাদের জায়গায় এখন আছেন তরুণ কোভাসিচ, গভারদিওল। তবে ৪ বছর পরও মদ্রিচই তার দলের মূল কাণ্ডারী। গ্রুপ স্টেজ থেকে শুরু করে রাউন্ড অফ সিক্সটিন, এমনকি ব্রাজিলের বিপক্ষেও তার নৈপুণ্যেই মধ্যমাঠের দখল রাখতে পারে ক্রোয়েশিয়া।
৩৭ বছর বয়সী মদ্রিচের এটাই শেষ বিশ্বকাপ। হতে পারে, আজকের ম্যাচেই তার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ। বিশ্বকাপে আজই হয়তো মদ্রিচকে শেষবারের মতো দেখা, মদ্রিচের বিশ্বকাপ যাত্রা নিয়ে লেখাও শেষ লেখা। এই এক মদ্রিচের কাঁধের ওপর ভর করেই স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল ক্ষুদ্র জনসংখ্যার দেশ ক্রোয়েশিয়া, এখনো স্বপ্ন দেখছে ক্রোয়েটরা।
মদ্রিচের সমাপ্তির গল্পটা যেমনই হোক, বিশ্বকাপের মঞ্চে মদ্রিচ ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, যা অনেকের কাছেই অসম্ভব। আবার অনেকের কাছেই স্বপ্ন।
বিডিসংবাদ/এএইচএস


























