চরফ্যাশনে সারের সংকট, মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ কৃষকদের
- আপডেট সময় : ০৮:৫০:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / 0
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কৃষি খাতে সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ কৃষক ও খুচরা বিক্রেতারা যখন সার পাওয়ার জন্য হাহাকার করছেন, ঠিক সেই সুযোগেই অসাধু একটি সিন্ডিকেট সরকারি সার নৌপথে মিয়ানমারে পাচার করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঝেমধ্যে কোস্টগার্ড ও পুলিশের অভিযানে কিছু চালান আটক হলেও, পাচার হওয়া সারের বিশাল পরিমাণের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চর কচ্ছপিয়া কোস্টগার্ড ১৭৫ বস্তা সার আটক করেছিল। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ তেমন তথ্য দিতে পারেনি।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ ২২টি ইউনিয়নে মোট ২২ জন নিবন্ধিত ডিলার রয়েছেন। সরকারি ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রত্যেক ডিলারকে ২২ টন করে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই সার ডিলারদের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ ২২টি ইউনিয়নে মোট ২২ জন নিবন্ধিত ডিলার রয়েছেন। সেগুলো চর কুকরিমুকরি এলাকার কৃষকদের জন্য নেওয়া হচ্ছিল।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এলাকাগুলোতে অনিয়মের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় ডিলারদের দাবি, বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নগুলোতে কৃষিজমি ও কৃষকের সংখ্যা মূল ভূখণ্ডের তুলনায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও তাদের সমপরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বাড়তি সারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডিলাররা স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন এবং বাড়তি মুনাফার লোভে চোরাকারবারিদের কাছে সার বিক্রি করে দেন। এরপর গভীর রাতে এসব সার ট্রলারে করে নদী ও সমুদ্রপথে পাচার করা হয় মিয়ানমারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার একাধিক ডিলার জানান, মূল ভূখণ্ডের চেয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এলাকার ইউনিয়নগুলোতে কৃষকের সংখ্যা এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম; কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী সেসব ইউনিয়নের ডিলাররাও প্রতি মাসে সমপরিমাণ (২২ টন) সার বরাদ্দ পাচ্ছেন। তারা মাস শেষে অবশিষ্ট উদ্বৃত্ত সার স্থানীয় বাজারে বিক্রি না করে, অধিক মুনাফার লোভে সরাসরি চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে উপকূলীয় নৌপথগুলোতে কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন তারা, যাতে কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই চোরাচালান সিন্ডিকেটকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। এর আগে গত ১২ আগস্ট উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেতুয়া নতুন ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। তারা হলেন- নোয়াখালীর সিরাজ (৬০), সোহেল (৩২) ও শাহারাজ (৪৩) এবং চরফ্যাশনের পারভেজ (৪০)। আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ২৩ আগস্ট। তারা হলেন- নোয়াখালীর আজগর হোসেন ও সেলিম মিয়া, লক্ষ্মীপুরের কবির হোসেন, ভোলার আব্দুল মমিন, চরফ্যাশনের মো. শামীম ও মো. ইউসুফ, দুলারহাট থানার মো. সিরাজ এবং দৌলতখানের মো. রায়হান। এ সময় ধরা হয় সার পরিবহণে ব্যবহৃত একটি ট্রাক ও একটি বড় ফিশিং বোটও।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা এই সার স্থানীয় বাজারে ছাড়লে কিছুটা বেশি দামে হলেও সার পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু চোরাচালানের কারণে এখন চড়া দামেও সার মিলছে না। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চর কুকরিমুকরির সার ডিলার ও মেসার্স জাকির ট্রেডার্সের মালিক মো. জাকির হোসেন। তিনি দাবি করেছেন, তার ডিলারশিপে নিয়ম মেনেই সার বিক্রি করা হচ্ছে এবং কালোবাজারির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। অসাধু ডিলার ও চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেটের কারণে বেশি দাম দিয়েও স্থানীয় কৃষকরা সার পাচ্ছেন না, যার ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষি খাত। সারের কালোবাজারি বা চোরাই পথে বিক্রির মতো কোনো অপকর্মের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। লোকমান হোসেন তখন সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স জিসান ট্রেডার্সের মালিক জাহিদ হাসানের কাছ থেকে খুচরা ডিলার মালেক গাজী সার সংগ্রহ করেছিলেন।
উপাঞ্চলীয় কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বেশ কিছু অভিযানে সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে
- ১২ আগস্ট আসলামপুর ইউনিয়নের বেতুয়া ফিশারি ঘাট থেকে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। এ সময় একটি ট্রাক, ফিশিং বোট ও চারজনকে আটক করা হয়, যাদের নাম: নোয়াখালীর সিরাজ, সোহেল, শাহারাজ এবং চরফ্যাশনের পারভেজ।
- আটক ব্যক্তিদের মামলা দায়েরের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
- ২৩ আগস্ট চর কচ্ছপিয়া ঘাটে ট্রলারসহ ১৭৫ বস্তা সার আটক করে কোস্টগার্ড। এর মধ্যে ১০০ বস্তা ইউরিয়া, ৪০ বস্তা ডিএপি, ১৫ বস্তা টিএসপি এবং ২০ বস্তা এমওপি সার ছিল। তবে পরবর্তীতে সেটিকে ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে মুচলেকা নিয়ে সারগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ গত বুধবার রাতে দক্ষিণ আইচা থানার তেঁতুলিয়া নদীতে অভিযান চালিয়ে ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া সারসহ আটজনকে আটক করেছে কোস্টগার্ডের চরমনিকা দক্ষিণ জোনের সদস্যরা। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, এই চালানটি আটকের পর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘ দিন ধরে এই নৌপথ ব্যবহার করে সারসহ নানা পণ্য মিয়ানমারে পাচার করছে এবং ফেরার পথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য নিয়ে আসছে।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, পাচারের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে সারগুলো কোথা থেকে আসছে বা পুরো সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা জিজ্ঞাসাবাদেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কৃষকদের ভাগ্য রক্ষায় উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি আরও কঠোর করার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হোসেনের উপস্থিতিতে অঙ্গীকারনামায় সই রেখে ট্রলার ও সার ছেড়ে দেওয়া হয়।
























