ঢাকা ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তাহসিফ মৃত্যুর ঘটনা: ৩ দিনের নতুন রিমান্ডে বন্ধু দীপ তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইতালীয় শেখানোর পরিকল্পনা সরকারের এনসিপির সংবাদ সম্মেলন, এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে খালি সিলিন্ডার নিয়ে দিল্লিতে মসজিদ উচ্ছেদ: বাস্তুচ্যুত ৭১৭ পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সীতাকুণ্ডে বাসের ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহত, সড়ক ও রেললাইন অবরোধ বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে অদম্য পথচলা জয়পুরহাটের বিউটির গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হবে শাহজালালে সোনা পাচারের সময় ৫ কোটির ডিম জব্দ নাবলুসে ইউসুফ (আ.)-এর মাজার ঘিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে

গুমে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরকার মতানৈক্য ও বিদেশি সংযোগ পেয়েছে কমিশন

  • আপডেট সময় : ১১:০১:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
  • / 118
বিডিসংবাদ-এর সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ

গুম সংক্রান্ত ঘটনা তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনার পেছনে শুধু দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীই নয়, বরং বিদেশি অংশীদারদের ভূমিকা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বিধা ও মতবিরোধও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ গুমসহ নানা বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যার ফলে অনেককে পেশাগত ও ব্যক্তিগতভাবে ভুগতে হয়েছে।

কমিশন বলেছে, গুম ছিল না বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ফল, বরং এটি এমন একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল-বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার নামে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সম্পৃক্ততা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, গুম সংক্রান্ত বিষয়ে নিরপেক্ষ মত দেওয়ার কারণে তাকে সহকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, নতুন পদায়নের আগেই তার সম্পর্কে সতর্ক বার্তা ছড়ানো হত, এমনকি তার পরিবারের ওপর নজরদারি চলত।

এক যুবক কমিশনকে জানান, তার ভাই একটি গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করতেন। তাকে রাজনৈতিক ‘বিরোধীদের’ তালিকা করতে বলা হয়। পরে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, যা জানার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তার ভাই এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

এক সৈনিক জানান, তাকে একটি গোপন বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়েছিল যেখানে বন্দিদের প্রতি ছিল চরম নিষ্ঠুরতা। তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয় যেন স্বাভাবিক ব্যবহার না করা হয়, বরং বন্দিদের কষ্ট দেওয়ার নির্দেশ মেনে চলা হয়। এমনকি বন্দিদের সামনে কথা বলাও নিরুৎসাহিত করা হতো; পরিবর্তে ইশারা ও শিসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলা হতো- যা অনেক ভুক্তভোগীর বর্ণনায়ও উঠে এসেছে।

তবে প্রতিবেদন জানায়, ওই সৈনিক একপর্যায়ে প্রতিরোধের ছোটখাটো চেষ্টা করতেন, যেমন নিজের খাবার বন্দিদের দিয়ে দিতেন। এক বন্দি কমিশনকে সরাসরি জানান, ওই সৈনিকের দেওয়া খাবারে তিনি বেঁচে ছিলেন।

আরেকজন র‌্যাব গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তাকে একজন দীর্ঘদিনের বন্দিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা অমান্য করেন এবং ৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে তার অবস্থান ধরে রাখেন।

কমিশনের ভাষায়, ‘সবসময়ই যে অবাধ্যতার ফলাফল তাৎক্ষণিক হয়, তা নয়। কেউ কেউ তাদের অবস্থান জানানোর পরও টিকে ছিলেন।’ যেমন দুজন র‌্যাব সদস্য র‌্যাব গোয়েন্দা প্রধানকে নিজ হাতে লেখা চিঠিতে জানান যে তারা বেআইনি কোনো আদেশ পালন করবেন না।

এক চিঠিতে লেখা ছিল: ‘যদি কোনো অভিযান আইন বহির্ভূত বা আইন বহির্ভূত গুলি চালানোর উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে আমি তাতে অংশ নিতে পারব না।’

প্রতিবেদন জানায়, বিগত সরকারের পতনের পর এই ধরনের কয়েকটি নোট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকেও পাঠানো হয়েছিল, যা পরে গণভবন থেকে উদ্ধার হয়।

তবু কমিশনের ভাষায়, ‘এরপরও গুমের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যেখানে ট্রেনলাইন কিংবা চলন্ত যানবাহনের নিচে ফেলে লাশ গুম করা হয়েছে।’

প্রতিবেদন বলছে, ‘গুমের মতো অপরাধকে অনেকাংশে অঘোষিতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং যারা এসব করেছিল, তারা প্রকৃত অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হননি।’

কমিশনের প্রতিবেদন জানায়, আন্তর্জাতিক সংযোগও এই ঘটনার পেছনে কার্যকর ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পশ্চিমা সহযোগিতার সুবিধাও পেয়েছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয় একজন ভুক্তভোগী কমিশনকে জানান, তাকে ডিবির হেফাজতে দুজন আমেরিকান নাগরিক জেরা করেছিলেন। যদিও তারা সরাসরি নির্যাতনে অংশ নেয়নি, তথাপি তাদের উপস্থিতিই এই বেআইনি আটক ব্যবস্থাকে বৈধতা দেয়।
বিডিসংবাদ/এএইচএস

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

গুমে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরকার মতানৈক্য ও বিদেশি সংযোগ পেয়েছে কমিশন

আপডেট সময় : ১১:০১:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫

বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ

গুম সংক্রান্ত ঘটনা তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনার পেছনে শুধু দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীই নয়, বরং বিদেশি অংশীদারদের ভূমিকা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বিধা ও মতবিরোধও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ গুমসহ নানা বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যার ফলে অনেককে পেশাগত ও ব্যক্তিগতভাবে ভুগতে হয়েছে।

কমিশন বলেছে, গুম ছিল না বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ফল, বরং এটি এমন একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল-বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার নামে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সম্পৃক্ততা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, গুম সংক্রান্ত বিষয়ে নিরপেক্ষ মত দেওয়ার কারণে তাকে সহকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, নতুন পদায়নের আগেই তার সম্পর্কে সতর্ক বার্তা ছড়ানো হত, এমনকি তার পরিবারের ওপর নজরদারি চলত।

এক যুবক কমিশনকে জানান, তার ভাই একটি গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করতেন। তাকে রাজনৈতিক ‘বিরোধীদের’ তালিকা করতে বলা হয়। পরে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, যা জানার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তার ভাই এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

এক সৈনিক জানান, তাকে একটি গোপন বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়েছিল যেখানে বন্দিদের প্রতি ছিল চরম নিষ্ঠুরতা। তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয় যেন স্বাভাবিক ব্যবহার না করা হয়, বরং বন্দিদের কষ্ট দেওয়ার নির্দেশ মেনে চলা হয়। এমনকি বন্দিদের সামনে কথা বলাও নিরুৎসাহিত করা হতো; পরিবর্তে ইশারা ও শিসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলা হতো- যা অনেক ভুক্তভোগীর বর্ণনায়ও উঠে এসেছে।

তবে প্রতিবেদন জানায়, ওই সৈনিক একপর্যায়ে প্রতিরোধের ছোটখাটো চেষ্টা করতেন, যেমন নিজের খাবার বন্দিদের দিয়ে দিতেন। এক বন্দি কমিশনকে সরাসরি জানান, ওই সৈনিকের দেওয়া খাবারে তিনি বেঁচে ছিলেন।

আরেকজন র‌্যাব গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তাকে একজন দীর্ঘদিনের বন্দিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা অমান্য করেন এবং ৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে তার অবস্থান ধরে রাখেন।

কমিশনের ভাষায়, ‘সবসময়ই যে অবাধ্যতার ফলাফল তাৎক্ষণিক হয়, তা নয়। কেউ কেউ তাদের অবস্থান জানানোর পরও টিকে ছিলেন।’ যেমন দুজন র‌্যাব সদস্য র‌্যাব গোয়েন্দা প্রধানকে নিজ হাতে লেখা চিঠিতে জানান যে তারা বেআইনি কোনো আদেশ পালন করবেন না।

এক চিঠিতে লেখা ছিল: ‘যদি কোনো অভিযান আইন বহির্ভূত বা আইন বহির্ভূত গুলি চালানোর উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে আমি তাতে অংশ নিতে পারব না।’

প্রতিবেদন জানায়, বিগত সরকারের পতনের পর এই ধরনের কয়েকটি নোট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকেও পাঠানো হয়েছিল, যা পরে গণভবন থেকে উদ্ধার হয়।

তবু কমিশনের ভাষায়, ‘এরপরও গুমের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যেখানে ট্রেনলাইন কিংবা চলন্ত যানবাহনের নিচে ফেলে লাশ গুম করা হয়েছে।’

প্রতিবেদন বলছে, ‘গুমের মতো অপরাধকে অনেকাংশে অঘোষিতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং যারা এসব করেছিল, তারা প্রকৃত অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হননি।’

কমিশনের প্রতিবেদন জানায়, আন্তর্জাতিক সংযোগও এই ঘটনার পেছনে কার্যকর ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পশ্চিমা সহযোগিতার সুবিধাও পেয়েছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয় একজন ভুক্তভোগী কমিশনকে জানান, তাকে ডিবির হেফাজতে দুজন আমেরিকান নাগরিক জেরা করেছিলেন। যদিও তারা সরাসরি নির্যাতনে অংশ নেয়নি, তথাপি তাদের উপস্থিতিই এই বেআইনি আটক ব্যবস্থাকে বৈধতা দেয়।
বিডিসংবাদ/এএইচএস