সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন: গুজব ও অপপ্রচারে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান
- আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 0
সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে গুজব বা অপতথ্য ছড়ানোর দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইনে এই ধরনের সুনির্দিষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই সংশোধনীতে সাইবার অপরাধের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর আওতায় মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা এবং বুলিংয়ের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত তৈরি, সংরক্ষণ, প্রেরণ বা প্রকাশের হুমকিকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত তথ্য-উপাত্তের বিষয়টিও নতুন আইনের আওতায় যুক্ত করা হচ্ছে।
আইনের খসড়ায় কোনো কোম্পানি সাইবার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির সংজ্ঞাকে আরও ব্যাপক করা হয়েছে, যার মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারবার, সমিতি, সংগঠন, ট্রাস্ট এবং সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিচারিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। গুরুতর সাইবার অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং তুলনামূলক কম গুরুতর অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করার বিধান রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার সন্ত্রাস, হ্যাকিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন এবং গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধগুলোকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের মতামত নিচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত ২৯ জুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি এই সংশোধনী নিয়ে কাজ শুরু করে। কমিটিতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীকে প্রধান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাখা হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভুঞা জানিয়েছেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে এটি ছিল প্রাথমিক আলোচনা। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজনের সঙ্গে আরও বৈঠক করা হবে এবং সবার মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সাইবার স্পেসে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি চরিত্রহনন ও বুলিংয়ের মতো কর্মকাণ্ড রোধে এই আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবিত আইনে ‘গুজব’ বলতে এমন সব অসমর্থিত তথ্য বা দাবিকে বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে আতঙ্ক বা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ‘অপতথ্য’ বলতে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা মিথ্যা বা বিকৃত তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়।
সংশোধিত আইনে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। তবে নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে একই অপরাধ সংঘটিত হলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লকের ক্ষমতার পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমান আইনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ক্ষমতা পেলেও, নতুন খসড়ায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও এই ক্ষমতার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কনটেন্ট অবমুক্তির জন্য এজেন্সি বা আদালতে আবেদন করতে পারবেন, যা শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা নতুন আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’ শব্দগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে তারা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিধানটি খসড়া থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান সভায় জানিয়েছেন, আইনটি এমনভাবে সংশোধন করা হবে যাতে এর অপব্যবহার করে গণমাধ্যম বা কারো কণ্ঠরোধ করা না যায়। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের উপস্থিতিতে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে পুনরায় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, সাইবার স্পেস ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব অপরাধ ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর তফসিলভুক্ত হলে মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যাবে। চাকরির আরও তথ্য: সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে এজেন্সি বা আদালত আবেদনটি নিষ্পত্তি করতে পারবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
























