ট্রাম্পের হুমকির মুখে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াল ইরান, পাশে রাশিয়া
- আপডেট সময় : ০৩:০০:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / 0
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর তেহরান তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি ও চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরান এখন কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ট্রাম্প সাংবাদিকদের সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানের বাকি অংশও ধ্বংস করতে হবে। তিনি খুব দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা কয়েক গুণ বেড়েছে। তেহরানের ভাষ্যমতে, এটি ছিল মার্কিন হামলার পাল্টা জবাব। নতুন করে বড় ধরনের আক্রমণ হলে ইরান আরও ভয়াবহ প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমান সংকটের সমাধানে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও শান্তি সংক্রান্ত একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তবে তেহরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, তাদের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনায় বসবে না তারা। ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি এবং হরমুজ প্রণালির বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া। এই শর্ত মানা না হলে শান্তি আলোচনা কিংবা প্রণালি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। তবে বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি বৃহস্পতিবার মস্কো সফর করেছেন। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পাঠানো একটি গোপন বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
রেজায়ি এই আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ইরানের গ্যাস সংকট কাটবে এবং রাশিয়ার জ্বালানি প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্রির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি ইরানের ড্রোন সহায়তার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, বিনিময়ে রাশিয়াও ইরানকে সামরিক প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সহায়তা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, ইরানকে হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক দিতে রাজি হয়েছে মস্কো। প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তবে এ বিষয়ে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ইরানের সাবেক কূটনীতিক হাদি আফগাহির মতে, যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় হলে সমঝোতার পথ সহজ হতে পারে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৃহস্পতিবার উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উপায় নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও উত্তেজনা প্রশমনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শুক্রবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, যেখানে সংকট নিরসনে কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি, এই সপ্তাহে মাইনের আঘাতে অন্তত সাতটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে শুক্রবার দুটি জাহাজ অচল হয়ে পড়ে। যদিও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলো এসবের আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করেনি। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। তারা সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে হামলায় সহযোগিতা করা যেকোনো দেশ বা বাহিনী তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর দাবি, এ সপ্তাহে অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত পথের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় মাইনে আঘাত লেগে অন্তত সাতটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল ইস্যুতে মার্কিন-ইরান বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন হয় এই পথ দিয়ে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
























