সিলেটের শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে দীর্ঘ সারি, কমেছে কাজের সুযোগ
- আপডেট সময় : ০১:০৭:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
ভোর হতেই কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হওয়া যেন রুটিনে পরিণত হয়েছে ৪৩ বছর বয়সি রোশনা বেগমের। সংসারের অভাব ঘোচাতে প্রায় এক দশক ধরে স্বামীর সঙ্গে তিনিও দিনমজুরের কাজ করছেন। সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার শ্রমিক হাটে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন কাজের অপেক্ষা করেন তিনি। কাজ পেলে দিনে মজুরি পান ৬০০ টাকা, যার মধ্যে ১০০ টাকা খরচ হয় দুপুরের খাবার বাবদ। তবে সব দিন তার ভাগ্যে কাজ জোটে না। কাজ না পেলে খালি হাতেই ফিরতে হয় তাকে। সকাল হলেই ঘুম থেকে উঠে দিনমজুরের কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন ৪৩ বছর বয়সি রোশনা বেগম। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা রোশনা বেগমের তিন সন্তান। কর্মজীবনের শুরুতে দৈনিক ২৫ টাকা মজুরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। বন্দরবাজারের শ্রমিক হাটে কথা হয় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা বশির মিয়ার সঙ্গে। এরমধ্যে দুপুরের খাবার খেতে হয় নিজেদের টাকায়।
রোশনা বেগম জানান, তার তিন সন্তানের বড় মেয়ে স্নাতক পাস করেও চাকরি পাননি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ছেলে বর্তমানে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছে। সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্ন থাকলেও বর্তমান আয় আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাকে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় ফেলছে। সন্তানদের যেন তার মতো দিনমজুরের জীবন বেছে নিতে না হয়, সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের জীবনের কষ্টকে সঙ্গী করেই সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন রোশনা বেগম। তার বড় মেয়ে ধর্মপাশা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে সন্তানরা চাকরি পাবেন কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তার কথায় উঠে আসে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রতিদিনের সংগ্রাম।
সিলেট নগরীর আম্বরখানা, বন্দরবাজার, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড় ও মেডিকেল রোডসহ অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে প্রতিদিন ভোরে শ্রমিক হাট বসে। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এসব হাটে কাজের আশায় ভিড় করেন শ্রমিকরা। প্রতিটি হাটে গড়ে দুই থেকে তিনশ শ্রমিকের সমাগম ঘটে। তবে শ্রমিকদের অভিযোগ, কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রতিদিনই প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিককে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। এই নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে এমন অন্তত ১০ থেকে ১৫টি শ্রমিক হাট রয়েছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা নির্মাণশ্রমিক বশির মিয়ার মতে, একসময় প্রতিদিনই কাজের নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানে নির্মাণকাজে বালু-সিমেন্ট মেশানো বা মালামাল বহনের মতো শারীরিক শ্রমের অনেক কাজ যন্ত্রের সাহায্যে হচ্ছে, যার ফলে শ্রমিকের চাহিদা কমে গেছে। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা আরেক শ্রমিক বাবুল মিয়া জানান, সাধারণত আট ঘণ্টা কাজের জন্য পুরুষদের ৮০০ টাকা ও নারীদের ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারিত থাকলেও অনেক সময় ৫০০ টাকায়ও কাজ করতে বাধ্য হন তারা। সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি জানান, একসময় প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে শ্রমজীবী পরিবারগুলো চরম দিশাহারা। আয়ের বেশিরভাগ অংশই চলে যাচ্ছে খাদ্য ও বাসাভাড়া বা গ্যাস-বিদ্যুতের বিল পরিশোধে। কাজ না থাকলে জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সময় নির্ধারিত মজুরির চেয়ে কম টাকা মেনে নিতে হয় টিকে থাকার তাগিদে।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার বিষয়ে সিলেট আঞ্চলিক শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, কোনো শ্রমিক আহত হলে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন। সেই আবেদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে অনুদান দেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

























