হাফ আর্জেন্টাইন থেকে আর্জেন্টিনার মহানায়ক
- আপডেট সময় : ১০:৩৩:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২
- / 132
বিডিসংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ
কিছু সময়ের জন্য ফিরে যাওয়া যাক ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ পরবর্তী সময়ে। সেবার নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম বাজে বিশ্বকাপ পার করে আর্জেন্টিনা। ফলস্বরূপ চাকরি হারান কোচ হোর্হে সাম্পাওলি। একই সময়ে মেসিকে নিয়েও তখন সমালোচনার ঢেউ। নিন্দুকেরা তখন যে ঠোঁট উল্টে মেসির নিবেদন নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। ফলে মেসি মুক্তির উপায় খুঁজছিলেন। সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেছিলেন, বিদায় বলতে চেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল জার্সিকে।
সেই সময়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন অর্থনৈতিক দিক দিয়েও ছিল শোচনীয় অবস্থায়। ফলে বড় বেতনে কাউকে নিয়ে আসবে, এমন অবস্থাও ছিল না বোর্ডের। ফলে ব্যর্থতা নিয়ে কোচ হোর্হে সাম্পাওলির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ‘ভারপ্রাপ্ত’ গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে লিওনেল স্কালোনির কাঁধে। দায়িত্ব নেয়ার পর ক্ষুব্ধ খোদ আর্জেন্টাইনদের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনিও। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময়টা আর্জেন্টিনার বাইরে কেটেছে বলে তখন ‘হাফ আর্জেন্টাইন’ বলেও খোঁচাও সহ্য করতে হয় স্কালোনিকে।
কোচ হবার পরের ফ্রেন্ডলি ম্যাচগুলোতে মেসি ছাড়াই এক ব্রাজিল বাদে সবাইকে হারায় স্কালোনির আর্জেন্টিনা। মেসি তখন দুল্যমান সিদ্ধান্তহীনতায়। এদিকে সাফল্যের ফলাফলস্বরূপ স্কালোনির নাম থেকে উঠে গেল ‘ভার’ শব্দ, ফলে ভারপ্রাপ্ত থেকে ভারমুক্ত হয়ে স্কালোনি আর্জেন্টিনার দায়িত্ব পেলেন ২০১৯ কোপা পর্যন্ত। কিন্তু স্কালোনি ভালো করেই জানেন, বড় যুদ্ধে গেলে সেনাপতির প্রয়োজন হবেই। ফলে উদ্যোগ নিলেন মেসিকে ফেরানোর।
পূর্ণ দায়িত্ব পেয়েই মেসিকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা বার্তা পাঠান স্কালোনি। খুব আবেগঘন কিছু ছিল না। লিখেছিলেন, ‘লিও! কেমন আছ? তোমার সঙ্গে কি আমি আর আইমার একটু দেখা করতে পারি?’ স্কালোনির সেই বার্তায় সাড়া না দিয়ে পারেননি মেসি। কীভাবে পারবেন! স্কালোনি আর আইমারের প্রতি তার যে অন্য রকম অনুরাগ। স্কালোনি মানুষ হিসেবে তার প্রিয় ছিলেন সব সময়ই। আইমার তো ছিলেন মেসির আইডলই! তাছাড়া উভয়েই তার সতীর্থও।
সেবার কোপা আমেরিকায় স্কালোনির অধীনে তৃতীয় হয় আর্জেন্টিনা। আগের আসরের ফলাফলের চাইতে এই ফলাফল ডাউনগ্রেড ছিল। কিন্তু এরপরও স্কালোনিতে ভরসা রাখলো আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। বাড়ানো হয় তার চুক্তির মেয়াদ। আর তাতেই যেন বাজিমাত।
২০১৯ কোপা আমেরিকা পর্যন্ত স্কালোনির কাজ ছিল দল গোছানো। মাসচেরানো, হিগুয়েইন, বিগলিয়াসহ এতদিন দলের নিয়মিত সদস্য থাকা একাধিক ফুটবলার এই সময়ে অবসরে গেলেন। মার্কোস রোহো, এঞ্জো পেরেজদের ফর্মও তখন বয়সের সাথে সাথে কমতির দিকে। এসবের মাঝে তরুণদের যাচাই বাছাই করে দলে তাদের সেট করাটাই স্কালোনির প্রথম লক্ষ্য ছিল।
সেই লক্ষ্য জয় করে নতুন উদ্যমে স্কালোনি সাজিয়ে তুলেন আর্জেন্টিনাকে। ২০১৯ থেকে ২০২২, এই সময়টার মাঝে স্কালোনির হাত ধরেই ঘুচেছে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের শিরোপা খড়া। তার হাত ধরেই ২৮ বছর পর গত বছর জুলাইয়ে আর্জেন্টিনা জয় করে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা-কোপা আমেরিকা। ফলে মনোভাব ঘুরে গেল সবার। আর্জেন্টিনা দলের নামও আল বিসেলেস্তে থেকে বদলে গেল ‘লা স্কালোনেতায়’।
যেই স্কালোনি এখন আর্জেন্টিনার মহানায়ক, সেই স্কালোনির নিয়োগের সময় খুশি হতে পারেননি অনেকেই। আর্জেন্টাইন মিডিয়াও স্কালোনিকে খুব একটা ‘স্বাগত’ জানায়নি। বরং প্রশ্ন উঠেছি তার যোগ্যতা নিয়ে! কিন্তু যতই দিন যেতে থাকল, স্কালোনি নিজেকে প্রমাণ করতে থাকলেন। তিনি গুছিয়ে তুললেন আর্জেন্টিনা দলকে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দারুণ খেলল দলটা। টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি নিয়েই কাতার বিশ্বকাপে আসে আলবিসেলেস্তারা।
স্কালোনির সাথে দারুণ জমেছে মেসির। দু’জনের সফল রসায়নেই বহু বছরের খরা মেটাচ্ছে আর্জেন্টিনা দল। কোপা জেতা হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ জয়েরও সামনে দাঁড়িয়ে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
কিভাবে পারলেন স্কালোনি ব্যর্থতার চোরাবালিতে ঢুবে থাকা দলটাকে টেনে তুলতে, কিভাবেই গড়লেন স্কালোনি একের পর এক জয়ের রেকর্ড আর অন্যদের সাথে কোথায় তার পার্থক্য? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন স্বয়ং মেসি। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠার দিনে মেসি বলেন, ‘স্কালোনি সবাইকে পরিস্থিতি বিচার করে খেলতে শিখিয়েছেন। তিনি জানেন কখন কোন কাজটা করতে হবে। তখন কী কৌশল নিতে হবে। কখন দলকে প্রেস করাবেন, কখন পেছনে নিয়ে যাবেন, স্কালোনি খুব ভালো করেই জানেন। প্রতিটি অবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন।’
মেসির দাবির প্রমান এই বিশ্বকাপ। যেখানে স্কালোনি মোট ৬টি ফরমেশন ব্যবহার করেছেন, যা তার ট্যাক্টিকাল ফ্লেক্সিবিলিটির জানান দেয়। এজন্যই তেমন নাম-ডাকওয়ালা কোচ না হওয়ার পরও স্কালোনিকে নিয়ে ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছে আর্জেন্টিনা। দলের হয়ে এখন পর্যন্ত স্কালোনি ৫৬টি ম্যাচে ডাগ আউটে দাঁড়িয়েছেন, যার মাঝে জয় পেয়েছেন ৩৭টি ম্যাচে। তবে স্কালোনি যদি আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিতে পারেন, তাহলে সেই জয় হবে বাকি ৩৭টি জয়ের চেয়েও বড়।
বিডিসংবাদ/এএইচএস


























